Collected জমিদারের বাচ্চা

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
476
Messages
7,967
Reaction score
7,526
Points
4,113
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
জমিদারের বাচ্চা

মূল লেখকঃ আবুল বাশার পিয়াস
​






ভাবী রাগের মাথায় তাঁর ৫ বছরের সন্তানকে জমিদারের বাচ্চা বলেছে। এটা আমার বড় ভাই কোনোভাবে মানতে পারেনি। এ জন্য তাদের ঝগড়া শুরু হয়েছে। আল্লাহ, ৩০টা দিন আমার সকালে ঘুম ভাঙে ভাই-ভাবীর ঝগড়া শুনে।

আমি ঘুম ঘুম চোখে ভাই-ভাবীর সামনে গিয়ে বললাম, “আজকের টপিক কী?”

ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “চিন্তা করে দেখ, আমার এইটুকু ছেলেকে জমিদারের বাচ্চা বলে গা*লি দেয়!”

আমি ভাবীকে বললাম, “ছিঃ ছিঃ ছিঃ ভাবী… একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে তুমি এমন কথা বলতে পারলে? তোমার বোঝা উচিত ছিল, আমরা বংশগতভাবে ফকিন্নি। আমার বাপ ফকিন্নি ছিল, দাদা ফকিন্নি ছিল, দাদার দাদাও ফকিন্নি ছিল। তাছাড়া তোমার জামাই তো আরও বড় ফকিন্নি। প্রতিদিন সচিবালয়ের সামনে ভিক্ষা করে। তোমার উচিত ছিল ফকিন্নির বাচ্চা বলে গা*লি দেওয়া। জমিদারের বাচ্চা বলে তুমি তো ভাইকে অপমান করলে!”

আমার কথা শুনে ভাবী হেসে দিল আর ভাই রাগী চোখে বলল, “ফাউল কোথাকার, আমার সামনে থেকে দূর হ!”

এমন সময় ভাতিজা বলে উঠল, “চাচ্চু, আমি তাহলে কী?”

আমি তখন বললাম, “তুই তোর বাপের চেয়েও বড় ফকিন্নি!”

—-

অফিসে এসে দেখি, শ্রাবণী প্রচণ্ড রেগে আছে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, বাসায় ওর বিয়ে নিয়ে আবার ঝামেলা হয়েছে। এ জন্য সারা রাত ঘুমায়নি। আমি ফাইলটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বললাম, “কী হয়েছে?”

শ্রাবণী রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা একসঙ্গে প্রেম করেছি, পড়াশোনা করেছি, চাকরি করছি, কিন্তু বিয়েটা কেন করতে পারছি না? বাবা-মায়ের এই প্যারা আমি আর কত দিন সহ্য করব?”

আমি বললাম, “বিয়ে করতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যাটা তখন হবে, যখন তুমি আমার সন্তানকে জমিদারের বাচ্চা বলে গা*লি দেবে আর আমাদের এটা নিয়ে ঝগড়া হবে। আরে, আমরা খানদানি ফকিন্নি। আমাদের একটা ইজ্জত আছে!”

এই কথা শুনে শ্রাবণী আমাকে কু*ত্তার বাচ্চা বলে গালি দিয়ে অফিস রুম থেকে বের করে দিল। বুঝলাম না, এর চেয়ে তো জমিদারের বাচ্চা বলাটাই ভালো ছিল…

—-

বাসায় এসে দেখি, ফ্লোরে কাচের দুটো প্লেট ভাঙা। ভাবী উত্তর দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাইয়া দক্ষিণ দিকে। আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আজকের টপিক কী?”

ভাবী বলল, “ভাতে সামান্য একটা চুল পেয়েছে। আর এটা নিয়ে আমাকে যা-তা বলল। অথচ চুলটা আমার না। আমার চুল এত ছোট না!”

ভাই রেগে গিয়ে বলল, “তাহলে এটা কি আমার চুল? আমার চুল তো এত বড় না!”

আমি চুলটা হাতে নিয়ে দেখি, এটা মাঝারি সাইজের চুল। ভাবীর চুলের চেয়ে ছোট আর ভাইয়ার চুলের চেয়ে বড়। প্রতিদিন একই নাটক দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত। তাই রাগের মাথায় বললাম,

“তোমাদের প্রতিদিনের ঝগড়া দেখে আমি শ্রাবণীকে বিয়ে করছি না। আমি চাই না, বিয়ের পর ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তোমাদের মতো শ্রাবণীর সঙ্গে আমার ঝগড়া হোক। তোমাদের অবস্থা দেখে আমার সংসার করার ইচ্ছা মিটে গেছে। আমায় ভয় হয় এখন বিয়ে নিয়ে। আল্লাহর দোহাই লাগে, এবার তোমরা একটু থামো!”

রাতে না খেয়েই রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছি। শ্রাবণী সমানে কল দিচ্ছে। ওর ফোনটাও রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষণ পর ভাইয়া আমার রুমে এসে আমার পাশে বসল। আমি ভাইয়াকে বললাম, “কিছু বলবে?”

ভাইয়া মুচকি হেসে বলল, “তুই শুধু আমাদের ঝগড়াটাই দেখলি। আমাদের ভালোবাসাটা দেখলি না? বিয়ের পর আজ পর্যন্ত দেখেছিস, সকালে আমি না খেয়ে অফিসে যেতে? রাতে যত ঝগড়াই হোক, সকালে তোর ভাবী না খাইয়ে আমাকে অফিসে পাঠায় না। আমার সামান্য জ্বর হলেও তোর ভাবী সারা রাত জেগে থাকে। বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে যে মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তি হয়নি, সেই মেয়ে এখন বাপের বাড়ি গিয়ে দুই দিন থাকে না, কারণ আমার থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হবে। আমরা ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া করি, ঠিক আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর ভাবীকে জড়িয়ে না ধরলে আমার রাতে ঘুম আসে না।”

ভাইয়া আমার রুম থেকে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ভাবী খাবার নিয়ে রুমে ঢুকল। আমি ভাবীকে বললাম, “ভাইয়ার মতো তুমিও আমায় এখন জ্ঞান দেবে নাকি?”

মুচকি হেসে ভাবী বলল, “তোমার ভাইয়ের মতো আমি এত জ্ঞানী না যে তোমাকে জ্ঞান দেব। তোমার মনে আছে, আমি যখন ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলাম, তখন তোমার ভাই আইটি সেক্টরের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল? অফিস থেকে তোমার ভাই ৩ মাসের ছুটি চেয়েছিল। অফিস দেয়নি। এ জন্য চাকরিই ছেড়ে দিয়েছিল, যেন ২৪ ঘণ্টা আমার সঙ্গে থাকতে পারে। বাবা-মা আমার যে ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারেনি, বিয়ের পর তোমার ভাই আমার প্রতিটা ইচ্ছা পূরণ করেছে। আমাদের যতই ঝগড়া হোক, তোমার ভাই সকালে অফিসে গিয়ে কল দিয়ে বলবে, সে ঠিকমতো এসেছে। দুপুরে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করবে, আমি খেয়েছি কি না। বিকালে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে, আমার শরীর ঠিক আছে কি না। রাতে ফেরার সময় কিছু না কিছু আমার জন্য আলাদাভাবে কিনে নিয়ে আসে। বিশ্বাস করো, তোমার ভাই আগে আমার খোঁজ নেয়, তারপর সন্তানের কথা জিজ্ঞেস করে।”

ভাবী কথাগুলো বলছিলো আর উনার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো। ভাইয়ার প্রতি তীব্র ভালোবাসা আর সম্মান আমি উনার চোখের জলে দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখের জলটা মুছে ভাবী হেসে বললো, “পিয়াস… বিয়েটা করে ফেলো। তখন দুই জা মিলে ঝগড়া করব। তোমরা দুই ভাই শান্তিতে থেকো।”

—--

কলিংবেল বাজতেই শ্রাবণীর বাবা দরজা খুলল। এই আর্মি অফিসারকে দেখলেই আমার সবকিছু কেমন জানি ঘুলিয়ে যায়। বিরক্তির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই… তুমি কে? এত রাতে কলিংবেল চাপছ?”

আমি আমতা আমতা করে বললাম, “জি, মানে… আমি ফকিন্নির বাচ্চা। আপনার মেয়েকে ভিক্ষা চাইতে এসেছি। আপনার মেয়েকে আমায় দিয়ে দেন। আমি ওকে বিয়ে করব।”

শ্রাবণীর বাবা অবাক হয়ে বলল, “ফকিন্নির বাচ্চার কাছে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেব কেন?”

পাশ থেকে শ্রাবণী মুচকি হেসে উত্তর দিল, “আব্বু, ও ফকিন্নি না, জমিদারের বাচ্চা!”

—

রাত বাজে দুইটা। আমি আর শ্রাবণী হলুদ সোডিয়ামের আলোর নিচে কালো পিচঢালা পথ ধরে হাঁটছি আর কাজী অফিস খুঁজছি। শ্রাবণী আমায় বারবার বলছে, “এত রাতে কাজী অফিস খোলা থাকে না।”

কিন্তু আমি মানতে নারাজ। আমার আজ রাতেই বিয়ে করতে হবে। আমার খুব বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে…


সমাপ্ত
 
Back
Top