- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 436
- Messages
- 6,892
- Reaction score
- 4,813
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
মা
মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ
মূল লেখকঃ মুস্তাকিম বিল্লাহ
রোহান বড় আপার দিকে তাকিয়ে ইশারা দিয়ে বলে, আপা তুই বল৷ ডলি বেগম বিছানার উপরে বসে আছে, হাতের ভিতরে একটা তজবি। বড় মেয়ে নিতু এসে পাশে বসেছে। নিতু মায়ের শরীরের কথা জিজ্ঞেস করে, কিছু খাবে কিনা সেসব কথা জিজ্ঞেস করে।
ডলি বেগম ধীরে ধীরে উত্তর দিয়ে যায়। নিতু বলে, মা একটা কথা বলতে এসেছি। এবার তো আমরা তিন ভাই বোন যাচ্ছি, অনেক মানুষ। এদিকে ডাক্তার বলেছে তোমার শরীরের অবস্থা ভালো না, তুমি পরের বার যাবে। কি বলো?
ডলি বেগম নিশ্চুপ হয়ে যায়। নিতু বলে, মা কিছু বলছো না কেন?
‘আমি আর কি বলবো তোরা যা ভালো মনে করিস।’
‘মা আমি কথা দিচ্ছি পরের বছর তোমাকে নিয়ে যাবো। কিংবা তোমার হয়ে কাউকে হজ্বে পাঠাবো।’
‘আমার হয়ে কাউকে পাঠাতে হবে না, আমার একবার ইচ্ছে ছিলো সোনার মদিনা দেখবার। কাবা শরীফ ছুুঁয়ে দেখবার।’
‘মা দেইখো তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। আগামী বছর তোমাকে নিয়ে যাবো। মা তুমি মন খারাপ করেছো?'
‘মন খারাপ করবো কেন?’
নিতু ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলে দেখলি আমি বলছিলাম না মা মন খারাপ করবে না। রোহান আপার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। রোহানের মনে হলো মাকে ফাঁকি দিয়ে সবাই পালিয়ে যাচ্ছে। ছোটোবেলায় একবার মা এমন করেছে, তখন রোহান ক্লাস এইটে পড়ে। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষার দুদিন বাকি। রোহানকে পাশের বাসায় পাঠিয়ে মা গ্রামে নানা বাড়ি চলে যায়, নানু ভাই তখন অসুস্থ ছিলো খুব, বাঁচবে না এমন। রোহানের সেবার মন খারাপ হয়।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রোহানের কেমন অদ্ভুত লাগে, কেমন ছোট্ট শিশুর মন খারাপে চুপ হয়ে যাওয়া।
মা কি তবে এখন ছোটো হয়ে গেছে? মা অসুস্থ মানুষ হাঁটাচলা করতে পারে না, তাই দুই আপা এবং দুলাভাই বলেছেন মাকে বুঝিয়ে বলতে, এবার মায়ের যাওয়ার দরকার নেই। বড় আপার উপরই মাকে বলবার সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হজ্বে যাবার কথা ঠিক হবার পর থেকে মা মক্কা মদিনার হজ্ব শুনছেন দিনরাত, টিভিতে মাক্কার অলিগলি নিয়ে একটা শো হয় সেই শো মুগ্ধ হয়ে দেখে। সারাদিন হাতের ভিতরে তজবি থাকে, মা বলেন পবিত্র হয়ে যেতে হবেনা? তাই একটু বেশি ইবাদত করছি।
রোহান মায়ের ঘর থেকে চুপচাপ বের হয়।
ডলি বেগমের মন খারাপ এখন কাউকে ছুঁয়ে যেতে পারে না। সবার আলাদা সংসার, সন্তান আছে, সব মায়া তাদের সন্তানদের ঘিরে। মায়ের মন খারাপ কেউ টের পায় না।
রোহান বসে আছে তখনই জেমির চিৎকার শুনে ঘরের ভিতরে যায়। ঘরের ভিতরে যেয়ে দেখে মেয়েটার পা রক্তে মেখে আছে৷ কাঁচের ভাঙা টুকরায় জেমির পা কেটে গেছে। সে কি কান্না। জেমির বয়স এবার আটবছর। মেয়ের চোখে পানি দেখে রোহানের খারাপ লাগে, রোহানের দুনিয়া জেমিকে ঘিরে, জেমি হাসলে তখন আনন্দ লাগে, জেমি কাঁদলে তখন মন খারাপ হয়। মেয়ের যখন জ্বর হয় তখন ঘরের ভিতরে কেমন অশান্তি লাগে, মনে হয় পুরো ঘরটার অসুখ হয়েছে।
জেমি পা দিয়ে হাঁটতে পারে না, ওয়াশরুমে যেতে হলে কাঁধে করে নিতে হয়। জেমি মায়ের গলা ধরে পিঠে উঠে ওয়াশরুমে যায়, স্কুলে যায়না তবে প্রাইভেট দুদিন বন্ধ দিলেও তারপর যেতে হয়। জেমির মা পিঠে করেই রিক্সা পর্যন্ত নিয়ে যায় তারপর রিক্সায় স্যারের প্রাইভেটে যায়।
জেমিকে রোহানও সেদিন পিঠে নিয়ে রিক্সায় তুলে দেয়, মেয়ের পায়ে যেনো আঘাত না লাগে সেদিকে রোহান এবং সামিনা খেয়াল রাখে।
সেদিন রোহান বসে আছে সোফার উপর, অফিসের একটা কাজ করছে। তখনই কানে আসে মা আর বাসায় কাজ করা মেয়েটার কথা।
বাসায় যে মেয়েটা কাজ করে তার নাম সাহেরা। সাহেরা বলে, খালাম্মা জেমির পা ঠিক হতে কতো সময় লাগবে? ডলি বেগম বলে, ডাক্তার বলেছে ঠিক হবেতো। তুই একবার আমারে ধরে জেমির ঘরে নিয়ে যা। সাহেরা ডলি বেগমকে ধরে জেমির কাছে নিয়ে যায়।
জেমি বলে, দাদী আমার ভালোই লাগছে। বাবা মায়ের পিঠে চড়ে প্রাইভেটে যাচ্ছি, গলা ধরে যেতে ভালো লাগে। আমি চাই এতো তাড়াতাড়ি পা যেনো ঠিক না হয়। ডলি বেগম বলে, কিসব কথা বলিস? জেমি দাদীকে ধরে হাসে।
ডলি বেগম বলে, ছোটোবেলায় তোর বাবার ভয়ংকর জ্বর হয়। তখন ক্লাস ফাইভে পরীক্ষা ছিলো। তোর দাদা ভাই থাকে রাজশাহী। ঢাকা থাকি আমি একা ওদের তিন ভাই বোনকে নিয়ে। পরীক্ষার দিন রোহানকে পিঠে করে হলে নিয়ে যেতাম, রোহান গলা ছাড়তে চাইতো না, আমাকে বলতে পরীক্ষার হলে ওর পাশে বসে থাকতে। সেবার এভাবেই পরীক্ষা দেয়। এখন রোহান কতো বড় হয়ে গেছে।
রোহানের মায়ের কথাগুলো কানে আসে, হ্যাঁ মা ঠিক বলেছে ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার সময় ভীষণ জ্বর ছিলো। মা পিঠে করে প্রতিদিন পরীক্ষা দিতে নিয়ে যেতেন, রোহানকে পিঠে নিয়ে যাওয়ার কারণে মায়ের সেবার কোমর ব্যথাও হয়। সে ব্যথা কমাতে ওষুধ খেতে হয়। রোহান ছোটোবেলায় একটু বেশিই ভারী ছিলো।
সামনে রাখা ল্যাপটপ বন্ধ করে রাখে জীবনের হিসেব করতে বসে যায়, চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দেয়। কিছুসময় পরে চোখ খুলে বড় আপাকে কল দেয়।
‘হ্যালো আপা শুনছিস? আমি ঠিক করেছি মাকে নিয়েই যাবো। একটু সময় সবাই মিলে কষ্ট করলে মাকে নিয়ে তেমন অসুবিধা হবে না।’
সবার সাথে রোহান মায়ের সব কাগজপত্র গুছিয়ে নেয়। মাকে নিয়েই প্লেনে উঠে। মা এবারই প্রথম প্লেনে উঠেছে, রোহানের হাত শক্ত করে ধরে আছে। রোহান বুঝতে পারে মা ভয় পেয়েছে।
এখানে আসবার পরে মা আগের থেকে বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। অবশ্য মায়ের ওষুধ সাথে করে নিয়ে এসেছে। ওষুধ খাওয়ার পরে সুস্থ হয়।
হজ্বের মাঠে সবাই হাঁটছে তখনই ডলি বেগম ভীষণ অসুস্থ হয়ে যায়। রোহান তাকিয়ে দেখে মা পা দিয়ে হাঁটতে পারছে না। নিতু বলে রোহান তোরে বললাম একটা হুইলচেয়ার নিতে কেন যে নিলি না। এখন মা আর পা ফেলতে পারছে না, কি করবি?
রোহান দেখে মায়ের দুইপাশ থেকে নিতু আপা আর রোহানের স্ত্রী সামিনা হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রোহান কাঁধের ব্যাগটা দুলাভাইর হাতে দেয়। মায়ের কাছে বসে বলে, মা শক্ত করে গলা ধরো।
ডলি বেগম শক্ত করে রোহানের গলা ধরে, রোহান মাকে পিঠে নিয়ে নেয়। রোহান বলে মা শক্ত করে ধরবে কিন্তু। মায়ের শরীরে তেমন ওজন নেই, রোহানের কষ্ট হয় না, মাকে পিঠে নিয়ে হাঁটতে থাকে। রোহানর ঘাড়ের কাছে মায়ের মাথা, দুই একবার জিজ্ঞেস করে মা কষ্ট হয়? ডলি বেগম বলেন, না।
রোহান মাকে পিঠেই নিয়ে হাঁটতে থাকে শব্দ করে পড়ে— “লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলুক লা-শরীকা লাক্” একই সুর ভেসে আসে পুরো ময়দান থেকে, রোহানের চোখে পানি জমে যায়, টের পায় মা দোয়া পড়ছেন সাথে ফুপিয়ে কাঁদছেন। আশেপাশে অনেকেই রোহান এবং ডলি বেগমের মতো কাঁদছে। রোহান সামনে হাঁটতে থাকে মাকে নিয়ে।