Collected লাশ রহস্য

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
463
Messages
7,484
Reaction score
6,144
Points
4,063
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
লাশ রহস্য

মূল লেখকঃ মুহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম






সাব-ইন্সপেক্টর রফিক লাশের ওপরের ভেজা চটটি সরাতেই আঁতকে উঠলেন। গলার নিচ থেকে পা পর্যন্ত এক যুবতীর শরীর, মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ঝলসানো। কোনো তীব্র এসিড বা বিশেষ কেমিক্যাল দিয়ে মুখের চামড়া এমনভাবে গলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে চোখ, নাক বা ঠোঁটের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু পোড়া মাংস ঝুলছে।

সাব-ইন্সপেক্টর হাত দুটি পরীক্ষা করতে গিয়ে চমকে উঠলেন। মেয়েটির দুই হাতের তালু এবং সবকটি আঙুলের অগ্রভাগও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে!

পুলিশের ধারণা, খুনি অত্যন্ত বিচক্ষণ । লাশটির পরিচয় গোপন করাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। চরের নির্জনতায় এই কাজ শেষ করে নদীপথে পালিয়ে যাওয়া সহজ।

মৃতদেহের পরনে ছিল একটি অতি সাধারণ সুতির থ্রি-পিস, যার কলারের ট্যাগটি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। কোনো অলংকার, ঘড়ি কিংবা পরিচয়সূচক চিহ্ন নেই।

পোস্টমর্টেম করার জন্য লাশটিকে পাঠানো হলো জেলা হাসপাতাল।
হঠাৎ যেন ‌চরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল এক অজানা বিভীষিকায়। কে এই তরুণী? কেন তাকে এত নির্মমভাবে হত্যা করে তার রূপ ও পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হলো? ধোঁয়াটে চরের মতোই রহস্যের চাদরে ঢাকা পড়ে রইল একট জীবনের নির্মম পরিণতি।

২:
ময়না-তদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘শ্বাসরোধ করে হত্যা’ এবং পরবর্তীতে ‘মুখ ও হাত রাসায়নিক প্রয়োগে পোড়ানো’র কথা উল্লেখ করেছে।স্থানীয় থানা পুলিশের তিন সপ্তাহেও তদন্তে ‌এক চুলও এগোতে পারলেন না।

পুলিশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল পরিচয় শনাক্তকরণ। আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেসে খোঁজার কোনো সুযোগ নেই, কারণ ১০টি আঙুলের করাল অংশই রাসায়নিক দিয়ে পুড়িয়ে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। লাশের মুখ ও আকৃতি গলিয়ে দেওয়ার কারণে চেহারা দেখে শনাক্ত করারও উপায়ও নেই।
সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন, আশেপাশের দশটি জেলায় বার্তা পাঠানো এবং নিখোঁজ সংবাদের জিডি ঘেঁটেও পুলিশ কোনো সুরাহা করতে পারল না।
থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, কিন্তু তারা সাধারণ চরের চোরাচালানকারী । এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সাথে তাদের দূরতম সম্পর্ক নেই।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুঝে গেলেন, স্থানীয় থানা পুলিশের চিরাচরিত তদন্ত পদ্ধতি দিয়ে এই পেশাদার অপরাধের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। তদন্তের জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্ম ফরেনসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক কৌশল। স্থানীয় থানা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অপারগতা প্রকাশ করল, তখন আদালতের নির্দেশে মামলাটি স্থানান্তরিত হলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই-এর কাছে।

৩:
পিবিআই-এর ক্রাইম সিন ইউনিট থেকে মামলার ভার দেওয়া হলো ইন্সপেক্টর ফয়সালকে। ফয়সাল বহু জটিল কেসের জট ছাড়িয়েছেন, কিন্তু এই কেসে এসে তিনিও খেই হারিয়ে ফেললেন। টানা এক মাস উনিশ ঘণ্টা করে খাটনি করেও কোনো সুরাহা করতে পারলেন না। লাশের পায়ের সাইজ, কাপড়ের ব্র্যান্ড, এমনকি পকেটে থাকা এক টুকরো সাধারণ টিস্যু কাগজ—কোনো কিছুই কোনো ক্লু দিল না। বিষণ্ণ মনে এক সন্ধ্যায় ফয়সাল বাড়িতে ফিরলেন।
ফয়সালের ‌স্ত্রী চা নিয়ে স্বামীর পাশে বসলেন।
ফয়সাল কে জিজ্ঞেস করলেন-তোমার নতুন মামলার তদন্তের খবর কি?
ফয়সাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, " খুনি একটা চিহ্নও রাখেনি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পুড়িয়ে দিয়েছে, চেহারা গলিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞান যেখানে শেষ, আমি যেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটির পরিচয়ই যদি না পাই, তবে অপরাধীকে ধরব কীভাবে?"
ইন্সপেক্টর ফয়সালের স্ত্রী ‌চায়ে চুমুক দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, "অপরাধী হাত আর মুখের চামড়া পুড়িয়ে দিতে পারে ফয়সাল, কিন্তু মানুষের শরীরে কি কেবল আঙুল আর মুখেই পরিচয় থাকে? যদি মেয়েটি কোনো আধুনিক কাজের সাথে যুক্ত থাকে, তবে তার শরীরে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা বাইরে থেকে পোড়ানো সম্ভব নয়? যেমন ভেতরের কোনো চিকিৎসা বা কসমোটিক হাড়ের কাজ?"

স্ত্রীর সাধারণ মন্তব্যটা ফয়সালের মাথায় যেন বজ্রের মতো আঘাত করল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। অপরাধী হাতের চামড়া আর মুখের মাংস পুড়িয়েছে, কিন্তু ভেতরের অবকাঠামো তো পোড়াতে পারেনি!

পরদিন সকালেই ফয়সাল ফরেনসিক এক্সপার্ট ও ডেন্টাল সারজনকে নিয়ে নতুন করে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পর্যালোচনায় বসলেন। মেয়েটির চোয়ালের এক্স-রে ছবি গভীরভাবে পরীক্ষা করতেই ডেন্টাল সার্জন বললেন, "ইন্সপেক্টর, মেয়েটির ওপরের ক্যানাইন দাঁতে একটা বিশেষ স্মাইল-ডিজাইন বা সিরামিক ভেনিয়ার বসানো ছিল, যা সাধারণ মানুষ করায় না। এটি একটি উচ্চমূল্যের কসমোটিক ডেন্টাল ট্রিটমেন্ট।"
ফয়সালের চোখে আশার আলো জ্বলে উঠল। অন্ধগলি থেকে অবশেষে একটি রাস্তার সন্ধান পেলেন যেন তিনি।

৪:
দাঁতের সেই বিশেষ সিরামিক ভেনিয়ারের সূত্রে ধরে ফয়সাল রাজধানীর নামীদামী কসমোটিক ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে খোঁজ নেওয়া শুরু করলেন।

তিন দিনের মাথায় গুলশানের এক অভিজাত ডেন্টাল ক্লিনিকে মিলল সন্ধান। উক্ত দাঁতের রিকনস্ট্রাকশন করানো হয়েছিল এক উঠতি গ্ল্যামার মডেলের। মেয়েটির নাম রোদেলা।
রোদেলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কল ডিটেইলস রেকর্ডের (সিডিআর) সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামতেই সব জট খুলতে শুরু করল। রোদেলা গত দেড় মাস ধরে নিখোঁজ, কিন্তু তার পরিবারকে ভয় দেখিয়ে চুপ রাখা হয়েছে।
ফয়সাল সাইবার ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে রোদেলার শেষ ফোনালাপ ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে জানতে পারলেন, দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি কাইয়ুম চৌধুরীর ছেলে আরিয়ানের সাথে তার গোপন সম্পর্ক ছিল।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরিয়ানকে পিবিআই হেডকোয়ার্টারে আনা হলো ।সে প্রথমে সব অস্বীকার করল। কিন্তু ফয়সাল যখন রোদেলার মেডিকেল রেকর্ড, আরিয়ানের ফার্মহাউজের কাছের সিসিটিভি ফুটেজ (যেখানে রোদেলাকে শেষবার ওই গাড়িতে উঠতে দেখা যায়) এবং তার গাড়ির ড্রাইভারের জবানবন্দি মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন, তখন আরিয়ানের মুখমণ্ডল কালো হয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত আরিয়ান স্বীকার করল, রোদেলা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল এবং তাদের গোপন কিছু ছবি প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। নিজের পারিবারিক সুনাম ও নতুন এক শিল্পপতির মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক রাখতে আরিয়ান কয়েকজন পেশাদার খুনি দিয়ে রোদেলাকে অপহরণ করে হত্যা করায়।

সমাপ্ত
 
Back
Top