Collected কিংবদন্তি

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
453
Messages
7,231
Reaction score
5,456
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
কিংবদন্তি

মূল লেখকঃ রুবাইয়াত হোসেন






আমার প্রেমিক শিমুলের সাথে প্রথম পরিচয়ের পর্বটা খুব সুখকর ছিলো না, কেননা সেদিন সে আমার কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠেছিলো ভূত দেখার মত। এর কারণ হিসেবে পরবর্তীতে সে আমাকে জানিয়েছিলো- আমার কন্ঠস্বর নাকি অবিকল তাঁর মৃতা মায়ের অনুরূপ, যে বহুল পরিচিত স্বরেই নাকি গভীর রাতে শিমুলকে কেউ একজন ডাকতে আসতো। নিশির ডাকের মতোন!

তার আগে বলে নেয়া ভালো- এটি একটি প্রেমের গল্প নাকি নিছক রূপকথা- সেটি নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, কেননা আশপাশের মানুষজন কিংবা বন্ধুবান্ধব অনেককেই আজকাল বলতে শুনি- সত্যিকারের প্রেম বলতে নাকি আসলে কিছু নেই। নাটক-সিনেমা কিংবা গল্প-উপন্যাসে যা তুলে ধরা হয়, সেগুলো নাকি শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। এ কথার সূত্র ধরেই আমার কাছে মনে হয়েছে- যেহেতু বাস্তব জীবনে ভালোবাসা বলতে কিছু নেই, তাই প্রেম আর রূপকথা এ দু'টি শব্দ সমার্থক হয়ে উঠতে পারে...

যদিও আমার প্রেমিক শিমুল- যাকে একদিনের জন্য আমি স্বামী হিসেবে পেয়েছিলাম- সে কিছুতেই এসব কথা মানতে চাইতো না। আধুনিক যাপিত জীবন কিংবা সম্পর্কের ধরণ নিয়ে যতোই নতুন নতুন টার্ম উদ্ভাবিত হোক না কেন, অস্থির দুনিয়ায় সুস্থিরতার বিপরীতে রোচিং, সিচুয়্যেশনশিপ বা মাইক্রো-ম্যানস ম্যানিয়ার মত যতোই নতুন নতুন রিলেশনশিপ ট্রেন্ড আসুক- শিমুল বোধহয় ছিলো এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। আমি জীবনানন্দের এক ভক্ত পাঠিকা হিসেবে সবখানে জীবনানন্দের ছায়া দেখতাম শুধু, এ কারণে শিমুলের এসব ছেলেমানুষি দেখে আমার তখন মনে হতো- শিমুল বুঝি নির্জনতার সে মহান কবির মতোই কেউ একজনঃ কোনো গভীরভাবে অচল মানুষ, এই নবীন শতাব্দীতে, নক্ষত্রের নিচে!

শিমুল আমাকে কাবু করেছিলো এ জীবনানন্দ দিয়েই, যদিও আমার সাথে ওর পরিচয়ের পর্বটা সুখকর কিছু ছিলো না- সে আগেই বলেছি। ওকে তখন আমার কাছে মনে হয়েছিলো মানসিক বিকারগ্রস্ত একজন! সেদিন আমি নীলক্ষেতের ফুটপাথে জীবনানন্দের অগ্রন্থিত কবিতার একটা বই খুঁজছিলাম। সম্ভবত প্রিন্ট আউট হয়ে যাওয়ার কারণে সেটা অনলাইন কোনো বুকস্টোরে পাওয়া যাচ্ছিলো না আর। তখনই হ্যাংলা-পাতলা এক তরুণকে দেখেছিলাম বইটা কিনে নিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করছে। আমি প্রায় ছুটে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বুড়ো দোকানদারকে বললাম- "এ বইটাই আমাকে আরেক কপি দিন.."

আমার কন্ঠ শুনে সেই হ্যাংলা-পাতলা ছেলেটা এমনভাবে চমকে উঠলো যে তাঁর হাত থেকে বইটা পড়ে গেছিলো নীচে রাস্তার পাশে জমে থাকা ময়লা কালচে পানিতে, অথচ টিনেজ বয়স থেকে আমার চেহারার মত আমার কন্ঠস্বর নিয়েও প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিলো নিজের মধ্যে। সুমধুর কন্ঠ না হলে মামা-খালুর জোর না থাকা সত্বেও রেডিও-টিভির তালিকাভূক্ত শিল্পী হয়ে ওঠা যায় না, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কম বয়েসেই যে অর্জন আমার ছিলো। অথচ আমার কন্ঠ শুনেই কি না ছেলেটা ভূতে পাওয়ার মত চমকে উঠলো! আমি কিছুটা অস্বস্তি, আর অনেকখানি বিরক্তি নিয়ে আবার দোকানদার মামাকে বলেছিলাম- "বইটা কত?! আরেক কপি দিন প্লিজ তাড়াতাড়ি..."

ঐদিন সে বইটা আমি নিতে পারি নি, ওখানে মাত্র এক কপিই ছিলো। আর আমার সামনেই সে বইয়ের মূল্য পরিশোধ করে প্রায় পালিয়ে বাঁচলো শিমুল!

মাথা থেকে সেদিনের ঘটনা ঝেড়ে ফেলে বইটা এরপরও আমি অনেক খুঁজেছিলাম, কিন্তু পাই নি কোথাও। তবে সপ্তা'খানেকের মাথায় ঐ নীলক্ষেতেই আবার জীবনানন্দকে খুঁজতে খুঁজতে আমি দেখা পেয়ে গেছিলাম শিমুলের। একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিলো আমার জন্য। শিমুল বইটা ফটোকপি করে সুন্দর বাঁধাই করে এনেছিলো সেদিন। আন্তরিক গলায় বললো- "গত চারদিন যাবত আপনাকে এখানে খুঁজছি। আমার ধারণা ছিলো- বইটার খোঁজে আবার আসবেন আপনি, যদিও এই বই আপনি সহজে পাবেন না আর। যদি কিছু মনে না করেন, আপনার জন্য আমার বইটাই ফটোকপি করে বাঁধিয়ে এনেছিলাম..."



আমার খুব বিরক্ত লাগলো ছেলেটাকে দেখে। এর কান্ডখারখানা এমন কেনো? একদিন আমার কন্ঠ শুনে চমকে ওঠে, অন্যদিন বই বাঁধিয়ে নিয়ে আসে! সুন্দরী মেয়ে পটানোর ধান্দা নয় তো! আমি রুঢ় গলায় বলেছিলাম- "আপনার বই আমি নেবো কেনো শুধু শুধু!"

শিমুল একটু হাসলো। আগের মতোই আন্তরিক গলায় বললো- "কেননা আমিও জীবনানন্দের ভক্ত! খুব খুশি হবো আপনি উপহারটা নিলে!" তারপর একটু বিব্রত হয়ে বললো- "সেদিন ময়লা পানিতে বইটা পড়ে না গেলে ওটাই নিয়ে আসতাম আপনার জন্য..."

বলতে দ্বিধা নেই, শিমুলের কান্ডকারখানা বিরক্তিকর হলেও ওর কন্ঠ শুনে আমি মোহগ্রস্ত হয়েছিলাম। আমি নিজে সঙ্গীতচর্চা করি, তাই সুন্দর গলার মর্ম বুঝি। যদিও প্রচলিত অর্থে সুন্দর বা আকর্ষণীয় বলতে যা বোঝায়, তেমন ছিলো না ওর কন্ঠস্বর, বরং তাতে কোথাও যেনো মিশে ছিলো জীবনানন্দীয় বিষাদ, অর্থাৎ এখানেও জীবনবাবু! অমন হৃদয়-খুঁড়ে বেদনা জাগানো কন্ঠ এর আগে আমি শুনি নি কোথাও!

সেদিনই টিএসসিতে বসে চা খেতে খেতে আমরা জীবনানন্দের পাশাপাশি আরো অনেক কিছু নিয়ে আলাপ করলাম। শিমুল জানালো- সে মূলত বইয়ের দোকানে দোকানে ভৌতিক লোকসংস্কৃতির খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে বলতে হয়- নিশির খোঁজে! ইন্টারনেটে নিশি কিংবা নিশির ডাক নিয়ে যত একাডেমিক/ নন-একাডেমিক ম্যাটেরিয়াল ছিলো- এ সবই সে জোগাড় করেছে। যত নাটক-সিনেমা আর গল্প-উপন্যাস, প্রায় সবই সংগ্রহে আছে তাঁর, তারপরো সুযোগ পেলেই পুরনো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারে। আমার সাথে তাঁর প্রথম দেখার দিনও অমন কিছু একটাই খুঁজছিলো, ফাঁকতালে জীবনানন্দের সেই দুষ্প্রাপ্য বইটা পেয়ে গেলো...

"এতোকিছু থাকতে নিশির ডাক নিয়ে আপনার এতো আগ্রহের কারণ কি?" সন্ধ্যে হয়ে আসছিলো সেদিন। একটু শীত শীত করছিলো, সাথে ভয়। তবুও আমি প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলাম।

"কারণ আমার মা মারা যাবার পর থেকে আমি প্রায়ই তাঁর গলার স্বর শুনতে পেতাম। গভীর রাতে আমাকে এসে তার মতোই ডাকতো কেউ একজন। এ কারণেই সেদিন আপনার গলার স্বর শুনে চমকে উঠেছিলাম, কেননা আপনার কন্ঠ হুবহু আমার মায়ের মতো!"

ওর কথাগুলো শুনে আমার হয়তো ভয় পাওয়া উচিত ছিলো, অথচ কেনো জানি বেচারার জন্য খুব মায়া হলো আমার। মেয়েদের প্রধানতম সে দুর্বলতা আমাকে পেয়ে বসেছিলো সেদিন। আমি একটু ইতস্তত করে নিজে থেকেই তাঁকে বললাম- "আপনি আমার নাম্বারটা রাখুন। কখনও আমার সাথে কথা বলতে চাইলে নির্দ্বিধায় ফোন দিতে পারেন..."

যদিও ফোনে আমাদের কথা হতো না খুব একটা। ঐ যে বলেছিলাম- শিমুল এক গভীরভাবে অচল মানুষ এই নবীন শতাব্দীতে, নক্ষত্রের নিচে! ও নাকি 'ডিজিটাল ডিটক্স' প্র্যাক্টিস করছে, তাই ফোন থেকে পারতপক্ষে দূরে থাকতে চায়। এ কারণে মন অস্থির লাগলেই শিমুল আমাকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বলতো। আমরা সামনাসামনি কোনো এক কফিশপে বসে গল্প করতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। আর দিনের বেলায় হলে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস তো ছিলোই।

মাঝে মাঝে শিমুল আমাকে জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতো। শ্রাবণের ছাইরঙা বহু সকাল, বসন্তের জনবিরল গভীর সন্ধ্যা, কিংবা ঘুঘুর শীতল করুণ মৃতদেহের মতো অসংখ্য কার্তিকের গোধূলি আমি সমুদ্রে সূর্য ডোবার মত করে শিমুলের কন্ঠে ডুবেছিলাম! টিএসসির অগুণতি মানুষের ভীড়ে, কিংবা ফুলার রোডের দৈত্যাকার গাছের প্রহরায় বসে শিমুল আমাকে আবৃত্তি করে শোনাতো-

"কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে

সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,

বলিল, তোমারে চাই: বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ

খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি— কুয়াশার পাখ্‌নায়..."

ঠোঁটে নজরুলের গান আর হৃদয়ে জীবনানন্দের কবিতা নিয়েও নিজের আবেগ-অনুভূতির ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ ছিলো, এ কারণে নিশ্চিত ছিলাম আমি হুটহাট প্রেমে পড়বো না। তাছাড়া, নিজের চেহারা নিয়ে অধিকতর আত্মবিশ্বাস তো ছিলোই। এ সব সত্বেও আমি শিমুলের প্রেমে পড়লাম। হতে পারে- প্রেম ব্যাপারটাই এমন। ব্যাখ্যাতীত, আচমকা, অপ্রত্যাশিত। কোনো ভনিতা না করে শিমুলকে বলেছিলামও সে কথা, যদিও শিমুল তাঁর স্বভাবসুলভ প্রশান্ত ব্যক্তিত্বে আমাকে প্রত্যাখ্যান করলো। সে আমার হাত ধরে বলেছিলো- "আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না অথৈ, কেননা খুব দ্রুতই মারা যাবো আমি। আমার ওপর কোন এক অলৌকিক অভিশাপ আছে বোধহয়, সে অভিশাপ আমাকে বাঁচতে দেবে না আর বেশিদিন..."

ওর কথা শুনে আমি সারাটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে এসেছিলাম। গালগপ্পো বা পাগলের প্রলাপ ভেবে উড়িয়ে দেই নি, কেননা ততদিনে আমিও বুঝতে শিখেছি যে- পৃথিবীতে অনেকের সাথেই ব্যাখ্যার অতীত অনেক কিছু ঘটে। শিমুলের সাথে সত্যি কি ঘটেছিলো আমি জানি না, তবে আমি নিজ চোখে দেখেছিলাম হুবহু আমার মত দেখতে এক নারীকে। সম্ভবত শিমুলের সাথে পরিচয়ের পর থেকেই মেয়েটা আমাকে অনুসরণ করছিলো। প্রথমদিন তাঁকে দেখে ভাবলাম- আমার চোখের ভুল!। কেননা, যমজ ভাইবোন ছাড়া চেহারায় অমন অবিশ্বাস্য মিল কখনও থাকতে পারে না কারোরই, অথচ আমি ছিলাম বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান!

তাছাড়া অভিশাপ কিংবা তন্ত্র-মন্ত্রের বিষয়টা সত্য না হলেও দিন দিন প্রকৃত অর্থেই শিমুলের শরীর ভেঙ্গে পড়ছিলো। ক্রমেই হাত-পা সব অসাড় হয়ে আসছিলো তাঁর, সাথে রক্তবমি। ডাক্তাররা যদিও কিছু শনাক্ত করতে পারলেন না, স্নায়ুর সমস্যা ভেবে শত রকম টেস্ট করানো হলো। একবার বলা হলো পাকস্থলী ক্যান্সার, আরেকবার কিডনি সমস্যা। আশ্চর্যজনকভাবে কিছু কিছু সময়ে টেস্টের রেজাল্ট আসতে লাগলো খুবই ভালো, অথচ ততদিনে শিমুলের প্রবল শ্বাসকষ্টও যুক্ত হয়েছে! সব মিলে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

এ কারণে শিমুল যেদিন নিজেকে মৃত্যুপথযাত্রী দাবী করে আমার প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলো, আমি ওর সাথে তর্ক করতে পারি নি। কেননা আমি বুঝতে পেরেছিলাম- শিমুল সত্য কথাই বলছে। যে কোনোদিন শিমুলের খুব খারাপ একটা কিছুই ঘটে যেতে পারে। ওর জায়গায় আজ আমি, কিংবা আত্মমর্যাদাবোধ-সম্পন্ন যে কেউ হলেও নিজের এমন ভঙ্গুর জীবনের সাথে আরেকজনকে জড়িয়ে শুধু শুধু তাঁকেও ভারাক্রান্ত করতাম না।

আমি হাল ছাড়ি নি যদিও, কেননা বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমি ছোটবেলা থেকেই একটু জেদি ধরণের ছিলাম। তবে সব থেকে বড় কারণ সম্ভবত শিমুলের প্রতি প্রেম আমাকে অন্ধ করেছিলো। আমার অনুভূতি, জীবন কিংবা চেতনা বিলীন হয়ে গেছিলো শিমুলে, এ কারণে মহাবিশ্ব কিংবা অস্তিত্বের সমার্থকও আমার কাছে হয়ে উঠেছিলো সে। তাছাড়া মুখে যা-ই বলুক না কেন, আমি নিশ্চিত ছিলাম শিমুল নিজেও মনে মনে আমাকেই চায়! প্রকৃতিগতভাবেই মেয়েদের ভালোবাসা বোঝার এক অন্তর্গত ক্ষমতা থাকে, সে ক্ষমতাবলেই আমি বুঝেছিলাম- ওর প্রতি আমার ভালোবাসাটুকু কোনোমতেই একপাক্ষিক নয়। হতে পারে- আমার প্রতি শিমুলের গোপন অগাধ প্রেমটুকু অনুভব করেছিলাম দেখেই সময়ের সাথে সাথে ওকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও আমার বাড়ছিলো। সে-ও আমাকে না দেখে থাকতে পারতো না বেশিদিন। আমার প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও প্রায়ই আমাকে ফোন দিয়ে বলতো- "অথৈ, একটু আসবে টিএসসিতে? তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে!"



কাছে-দূরের এই টানাপোড়েনের মাঝেই আমাদের দিনগুলো পার হয়ে যাচ্ছিলো। শিমুলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো আরও, রাতে তাঁর নিশির ডাক শোনার ঘটনাও বেড়ে গেছিলো আগের চেয়ে। তাঁর মায়ের কন্ঠস্বরের সাথে আমার কন্ঠে মিল থাকায় শিমুলের প্রায়ই নাকি মনে হতো আমি বুঝি আজকাল তাঁকে গভীর রাতে ডাকছি! সে ডাকে মোহগ্রস্ত হয়ে বাইরে বেরুলেই কোনো এক দুর্ঘটনায় মারা পড়বে সে, হয়তো রোড-এক্সিডেন্ট নয়তো ট্রেনে কাটা পড়ে! ঠিক বাংলার গ্রামাঞ্চলের কিংবদন্তীতে নিশি যেমন মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে প্রথমে, তারপর হত্যা করে পানিতে ডুবিয়ে....



শিমুল একটু হেসে বলতো- "লোককথা অনুযায়ী নিশি মানুষের প্রিয় কারো রূপ ধরে আসে, যেনো তাঁকে ভুলিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়াটা সহজ হয়। এই মুহূর্তে তোমার চেয়ে প্রিয় আমার কাছে আর কিছু নেই দেখেই বোধহয়.....।"



ওদিকে আমারও তখন ঘন ঘন দেখা হচ্ছিলো সেই মেয়েটার সাথে, যে দেখতে অবিকল আমার মত। মেয়েটা আমাকে হাত ইশারা করে ডাকতো, অথবা বোঝাতে চাইতো কিছু একটা। অথচ আমি তাঁর দিকে এগুতে গেলেই মানুষের ভীড়ে মিশে যেতো। শান্তিনগর মোড়, মৌচাক আর খিলক্ষেতে এমন ঘটনা ঘটেছে কয়েকবার।

আমার একদিন ক্ষীণ সন্দেহ হলো, এটাই শিমুলকে রাত-বিরেতে ডেকে বেড়ানো সেই নিশিরূপী অলৌকিক সত্তা নয় তো!? হয়তো ও-ই আমার রূপ ধরে শিমুলকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মেরে ফেলার ছুতো খুঁজছে।

আমার এমন সন্দেহের জবাবে অবশ্য শিমুল পরিষ্কার করে কিছু বলে না, শুধু মেয়েটার কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনেই বিড়বিড় করলো- "আমার অপরাধটা যে কী, তা জানতে পারলে ভালো হতো! কেনো আমাকে এমন এক ভৌতিক অভিশাপের শিকার হতে হলো!"

আমি শিমুলের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললাম- "তুমি নিশ্চিতভাবেই একজন ভালো মনের মানুষ, আর পৃথিবীতে ভালো মানুষেরাই কষ্ট পায় সব থেকে বেশি। একারণেই বোধহয়..."



শিমুল আমার কথা শুনে তাকিয়ে ছিলো অন্যদিকে। নীচু গলায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে জবাব দিয়েছিলো- "আমার সাথে থেকে থেকে তোমার গোছানো জীবনটাও কেমন এলোমেলো হয়ে উঠলো, না অথৈ!"

আমি তখন এ প্রশ্নের জবাব দিতে, আমার শিমুলের মন ভালো করে দেয়ার মত একটি কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যসম্ভার হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। রবীন্দ্র থেকে নজরুল, নেরুদা কিংবা এডগার এলেন পো থেকে রাধারমণ অথবা লালন, কিন্তু সে পরম সুন্দরের সন্ধান পাই নি আর। এই প্রথম জীবনানন্দও আমাকে হতাশ করলেন। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম- শিমুলের প্রতি আমার প্রেমের গভীরতা বোঝানোর মত উপযুক্ত পংক্তিটি এখনো কোনো সাহিত্যিক রচনা করেন নি!

দু'জনই খুব মন খারাপ করে যার যার বাসার পথে রওনা হয়েছিলাম সেদিন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম- খুব দ্রুতই শিমুলকে বিয়ের ব্যবস্থা করবো। এরপর যা হওয়ার হবে! জেদের সাথে সাথে সাহসেরও কোন কমতি ছিলো না আমার। আমি ধরেই নিলাম- শিমুল মারা যেতে পারে যে কোন দিন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি তাঁকে আমার স্বামী হিসেবে পেতে চাই। ইভান তুর্গেনিভ তো বলেই গেছেন- ভালোবাসার জন্য অনন্তকালের কোনো প্রয়োজন নেই, একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। আমার জন্য না হয় সে এক মুহূর্তই আসুক।

সম্ভবত এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়াতেই সে রাতে আরেক অথৈ এর সাথে প্রথমবারের মত কথা হয়েছিলো আমার। নানা অস্থিরতায় ঘুম আসতে চাইছিলো না, রাত তিনটা পর্যন্ত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে তাই জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম একটু দম নেবো বলে, তখনই দেখলাম হুবহু আমার মত চেহারার সেই অদ্ভুত মেয়েটি বাসার নিচের গলিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমারই দিকে, যেনো সে জানতো আমি এখন জানালা খুলে দাঁড়াবো। এই মাঝরাতে তিনতলার ওপর থেকে তাঁর সাথে স্বাভাবিক কথোপকথন চালিয়ে যাওয়াটা সম্ভব না হলেও এই মেয়ে (কিংবা অন্যকিছুর) পুরো বিষয়টাই তো কেমন অবাস্তব। তাই অসম্ভব জেনেও আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- "তুমি কে? কেনই বা আমার পিছু নিয়েছো?"

মেয়েটা শুধু মুখ নাড়লো যদিও, কিন্তু তারপরো আমি তাঁর জবাব শুনতে পেলাম- "আমার পরিচয় পাবার মত যথেষ্ট যোগ্য এখনো তুমি হয়ে ওঠো নি!"

আমার রাগ উঠে গেলো। ক্ষুব্ধ গলায় বললাম- "তুই কি নিশি সেজে প্রতিদিন আমার শিমুলের কাছে যাস? যদি তোর জন্য আমার শিমুলের কিছু হয়, তাহলে তোকে কিন্তু আমি খুন করবো!"

সে আমার কথা শুনে সুন্দর করে হাসলো। তারপর শান্ত গলায় বললো- "ওকে আরো ভালোবাসতে হবে অথৈ! নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। একমাত্র তাহলেই বাঁচানো সম্ভব হবে ছেলেটাকে! এতদিন ধরে এ কথাটাই তোমাকে বোঝাতে চাচ্ছিলাম..."

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম আমরা দু'জনই। কেনো জানি, হঠাৎই আমার চোখে পানি চলে এসেছিলো তখন। একটু আগেই নীচের গলিতে দাঁড়ানো যে মেয়েকে তুই-তোকারি করেছি, সে তাঁকেই উদ্দেশ্যে করে এবেলা আমি কাঁদতে কাঁদতে জানালাম- "আমি, তুমি কিংবা দু'জনই মিথ্যা হতে পারি অথৈ, কিন্তু শিমুলের প্রতি আমার ভালোবাসা মিথ্যে নয়।"



আরেক অথৈ বললো না কিছু। তবে বাতাসের মত চুপ থেকে আমার চোখের সামনেই মিলিয়ে যেতে যেতে জানিয়েছিলো- "তাহলে ওকে বিয়ে করে ফেলো, কেননা শিমুলের হাতে সময় আছে আর মাত্র ৩ দিন..."

***

(শেষ কথা)

সত্যি সত্যি শিমুল তার তিন দিনের মাথায় মারা গেছিলো, তবে ওর মৃত্যুর দিন সকালেই ওকে বিয়ে করেছিলাম আমি। সে হিসেবে অল্প সময়ের জন্য হলেও আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ছিলাম। সন্ধ্যার পরপর শিমুল একটা সাদা পাঞ্জাবি মাথায় গলিয়ে তৈরি হচ্ছিলো আমাকে নিয়ে ফুলার রোড যাবে বলে, যেখানে বসে প্রায়ই সে আমাকে জীবনানন্দের কবিতা শোনাতো। ঠিক তখনই তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হলো, আর মুখ দিয়ে ছলকে ছলকে রক্ত আসছিলো তরল গোলাপের মত। আমি ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে এম্বুলেন্স আসতে বললাম। ফুলার রোডের বদলে আমাদের গন্তব্য হলো নিকটবর্তী কোনো হাসপাতাল, ইমার্জেন্সিতে পৌঁছানোর পর যদিও কর্তব্যরত ডাক্তার শিমুলকে মৃত ঘোষণা করলেন। তখনো তাঁর গায়ে ছিলো সন্ধ্যার সেই সাদা পাঞ্জাবি, আর আমার পড়নে লাল শাড়ি....

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি ইমার্জেন্সির বাইরে রাখা লম্বা কাঠের বেঞ্চিতে মাথা এলিয়ে বসে ছিলাম। শোক নয়, বিহ্বলতা নয়, আমার চোখে সে সময় ভর করেছিলো রাজ্যের ক্লান্তি। স্বামীর মৃত্যুতে যেনো পরম কোনো নির্বাণ খুঁজে নিয়েছিলাম আমি, তাই সত্যি সত্যি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে...

ঘুমের মধ্যেই তখন আমার স্বপ্নে এসে হাজির হয়েছিলো সেই অথৈ। আমাকে দেখে বৃষ্টির মতোই রিনঝিন শব্দে হাসতে লাগলো। খুশি খুশি গলায় বললো- "অভিনন্দন অথৈ! তুমি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছো!"

আমি কিছু বললাম না, ওকে দেখে আমার রাগ হওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু কেনো জানি না, ঠিক রাগও করতে পারলাম না।

"তুমি সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলে না আমার পরিচয়? তখন জবাবটা দেই নি, কারণ জবাব শোনার যোগ্যতা তোমার ছিলো না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি নিজেকে প্রমাণ করেছো, তাই এখন তোমাকে আমার পরিচয় দেয়াই যায়! আমার নাম বেহুলা! লোককাহিনীতে বেহুলা-লখিন্দরের গল্প শুনেছো না? আমিই সে!"

স্বপ্নের মধ্যেই আমি জিজ্ঞেস করলাম- "আমার কাছে আর কি চাও? আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে..."

বেহুলা হাসতে হাসতেই বললো- "তোমাদের কেবল শুরু! আমি শিমুলকে আবার তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো, যেমন ফিরিয়েছিলাম লখাকে..."

আমি চমকে উঠলাম। স্বপ্ন স্বপ্নই, তারপরো মনে হচ্ছিলো- এই মেয়ে কি সত্য বলছে?

বেহুলা আমার মনের কথা বুঝলো। হাসিমুখেই জবাব দিলো- "হ্যাঁ, সত্যি! আমার সেই ক্ষমতা আছে। কিংবদন্তী পড়েছো না যে- বেহুলা ভেলা দিয়ে ভেসে স্রোতের উজানে যেতে যেতে দেবলোকে পৌঁছে গিয়েছিলো, সেই স্রোত আর কিছুই নয়। সেটা হলো আসলে- 'সময়'! আমি এখন শিমুলকে নিয়ে অতীতে ফেরত যাবো। তুমি ছাড়া মৃত্যুর পরও শিমুল আর কারো সাথে অন্য কোথাও যেতে রাজি হতো না, অপরিচিত কোনো মেয়ের সঙ্গে তো নয়ই!" বেহুলা আবারো একটু হাসলো। "এজন্যই আমাকে তোমার রূপ ধারণ করতে হয়েছে। বুঝেছো?! আরো একটা দার্শনিক কারণ অবশ্য আছে, কিন্তু সেটা ব্যাখ্যা করার সময় এটা নয়!"

আমি কোনো জবাব দিলাম না। ঘুমের মধ্যেই ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগলাম। বেহুলা নরম গলায় বললো- "জগতে অনেক রকম শক্তির টানাপোড়েন চলে। এর মধ্যে ভালো শক্তি যেমন আছে, খারাপও আছে। অশুভ সেই শক্তি কখনও চায় না পৃথিবীতে সুন্দর হৃদয়ের মানুষেরা বেশিদিন বাঁচুক। এ কারণেই শিমুল অমন এক প্রাণঘাতী জাদুতে আক্রান্ত হয়েছিলো!"

আমার মনে পড়লো- একদিন শিমুলকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আমি ঠিক এ কথাটাই বলেছিলাম! বলেছিলাম- "পৃথিবীতে ভালো মানুষেরাই কষ্ট পায় সব থেকে বেশি..."

"আমার যাবার সময় হয়েছে, আমি এখন তোমার স্বামীকে নিয়ে অতীতে রওনা দেবো"- বেহুলার কন্ঠ শুনে আমার ঘোর ভাঙ্গলো। সে আবারও কোমল গলায় বললো- "তোমরা ভালো থেকো। আমি ইতিহাস, কিংবদন্তী কিংবা লোককাহিনীর পাতা থেকে তোমাদের মত প্রেমিক-প্রেমিকাদের আশীর্বাদ করে গেলাম। তোমরা হারবে না কখনও।"

বৃষ্টির তোড় আরো বেড়েছে, এরই মধ্যে আমার ঘুম ভাঙ্গলো শিমুলের ডাকে। সে মৃদু গলায় ডাকছিলো, আর আমার কাঁধে হাত রেখে অল্প অল্প ধাক্কা দিচ্ছিলো বাচ্চাদের দোলনায় দোলানোর মতন। চোখ মেলে প্রথমে কয়েক মুহুর্ত বুঝতে পারছিলাম না আমি কোথায়! শিমুল উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইলো- "তোমার কি শরীর খারাপ? থাক, তাহলে বাদ দাও ফুলার রোড যাবো না! তাছাড়া বৃষ্টিও শুরু হয়েছে..."

আমি লাফ দিয়ে উঠে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলাম- "আমি ঠিকই আছি। তোমার শরীরের কি অবস্থা...?তুমি.. তুমি ঠিক আছো শিমুল?"

"আমার আবার কি হবে। আমি তো ভালোই আছি!"

"রক্তবমি, কিংবা শরীর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া- এগুলো কিছু আছে?"- আমি আবারও কাঁপা গলায় জানতে চাইলাম।

এবার শিমুল হাসলো। হাসতে হাসতেই আমোদিত গলায় বললো- "আমি জীবনে রক্তবমি তো দূরের কথা, বমিই করেছি হাতে গোণা কয়েকবার। আর শরীর নিস্তেজ হওয়ারও ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না, একটু ক্লান্ত লাগছে ঠিক, তবে সেটা নিশ্চয়ই বিয়ের ধকল যাওয়ার কারণে... অথৈ, তোমার আসলে কি হয়েছে, আমাকে বলবে? খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছো?"

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম- "আমার কিছু হয় নি। তুমি আমার পাশে বসে থাকো। কোথাও যাবো না আজকে, আমি তোমাকে একটু দেখি..."

নিয়তি সে সুযোগ দিলো না যদিও। শিমুল আমার পাশে বসলো ঠিকই, কিন্তু তখনই কারেন্ট চলে গেছিলো হঠাৎ। বাইরে ঝড়-জলের তোড় ততক্ষণে আরও বেড়েছে। আমি কাঁদতে কাঁদতেই শিমুলের বুকে মাথা গুঁজে ধরা গলায় বললাম- "জীবনানন্দের একটা কবিতা শোনাও না, প্লিজ!"

আমি ভেবেছিলাম শিমুল আমাকে আমার প্রিয় কবিতাটা শোনাবে। শ্রাবণের ছাইরঙা বহু সকাল, বসন্তের জনবিরল গভীর সন্ধ্যা, কিংবা ঘুঘুর শীতল করুণ মৃতদেহের মতো অসংখ্য কার্তিকের গোধূলি আমি সমুদ্রে সূর্য ডোবার মত করে যে শিমুলের কন্ঠে ডুবে থাকতাম! টিএসসির অগুণতি মানুষের ভীড়ে, কিংবা ফুলার রোডের দৈত্যাকার গাছের প্রহরায় বসে যে শিমুল আমাকে বহুদিন যা আবৃত্তি করে শোনাতো, আমার সেই প্রিয় কবিতাটা।

অথচ, সেদিন নতুন জীবন পাওয়ার রাতে, শিমুল আমাকে শোনালো-

"...বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে –

কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় –

সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,

শ্যামার নরম গান শুনেছিল – একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।"


সমাপ্ত
 
Back
Top