Collected জয় জয়ন্তী - হুমায়ূন আহমেদ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
445
Messages
7,085
Reaction score
5,081
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
জয় জয়ন্তী

মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ






পর্ব - ১
একদা এমনই বাদলশেষের রাতে–
মনে হয় যেন শত জনমের আগে
সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে;
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী।
–(শাশ্বতী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)
০১.
আমি ঘুরে-ফিরে একটা স্বপ্নই দেখি –মামুন এবং আমি পাশাপাশি একটা রিকশা করে যাচ্ছি। রিকশার চাকার সঙ্গে কি করে যেন শাড়ি পেঁচিয়ে গেল। আমি চেঁচিয়ে বলছি –রিকশা থামাতে বল, রিকশা থামাতে বল। মামুন চিৎকার করছে –এই রিকশা, থাম্ থাম। কিন্তু রিকশাওয়ালা কিছুই শুনছে না –সে সমানে প্যাডেল করে যাচ্ছে। আশেপাশে লোক জমে যাচ্ছে। একজন ট্রাফিক পুলিশ পর্যন্ত রিকশা থামাবার জন্য ছুটে আসছে … স্বপ্নের এই জায়গায় আমি জেগে উঠি। আমার বুক ধ্বক ধ্বক করতে থাকে। পানির পিপাসা হয়। নিজেকে ধাতস্থ করতে অনেক সময় লাগে। বিছানায় চুপচাপ বসে হাঁপাতে থাকি। এই সময় বাবা এসে আমার দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেন, কি হয়েছে রে মা? কি হয়েছে?
বাবার ঘর দোতলার শেষ মাথায়। রাতে তার ঘুম হয় না বললেই হয়। তিনি সামান্য শব্দেই চটি পায়ে বের হয়ে আসেন। আমি দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে যে শব্দ করি তা নিশ্চয়ই সামান্য না।
আমার পাশের ঘরে বাবলু ঘুমায়। তার ঘুম অবশ্যি কখনো ভাঙে না। আমার মত সেও দুঃস্বপ্ন দেখে। তার দুঃস্বপ্নগুলি বিকট এবং বারবার। সে বিশ্রী ধরনের গোঙানির শব্দ করতে থাকে, হাত-পা ছুঁড়তে থাকে। আমি নিজেই ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ি। বাবা ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেন –কি হয়েছে? এই বাবলু, এই! দরজা খোল, দরজা খোল। বাবলুর দুঃস্বপ্নগুলি সহজে ভাঙে না। সে গো গো শব্দ করতে থাকে এবং বিছানায় নড়াচড়া করতে থাকে। এক একবার মনে হয়, বিছানা থেকে গড়িয়ে বোধহয় মেঝেতে পড়ে যাবে। বাবা ভয় পেয়ে আমাকে ডাকেন –রাত্রি! রাত্রি মা! আমি বাবার পাশে দাঁড়াই। দুজনে মিলে দরজা ধাক্কাতে থাকি। এক সময় বাবলুর ঘুম ভাঙে কিন্তু চেতনা পুরোপুরি ফিরে আসে না –কারণ সে কাঁপা গলায় ডাকতে থাকে –মা! মা! বাতি জ্বালাও মা। তার মনে থাকে না যে। মা মারা গেছেন আট বছর আগে। ছেলের দুঃস্বপ্নের সময় তিনি এসে বাতি জ্বালাতে পারবেন না।
বাবা ব্যস্ত হয়ে ডাকেন –ও বাবলু! বাবলু!
বাবলু ক্লান্ত গলায় বলে, জ্বি।
আমরা আছি এখানে। আমি আছি, রাত্রি আছে। কি হয়েছে রে?
বোবায় ধরেছে।
দরজা খুলে বের হয়ে আয়।
বাবা, পানি খাব।
দরজা খোল –পানি নিয়ে আসছি।
পানি আনার জন্যে বাবা নিজেই চটি ফটফট করতে করতে একতলায় নেমে যান। বাবলু দরজা খুলে আমাকে দেখে বোকার মত হাসে।
বোবায় ধরেছিল। বুঝলি আপা, বুকের উপর চেপে বসেছিল– আজ আমাকে মেরেই ফেলত।
আয়, বারান্দায় খানিকক্ষণ বোস।
একটা তাবিজ-টাবিজ কিছু নিতে হবে –নয়ত বেকায়দায় ফেলে ভূতটা আমাকে মেরেই ফেলবে।
ভূত-টুত কিছু না। তুই স্বপ্ন দেখছিলি।
আরে রাখ। স্বপ্ন আর বোবায় ধরা এক জিনিস না। বোবায় যাকে ধরে সে জানে। বোবা করে কি জানিস? প্রথমে একটা স্বপ্ন দেখায় –ভয়ের স্বপ্ন। তারপর বুকের উপর চেপে বসে গলা চেপে ধরে। নিঃশ্বাস নিবি সেই উপায় নেই, নড়াচড়া করবি সেই উপায় নেই। সাধারণ নিয়ম হল –একটা বোবা একজনকে ধরে। আমার সবই উল্টা। আমার কাছে দু’টা বোবা আসে। একটার বয়স কম। সেটা চুপচাপ আমার পায়ের উপর বসে থাকে।
বাবা পানি নিয়ে আসেন। বাবলু এক চুমুক পানি খায়। সে পানি খেতে পারে না। তার গলার ফুটাটা না-কি এমন যে ফুটা দিয়ে সব খাবার নামে, শুধু পানি নামে না। পানি জমা হয়ে থাকে।
এক চুমুক পানি খেয়েই বাবলু সুস্থ হয়ে আবার ঘুমুতে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নাক ডাকার শব্দ আসতে থাকে।
আমার দুঃস্বপ্ন বাবলুর দুঃস্বপ্নের মত ভয়ংকর না, কিন্তু আমি বাবলুর মত চট করে ঘুমুতে পারি না। আমি জেগে থাকি –জেগে জেগে ভাবি –রিকশায় শাড়ি পেচানোর এই স্বপ্ন আমি কেন বার বার দেখি?
প্রথম কথা হচ্ছে, মামুনের সঙ্গে আমি কখনো রিকশায় চড়িনি। তার রিকশ ভীতি আছে। ছোটবেলায় সে ঝাঁকুনি খেয়ে রিকশা থেকে নিচে পড়ে মাথায় চোট পেয়ে অনেকদিন হাসপাতালে ছিল। তারপর থেকেই সে রিকশায় চড়ে না। প্রয়োজনে সে হাঁটবে, বাসে চড়বে, কিন্তু কখনো রিকশায় না। বিয়ের পর আমরা ঘুরতাম ওদের মরিস মাইনর গাড়িতে। গাড়ি চালাতো মামুন, আমি তার পাশে বসা এবং পেছনের সীটে ওদের ড্রাইভার। মামুন খুব ভাল গাড়ি চালায়, তারপরেও গাড়িতে উঠলেই সে ড্রাইভারকে সঙ্গে নেবে। তাদের বাড়ি থেকে নিউমার্কেট যাবে, পাঁচ মিনিটের পথ –পেছনে ড্রাইভার থাকবেই। তার যুক্তি হচ্ছে –আমি গাড়ির কলকজার কিছুই জানি না। গাড়ি পথে বিগড়ে গেল –তখন করবটা কি? তাছাড়া ধর, একটা একসিডেন্ট করলাম। ঢাকা শহরের জাগ্রত জনতা আমাকে ঘিরে ধরল। মেরে তক্তা বানানোর মতলব করছে। তখন নিজের একজন মানুষ লাগবে যে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে জীবন তুচ্ছ করে পুলিশ ডেকে আনবে। ড্রাইভার সঙ্গে রাখার এই হল ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি।
মামুনকে দেখলে মনে হবে সে খুব আপনভোলা স্বভাবের একজন মানুষ। মনে। হবে কিছুই বোধহয় সে লক্ষ্য করছে না –আসলে সে সবই লক্ষ্য করছে। খুব সাবধানী, খুব হিসেবী একজন মানুষ। বিয়ের পর পর একদিন সকালে নাশতা খেতে বসেছে। সিগারেট চাইল –আমি সিগারেটের প্যাকেট এনে দিলাম। সিগারেট ধরিয়েই সে ভুরু কুঁচকে বলল, চারটা সিগারেট থাকার কথা। তিনটা কেন?
আমি বললাম, তোমার সিগারেট কে নেবে? তিনটাই ছিল।
অসম্ভব। রাত এগারোটার সময় দেখেছি –ছটা সিগারেট। শুতে যাবার আগে একটা খেলাম, রইল পঁচ। ভোরবেলা বেড-টির সঙ্গে একটা খেয়েছি –রইল চার। এখন দেখি তিনটা। কারণ কি?
আমি হাসতে হাসতে বললাম –তুমি হিসাব-নিকাশ বন্ধ কর তো। তুচ্ছ একটা সিগারেট!
মোটেই তুচ্ছ না। কোথায় গেল বের করতে হবে।
কে তোমার সিগারেট নেবে বল? দুটা কাজের মেয়ে ছাড়া এখানে কেউ আসেনি।
ওরাই নিয়েছে।
ওরা সিগারেট দিয়ে কি করবে?
খাবে। তুমি জান না লোয়ার লেভেলে স্মোকিং হ্যাবিট খুবই প্রবল। তুমি কাজের মেয়ে দুটাকে ডাক। জেরা করব।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এটা কোন কথা হল? সামান্য একটা সিগারেটের জন্যে তুমি বাসায় কোর্ট বসাবে?
অবশ্যই বসাব। ব্যাপারটা তুমি যত সামান্য ভাবছ, আমি ভাবছি না। You start by Killing a cat, you end up by Killing a man. ডাক দু’জনকে।
আমার সামনে তুমি এটা করতে পারবে না।
বেশ, আমি আড়ালেই করব। তুমি শুধু ডেকে দাও।
আমি দু’জনকে ডেকে চায়ের কাপ হাতে ওদের বাড়ির ছাদে উঠে গেলাম। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে এত অস্বাভাবিক লাগছিল! মামুন দশ মিনিটের মাথায় ছাদে উঠে এসে হাসিমুখে বলল, চুরনি ধরা পড়েছে। মতির মা স্বীকার করেছে।
কি বলেছে?
ও সুন্দর একটা গল্প সাজিয়েছে। ঘর ঝাট দিতে গিয়ে সে দেখল সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট মোঝেতে কি করে যেন পড়ে গেছে। মাটিতে পড়ে থাকা সিগারেট আমি আর খাব না ভেবে সে সিগারেটটা তার ট্রাংকে রেখে দিয়েছে। দেশে যখন যাবে তখন মতির বাবাকে দেবে।
এই গুরুতর অপরাধের জন্যে তুমি তাকে কি শাস্তি দিয়েছ? মেরেছ?
না। ওকে এক মাসের বেতন, দেশে যাবার গাড়িভাড়া এবং একটা সিগারেট কেনার পয়সা দিয়ে বলেছি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে।
তুমি সত্যি এটা করেছ?
অবশ্যই। তুমি পাঁচ মিনিট পর নিচে নামলে মতির মা’কে দেখবে না। রাত্রি, তুমি এরকম অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন?
অবাক হয়েছি, এই জন্যেই অবাক হয়ে তাকাচ্ছি।
অল্পতে অবাক হয়ো না। বী প্র্যাকটিক্যাল।
আমি প্র্যাকটিক্যাল ম্যান হতে পারিনি। চেষ্টাও করিনি। তিন বছর একজন প্র্যাকটিক্যাল মানুষের সঙ্গে বসবাস করেছি। এবং এক সময় মনে হয়েছে –পারছি না। আর পারছি না। টুকুনের বয়স তখন দেড় বছর। সে আমাদের সঙ্গে ঘুমোয় না। আলাদা ঘরে বেবীখাটের উপর ঘুমায়। রাতে তাকে দেখাশোনা করে একজন ট্রেইন্ড আয়া।
আমাদের সঙ্গে ঘুমুলে সে বার বার জাগে, কাঁদে। বিছানা ভিজিয়ে দেয়। মামুনের ঘুমের অসুবিধা হয়। তার দরকার পুরো রাতের ঘুম। সে ঘুম নষ্ট করতে রাজি না।
এক রাতে সে টুকুনের কান্নায় বিরক্ত হয়ে বলল, আমার এক রাতের অনিদ্রার অর্থ জান? এক রাতের অনিদ্রা মানেই দিনের কাজকর্ম ভণ্ডুল। এই অবস্থায় দিনে কাজকর্ম ভণ্ডুল করতে দেয়া যায় না। আমার মাথাটা এখন থাকবে ভাদ্র মাসের দিঘির পানির মত। ঢেউ থাকবে না। ঘূর্ণি থাকবে না। বুঝতে পারছ?
পারছি।
মুখে পারছি বলেলও তুমি আসলে পারছ না। আমাকে হৃদয়হীন মানুষ বলে মনে করছ। ব্যাপার সে রকম না। আমি একটা ইন্ডাস্ট্রি শুরু করছি। বাপ-দাদার জমানো সব টাকা সেখানে ঢেলেছি। ব্যাংকের কাছে আমার পোন কত জান? দুই কোটি পঁচিশ লক্ষ টাকা। আমার দায়িত্ব বুঝতে পারছ? হয় আমি আকাশ ফুড়ে ওঠে যাব –নয় পাতালে প্রবেশ করব। কাজেই এত সাবধানতা। তুমি এই সময়ে কোন কিছু নিয়ে আমাকে বিরক্ত করবে না। এমন কিছু করবে না যাতে আমি আমি …
বিরক্ত হও।
বিরক্তির কথা আগেই বলেছি, অন্য একটা টার্ম খুঁজছি।
রাগ?
হ্যাঁ রাগ। অবশ্যি রাগ আমি কখনো হই না। আমার লিমিট হচ্ছে বিরক্তি পর্যন্ত। আমার ব্যাপারে তোমার ভেতর যদি কোন খটকা তৈরি হয় সেই খটকা দূর করার জন্যও ব্যস্ত হবার দরকার নেই। যথাসময়ে খটকা দূর হবে। দয়া করে তিনটা বছর যেতে দাও, আমি ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলি …।
ওর সম্পর্কে নানান ধরনের খটকা আমার মধ্যে তৈরি হতে লাগল। যেমন– নানান কাজে ছ’দিন-সাতদিনের জন্যে তাকে বাইরে যেতে হয়। তার সঙ্গি থাকে তার অফিসের এক মহিলা টাইপিস্ট। বেঁটেখাট, কালো একজন মহিলা — পুরুষদের মত গলা। দেশের বাইরে এত কি টাইপ করার কাজ থাকে যে একজন টাইপিস্ট নিয়ে যেতে হয়? অবশ্যি কুরূপা একজন বয়স্কা মহিলা –অন্য কিছু ভাববার। অবকাশও নেই। তবু একবার রাতে খাবার সময় জিজ্ঞেস করলাম, তুমি বাইরে কোথাও যেতে হলেই টাইপিস্ট নিয়ে যাও কেন? টাইপের কাজ এত কি বল তো?
মামুন খাওয়া বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। তার ভুরু কুঁচকে গেল। অর্থাৎ সে বিরক্ত হচ্ছে।
তুমি কি সত্যি সত্যি জানতে চাও?
হ্যাঁ।
জানতে চাচ্ছ যখন বলি– উত্তরটা পছন্দের হবে না, তারপরেও বলি এবং ঝামেলা শেষ করে রাখি। নয়ত বার বার তুমি এই প্রসঙ্গ তুলবে, ঝামেলার সৃষ্টি করবে। শুরুতেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাঁপড়া হয়ে যাওয়া ভাল। তুমি তোমার সীমা জানবে, আমি আমার সীমা জানব। বুঝতে পারছ?
না। তবে বোঝার চেষ্টা করছি।
আমার টাইপিস্ট ফরিদাকে তুমি দেখেছ। তার প্রেমে আমার হাবুডুবু খাওয়ার কোন কারণ নেই তা বোধহয় তুমি ধরতে পারছ। পারছ না?
পারছি।
আমি যখন বাইরে যাই তখন সাইট সিইং-এর জন্যে যাই না। এটা কোন আনন্দের ভ্রমণ না, কাজের ভ্রমণ। সে সময় আমাকে কি পরিমাণ খাটুনি করতে হয় তা তোমাকে একবার নিয়ে দেখিয়ে আনব। যাই হোক, যে কথা বলছিলাম –পৃথিবীর সকল পুরুষ মানুষদের মতো আমারও কিছু শারীরিক চাহিদা আছে। আমি তো আর দেশের বাইরে গিয়ে প্রস্টিটিউট খুঁজে বেড়াতে পারি না। আমার সময়ও নেই, আগ্রহও নেই। ফরিদাকে এই কারণেই আমাকে নিয়ে যেতে হয়।
মামুন খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে সহজ ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাল। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি। কোন মানুষ এত সহজে এমন কথা বলতে পারে? সে কি করেই-বা ভেবে নিল এই কথাগুলো শোনার পর আমি স্বাভাবিক থাকব? মামুন বলল, কাউকে বল আমাকে হালকা করে কফি দিতে। চিনি যেন আধ চামচ দেয়।
আমি কফির কথা বলে এসে তার সামনে বসলাম। মামুনের ভুরু কুঁচকাল। সে বিরক্ত হচ্ছে। সে কি ধরেই নিয়েছিল তার সব কথাবার্তা হজম করে আমি শান্ত ভঙ্গিতে ঘুমুতে যাব?
মামুন বলল, কিছু বলবে?
হ্যাঁ।
ফরিদা প্রসঙ্গে?
না, ফরিদা প্রসঙ্গে না। আমার নিজের প্রসঙ্গে।
বল।
আমি তোমার সঙ্গে বাস করতে পারব না।
মামুন আমার দিকে ঝুঁকে এসে বলল, কেন? আমি সত্যি কথা বলেছি বলে? সত্যবাদীর সঙ্গে বাস করা যায় না? সত্যি কথাটা না বললে তুমি কোনদিনই জানতে পারতে না।
আমি বললাম, তুমি ধরেই নিয়েছ আমার তোমাকে ছাড়া গতি নেই। এই জীবন আমার তোমার সঙ্গেই কাটাতে হবে। এই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের কারণেই তুমি অনায়াসে কিছু কুৎসিত কথা আমাকে বলে ফেললে। এটা হল শুরু। এরপরে বাকি জীবনে তুমি আরো অনেক কুৎসিত কাজ করবে, আমাকে সেই সব সহ্য করতে হবে। তোমার সঙ্গে আমি নানা জায়গায় বেড়াতে যাব। পার্টিতে যাব। বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে যাব। হাসিমুখে গল্প করব। সবাই বলবে– বাহ! মেয়েটা তো বেশ সুখী। এটা হতে দেয়া ঠিক হবে না।
কি চাও তুমি? সেপারেশন? ডিভোর্স?
আমি লক্ষ্য করলাম, এই কঠিন বাক্যটা বলার ফাঁকে মামুন ঠোঁট চেপে হাসল। সে ধরেই নিয়েছে আমি হাস্যকর কিছু কথা বলছি। মামুন হাই তুলতে তুলতে বলল, তুমি যা চাও তাই হবে। তুমি যদি প্র্যাকটিক্যাল মানুষের মত সব দিক বিবেচনা করে আমার সঙ্গে থাকতে চাও, থাকতে পার। শর্ত একটাই –আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না। আমার জীবনযাপনের কিছু বিশেষ পদ্ধতি আছে। তোমাকে সে সব মেনে নিতে হবে আর তুমি যদি চলে যেতে চাও, তাও যেতে পারবে।
আমি চলে যাব।
গুড। তোমাকে ছয় মাস চিন্তা করার সময় দেয়া হল। তুমি তোমার বাবার কাছে চলে যাও। ছ’মাস চিন্তা কর। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর –ছ’মাস পর তোমার যদি মনে হয় তোমার ডিসিসান ভুল ছিল, তুমি স্যুটকেস নিয়ে চলে আসবে। আমি একটি কথাও জিজ্ঞেস করব না। আর ছ’মাস পর যদি মনে হয় তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক, তাহলে তো কথা নেই।
টুকুনকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।
টুকুনের কথা এখানে আসছে কেন? আমি রক্ষিতা ধরনের একটা মেয়েকে নিয়ে দেশের বাইরে যাই এই সংবাদে টুকুন খুব চিন্তিত বলে তো মনে হয় না। টুকুন এখানেই থাকবে। আর এই ছ’মাস তুমি তার সঙ্গে দেখাও করবে না।
কেন?
সঙ্গত কারণেই করবে না। দুজনের দেখা-সাক্ষাত মানেই ভালবাসার ব্যাপারটা জিইয়ে রাখা। এতে পরবর্তী সময়ে টুকুনেরও কষ্ট হবে, তোমারও কষ্ট হবে। ভালবাসার বন্ধন পুরোপুরি কেটে যাওয়াই ভাল।
আমি যাতে এখানে থেকে যাই তার জন্যে তুমি এক ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছ।
না। আমি প্র্যাকটিক্যাল মানুষ। আমি সমস্যাটা একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবেই দেখার চেষ্টা করছি। আমাকে যদি ছেড়ে চলে যাও তাহলে তুমি বাকি জীবন একা একা কাটাবে, এটা আমি মনে করি না। আমার তো একা থাকার প্রশ্নই উঠে না। টুকুনকে দোটানায় রাখার কোন মানে নেই।
তুমি ওকে কি বলবে আমি মরে গেছি?
সস্তা উপন্যাসের ডায়লগ আমি বলি না। যেটা সত্যি সেটাই বলব।
আমি সেই রাতে এক মুহূর্তের জন্যে ঘুমুলাম না। পুরো রাত জেগে কাটালাম। মামুন আমার পাশেই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুল।
পরদিন দুটা স্যুটকেস হাতে বাবার কাছে চলে এলাম। বাবা বললেন –কি হয়েছে রে মা?
আমি হেসে বললাম, চলে এসেছি বাবা, তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে থাকতে দেবে?
বাবা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
ছ’মাস কেটে গেল। এই ছ’মাসে আমার কখনো ঐ বাড়িতে ফিরে যাবার ইচ্ছে হয়নি। টুকুনের জন্য কষ্ট হয়েছে। তীব্র কষ্ট। যে কষ্টের কোন সীমা-পরিসীমা নেই।
জীবন কাটছিল এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। যেন আমি অসুস্থ। বোধশক্তিহীন মানুষ। খাচ্ছি, ঘুমুচ্ছি, চলাফেরা করছি।
আমার সমস্যা কি বাবা কোনদিন জানতে চাইলেন না। তবে মামুনের সঙ্গে তিনি। কথা বলতে গেলেন। তাদের মধ্যে কি হল তাও আমি জানি না। এম্নিতেই বাবা চুপচাপ। আরো চুপচাপ হয়ে গেলেন। তাঁর একমাত্র কাজ হল বারান্দায় জলচৌকিতে বসে খবরের কাগজ পড়া।
বাবলুর সঙ্গে বাসার কোন যোগ নেই –সে মাঝে মধ্যে খুব হৈ-চৈ করত –সংসারে এসব কি হচ্ছে? কি হচ্ছে এসব? বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে এরকম গুজব কেন কানে আসছে? আমি কিন্তু টলারেট করব না –ঐ লোকটার কানে ধরে আমি স্টেডিয়ামের চারদিকে চক্কর দেওয়ার। আমার এই পাওয়ার আছে। মারাত্মক সব লোকজনের সঙ্গে আমার কানেকশন আছে। ফজলু ভাইয়ের সঙ্গে সপ্তাহে তিন চারদিন এক টেবিলে চা খাই। ডেঞ্জারাস লোক। একদিন বাসায় নিয়ে আসব। বুঝলি আপা, আমি সহজ লোক না । আমাকে ভয় পাওয়ার দুই হাজার দুইটা কারণ আছে।
বাবলুর সবকিছুই সাময়িক। হৈ-চৈও সাময়িক। কিছুক্ষণ হৈ-চৈয়ের পর সে সহজ স্বাভাবিক মানুষ। খাচ্ছে-দাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে। আমি বাসায় থাকায় তাকেই সবচে’ খুশি মনে হয়। খুশিটা সে গোপন করে না।
তুই যে এখানে আছিস –খুব ভাল হয়েছে। বাসাটা শুশানের মত ছিল। আমি আর বাবা এত বড় একটা বাড়ি– চিন্তা কর অবস্থা! এখন ফাইন হয়েছে। তাছাড়া কোন বাড়িতে মহিলা না থাকলে বাড়িটা ছেলেদের হোস্টেল হয়ে যায় — সব মন্দের একটা ভাল দিক আছে। তুই এখানে আছিস, এর মারাত্মক একটা ভাল দিক আছে …।
আট মাসের মাথায় মামুনের চিঠি পেলাম। ভুল বললাম, মামুনের চিঠি না –মামুনের উকিলের চিঠি। গাধা চিঠি। এরকম চিঠি এডভোকেট সাহেব নিশ্চয়ই অনেককে পাঠিয়েছেন। চিঠিতে কোর্টের দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ায় না গিয়ে দু’জন একত্রে কাজি অফিসে উপস্থিত হয়ে তালাকনামা প্রস্তুতের সুপারিশ করা হয়েছে।
আমি উকিলের চিঠি বাবাকে দেখালাম। বাবা বললেন, কি করবি? যাবি?
আমি হা-সূচক মাথা নাড়লাম।
যা করছিস ভেবে-চিন্তে করছিস তো?
হ্যাঁ।
বাবা শ্রান্তস্বরে বললেন, আচ্ছা।
বাবা সেদিন যদি শুধু ‘আচ্ছা’ শব্দটা না বলে অন্যকিছু বলতেন তাহলে আমার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হত কি? হয়ত হত। বাবার কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই– বাবা এই ব্যাপারটা জানেন বলেই বোধহয় শুধু বললেন –আচ্ছা। মা বেঁচে থাকলে তিনি কি করতেন? ভয়ংকর এইসব ঘটনায় হাসির কিছু খুঁজে পেয়ে হয়ত হেসে ফেলতেন। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে বাবলু হাত ভেঙে বাসায় ফিরল। বন্ধু বান্ধব ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। বাবলু কিছুক্ষণ পর পর ঠোঁট গোল করে ওহোহো ওহোহো জাতীয় শব্দ করে কাঁদছে। মা বললেন –বাবলু, তুই এমন। ইংরেজি ভাষায় কাঁদছিস কেন? বলেই হেসে ফেললেন। মা’কে সেদিন আমার খুব নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। এখনো মনে হয়।
কাজি অফিসে মামুন এসেছিল সিল্কের একটা হাওয়াই শার্ট পরে। ধবধবে সাদা জমিনের উপর হালকা সবুজ পাতার ছাপ দেয়া শার্ট। ক্রীম কালারের প্যান্ট। চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো। মুখও হাসি-হাসি। যেন সে কোন একটা উৎসবে এসেছে। তার সঙ্গে অফিসের কয়েকজন কর্মচারি। বাইশ-তেইশ বছরের হালকা পাতলা গড়নের একটা মেয়েও সঙ্গে আছে। সেও সম্ভবত অফিসেরই কেউ হবে। স্যার স্যার বলছে। মামুন হয়ত ইচ্ছা করেই মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। আমি রিকশা থেকে নামতেই সে এগিয়ে এল। সহজ ভঙ্গিতে হাসল। একজন হাসলে উত্তরে। অন্যজনকেও হাসতে হয়। আমি হাসতে পারলাম না। কেন জানি নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল।
মামুন বলল –কি, ভাল?
আমি মাথা নাড়লাম।
কাগজপত্র সব রেডি করা আছে। দু’জন শুধু একসঙ্গে যাব –সই করব। দ্যাটস অল। তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমার লইয়ারকে একটা জিনিস জানতে পাঠিয়েছি। ও এসে পড়বে। তুমি আস আমার সঙ্গে। কাজি সাহেবের অফিসে একটা আইসোলেটেড ঘর আছে– সেখানে বোস। চা-টা কিছু খাবে?
না। টুকুন কেমন আছে?
ভাল আছে বলেই তো মনে হয়।
ভাল আছে কি-না তুমি জান না?
গত পরশুর খবর জানি –ভাল আছে। ও তো এখানে থাকে না। আমার বড়বোনের সঙ্গে ওকে ইংল্যাণ্ড পাঠিয়ে দিয়েছি। আপাতত সে বোনের সঙ্গেই আছে। চার বছর হলে পাবলিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।
আমাকে তুমি কিছুই জানাওনি।
তোমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি।
আমার নিজের ছেলে — সে কোথায় থাকবে, কোথায় থাকবে না তা আমি জানব না?
তোমাকে আগেও বলেছি। এখনো বলছি। তোমার না জানাই ভাল। তোমাদের ভেতর যোগাযোগ থাকলে –তোমার জন্যও সমস্যা, তার জন্যেও সমস্যা। আমি সমস্যা পছন্দ করি না। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করি সমস্যা কমাতে। আমার কাছ থেকে শেখার কিছু নেই– কিন্তু এই ব্যাপারটা শিখতে পার।
আমি কোনদিন আমার বাচ্চাকে দেখতে পারব না?
পারবে। দেখতে পারবে না এমন কথা তো হচ্ছে না। তবে তার আগে আমাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, এখন দেখাদেখি হলে সমস্যা হবে না। ভাল কথা, তুমি যদি টুকুনের অভিভাবকত্ব দাবি কর তাহলে তোমাকে কিন্তু কোর্টে যেতে হবে। ডিভোর্স। স্যুট ফাইল করতে হবে। তাও তুমি করতে পার, আমার আপত্তি নেই।
কথা বলতে বলতে মামুন হাসছে। পরম শত্রুকে কোণঠাসা করার যে আনন্দ, মামুনের চোখে-মুখে সেই আনন্দ। আমার চোখে পানি এলে সে আরো আনন্দিত হবে। আমি যদি কাঁদতে কাঁদতে বলি, টুকুনকে আমার কাছে দিয়ে দাও, তাহলে সে নিশ্চয়ই মনের আনন্দে হেসে ফেলবে।
আমি তাকে সেই আনন্দ দিলাম না। সহজভাবেই কাগজপত্র সই করলাম। মামুন বলল –ভাল থেকো।
আমি বললাম, চেষ্টা করব।
মামুন হালকা গলায় বলল, টুকুনকে নিয়ে তুমি কোন দুঃশ্চিন্তা করবে না। ও ভাল আছে, ভাল থাকবে। টুকুন ঢাকায় এলে তোমাকে খবর দেব, তুমি এসে দেখে যেও।
ও কবে আসবে?
তা তো বলতে পারছি না।
ফেরার পথে আমি রিকশায় এলাম না। মামুন তার গাড়িতে করে আমাকে নামিয়ে দিল। পেছনের সীটে আমি এবং মামুন। সামনের সীটে ড্রাইভারের পাশে ওর অফিসেরই কোন কর্মচারি। মামুন সারাক্ষণই সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে ফ্যাক্টরির স্ট্রাকচারাল কি সমস্যা নিয়ে কথা বলতে লাগল। আমি যে তার পাশে বসে আছি এটা তার মনে রইল না।
সেই রাতেই আমি প্রথম স্বপ্নটা দেখলাম। রিকশা করে আমি এবং মামুন যাচ্ছি। আমার শাড়ি আটকে গেছে রিকশার চাকায়। মামুন রিকশা থামাবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। রিকশা থামছে না।
 
Back
Top