Collected হারিয়ে যাওয়া লাকী চার্ম

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
456
Messages
7,311
Reaction score
5,722
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
হারিয়ে যাওয়া লাকী চার্ম

মূল লেখকঃ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

১।

মেস থেকে বের হওয়ার সময় দেখি ম্যানেজারের রুমে শারমিন বসে আছে। আমাকে দেখেই ম্যানেজার কাতর কণ্ঠে বলে উঠল—

আসিফ ভাই, উনাকে একটু বুঝান না যে জুলফিকার শয়তানটা এখান থেকে চলে গিয়েছে। আমার মেসের তিন মাসের ভাড়া না দিয়ে। শুধু কি তাই। আমাদের রবিন ভাইয়ের ল্যাপটপও চুরি করে নিয়ে গেছে। রবিন ভাই এখন আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে চায়। কোন কুক্ষণে যে লোকটাকে মেসের রুম ভাড়া দিয়েছিলাম জানি না। দেখলাম এত সুদর্শন একজন মানুষ। আমার কাছে এসে বলল—

ভাই, আমার আমেরিকার ভিসা হয়ে গিয়েছে। শুধু কিছুদিন ঢাকায় থেকে ড্রাইভিং আর রান্নাটা শিখতে হবে, তারপর আমি সোজা নিউইয়র্ক। সেখানে গিয়েই আপনার জন্য টিকিট পাঠিয়ে দেব। আপনি অল্প কিছুদিনের জন্য ঘুরে গেলেন। ধরেন, প্রতি বছর গরমকালের একটা অংশ সেখানে কাটালেন। আমি আপনাকে আমেরিকা ঘুরিয়ে দেখাব। স্ট্যাচু অব লিবার্টির মহিলার সঙ্গে ছবি তুলে দেব।

আমি বললাম, জুলফিকার ভাই, বিদেশি মহিলার সঙ্গে ছবি তোলা কি ঠিক হবে?

উনি আমাকে বললেন—

নিউ জার্সির লিবার্টি পার্ক থেকে আপনার ছবি তুলে দেব। এমনভাবে তুলে দেব, মনে হবে মহিলা বুঝি আপনার মাথার ওপর মশাল ধরে রেখেছে। দেশে এসে মেসে ঢোকার মুখে সেই ছবি টাঙিয়ে রাখবেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন স্ট্যাচু অব লিবার্টির মহিলাই আমার মাথায় মশাল ধরে রাখে। তুমি আর কোন নবাব?

শারমিন মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল—

আসিফ ভাই, আপনি কি জানেন জুলফিকার এখন কোথায় আছে?

মেয়েটার চোখের নিচে কালি। নিশ্চয় কয়েক রাত ঘুমায় না। চোখের মধ্যে ফোলা ভাবও আছে। মনে হচ্ছে বেশ কান্নাকাটি করেছে। মানুষের ভালোবাসা আসিফের কাছে অদ্ভুত লাগে। মানুষ সবসময় অদ্ভুত মানুষের প্রেমে পড়ে এবং অধিকাংশ প্রেম হয় খুব অদ্ভুত কারণে।

সে একবার এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছে, তুমি অমুক ছেলেকে কেন পছন্দ করো?

সেই মেয়ে উত্তর দিয়েছে, একমাত্র এই ছেলেটাই প্রথম দেখার দিন আমাকে পাত্তা দেয়নি। আমি বেশ অবাক হয়েছি। আমি আজ পর্যন্ত যত ছেলের সঙ্গে দেখা করেছি, তাদের চোখে আমার জন্য মুগ্ধতা দেখেছি। তারা আমাকে পাশে পেয়ে সময়ের কথা ভুলে গিয়েছে। কিন্তু এই ছেলেটা আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার বিশ মিনিটের মধ্যেই আমাকে বলেছে, তার কাজ আছে। তাকে যেতে হবে। আমি বেশ বিরক্ত হয়েছি। ভেবেছি ছেলেটা হয়তো ভাব ধরেছে। তারপর দেখি সত্যিই সে আমাকে ফেলে চলে গেল। খুব মেজাজ খারাপ হলো।

তারপর মনে হলো, এমন ছেলে আমি বহু বছর দেখিনি। তার সেই কেয়ারলেস ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে।

আসিফ একদিন সেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছে, আচ্ছা তুমি প্রথম দেখার দিন ওকে ফেলে চলে গিয়েছ। তোমার কি ওকে ভালো লাগেনি?

আরে না ভাই। ঘটনা অন্য। সেদিন আমার টেনশনে লুজ মোশন হয়ে গিয়েছিল। যেই ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তারপর দেখি পেটে আষাঢ়ের ঘনঘটা ডাক। অবস্থা কেরোসিন। এত সুন্দরী মেয়ে। একবার যদিও ভেবেছিলাম অ্যাডাল্ট ডায়াপার পরে ওর পাশে বসে থাকব। কিন্তু তারপর আর সাহস হলো না। কিন্তু ওই জিনিসটাই আমার হিতে লাভ হয়েছে। মেয়ে ভেবেছে আমি ওকে পাত্তা দিইনি। তারপর থেকে আমার প্রতি তার উথালপাতাল প্রেম। ভালোই লাগে।

শারমিন আসিফের সঙ্গে মেস থেকে বের হয়। তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল—

সত্যি কি জুলফিকারের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ নেই?

আসিফ তার দিকে তাকিয়ে বলল—

না, যোগাযোগ নেই। ওর সঙ্গে মেসের কারও তেমন আড্ডা হতো না। ও সারাক্ষণই ফোনে ব্যস্ত থাকত। আপনার কাছে ওর বাড়ির ঠিকানা নেই?

আসলে আমার ধারণা, ও আমাকে অনেক মিথ্যা কথা বলেছে। আমি ওর দেওয়া বাড়ির ঠিকানায় খবর নিয়েছি। কিন্তু এই নামে ওখানে কেউ থাকে না। এবং সম্ভবত কখনোই থাকত না।

আপনি ওকে খুঁজছেন কেন?

শারমিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

আজকে আমার সঙ্গে ওর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। আর গত পরশু থেকে ও লাপাত্তা। ওর কোনো বিপদ-আপদ হলো কি না ভাবছি।

আমি শারমিনের চোখে চোখ রেখে বললাম—

আমার মনে হয় না ওর কোনো বিপদ হয়েছে। ও ভালোই আছে।

শারমিন আমার দিকে চোখ বড় বড় করে বলল—

আপনি কীভাবে বুঝলেন?

মানবচরিত্র নিয়ে আমার বেশ গবেষণা আছে। সেখান থেকেই বলছি। ও যেদিন মেস থেকে বের হয়, সেদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে দেখে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল—

ভাই, আপনাকে একটা উপদেশ দিই। জীবনে খুব বেশি ভালো মানুষ হলে কষ্ট পেতে হয়।

তারপর?

এতটুকুই আমাকে বলেছিল। সেখান থেকে আমার ধারণা হয়েছে, ও ভালোই আছে। এমন মানুষ ভালোই থাকে।

শারমিনের চোখে পানি চিকচিক করছে। মেয়েটা হাত দিয়ে কান্না আড়াল করার চেষ্টা করছে।

আমি ওকে বললাম, চলেন, সামনেই একটা দোকান আছে। ভালো চা বানায়। চা খাই। আর ভাবি কীভাবে ওকে খুঁজে বের করা যাবে।

২।

আমার এবং শারমিনের মধ্যে একটা অদ্ভুত রিলেশন তৈরি হয়েছে। আমরা দুজন মিলে জুলফিকারকে খুঁজি। আমাদের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। টিউশনির পর ওর সঙ্গে দেখা করাটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনো বিকেলে টিএসসির মোড়ে, কখনো রমনার বেঞ্চিতে, কখনো আজিজ সুপার মার্কেটে কিংবা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে। আমাদের ফোনেও বেশ গল্প হয়। শারমিন তার গ্রামের বাড়ির একটা নদীর কথা বলে। নদীতে হাঁসদের ভেসে বেড়ানোর গল্প শুনতে শুনতে আমিও যেন সেই নদীর পাড়ে হারিয়ে যাই। ফার্মগেটের একটা হোস্টেলে শারমিন থাকে। তার চাচার অফিসে পার্টটাইম কাজ করে। আমি খুব বেশি কথা জানতে চাই না। আমার মনে হয়, মানুষ যতটুকু তোমাকে বলবে, ততটুকুই তোমার শোনা উচিত। এর বেশি জানতে চাওয়া ব্যক্তিস্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে।

মাঝেমধ্যেই টিউশনির টাকা পেলে শারমিনকে আমি টাকা ধার দিই। ওকে সংসারের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়।

ঢাকা শহরে একা একটা মেয়ের টিকে থাকার যুদ্ধটা কঠিন। এর মধ্যে ওকে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। শারমিন আমাকে মানা করে। বলে—

এইবার টিউশনির টাকা দিয়ে না আপনার এক জোড়া জুতা কেনার কথা ছিল। এই যে পেরেক মেরে চলছেন, পা-টা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, সেটা কি ঠিক হচ্ছে?

আমি হেসে বললাম—

কখনো কখনো নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও কারো পাশে দাড়াতে সুখ পাওয়া যায়।

শারমিন হাসতে হাসতে একদিন বলল, “আসিফ ভাই, আপনার একটা সমস্যা আছে জানেন?”

“কী সমস্যা?”

“আপনি মানুষকে খুব সহজে বিশ্বাস করেন। এই শহরে এভাবে চললে ঠকে যাবেন একদিন।”

আমি হেসে বললাম, “ঠকলে ঠকব। কিন্তু সন্দেহ নিয়ে বাঁচার চেয়ে বিশ্বাস নিয়ে ঠকে যাওয়া ভালো।”

শারমিন কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে কী ছিল বুঝিনি, হয়তো মুগ্ধতা ছিল, হয়তো চাপা কষ্ট।

মাস ছয়েকের মধ্যে আমরা দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারতাম না। আমরা কেউ কাউকে ভালোবাসি, এই কথাটা আমরা বলিনি। কিন্তু একসঙ্গে পথ হাঁটা, বৃষ্টির মধ্যে এক ছাতার নিচে বসে বৃষ্টি দেখা। মন খারাপের দিনে দুজনের বাসে করে সেই তিনশ ফিটে চলে যাওয়া। বালু নদীর ধারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা।

আমরা গল্প করতাম। মানুষ কেন সংসার করে। কেন ভালোবাসা জীবনে দরকার হয়। আমরা হাসতাম, আমরা একসঙ্গে ভাবতাম, আমরা কখনো কষ্ট পেয়ে কাঁদতাম।

শারমিনের চোখে তখন আর কালি ছিল না, যা প্রথম দিন দেখেছিলাম। বরং একধরনের প্রশান্তি ছিল। আমি ভাবতাম, মানুষ বুঝি এভাবেই ভালো থাকতে শেখে।

৩।

তারপর একদিন হঠাৎ সব থেমে গেল।

শারমিনের ফোন বন্ধ পেলাম। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো নেটওয়ার্ক সমস্যা, বা ফোন হারিয়েছে। কিন্তু দুদিন, তিনদিন কেটে গেল, কোনো খোঁজ নেই। ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে পেলাম না, যেন কেউ পুরো অ্যাকাউন্টটাই মুছে ফেলেছে। ওর হোস্টেলে গিয়েও ওকে পেলাম না।

মানুষ যে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে, এই প্রথম বুঝলাম।

অনেক দিন আমি পাগলের মতো খুঁজেছি। থানায় জিডি করার কথাও ভেবেছি, কিন্তু কী বলে জিডি করব বুঝিনি—একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে গেলে সেটাকে কী বলে, আমি জানি না। শুধু বুঝেছিলাম, ও ইচ্ছা করেই আমার জীবন থেকে সরে গেছে। কিন্তু কেন, তার কোনো জবাব পাইনি।

সময় এভাবেই আমাকে টেনে নিয়ে গেল সামনের দিকে, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই।

অদ্ভুতভাবে, শারমিন হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার জীবনে একের পর এক ভালো জিনিস ঘটতে শুরু করল। যে চাকরির জন্য বছরখানেক ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, হঠাৎ ডাক এল। এক বছরের মাথায় প্রমোশন। মেস ছেড়ে ফ্ল্যাটে উঠলাম। বন্ধুদের কাছে হাসতে হাসতে বলতাম, “আমার একটা লাকি চার্ম ছিল, হারিয়ে গেছে। তারপর থেকেই কপাল খুলে গেছে।” সবাই হাসত, ভাবত রসিকতা। কিন্তু শুধু আমি জানতাম, এটা কতটা সত্য কথা।

জীবনের প্রতিটা ভালো খবরের পেছনে আমি শারমিনকে খুঁজছি, ওকে বলার জন্য। কিন্তু বলার মানুষটাই নেই।

তিন বছর কেটে গেল এভাবে।

৪।

একদিন অফিসের কাজে চট্টগ্রাম যেতে হলো। আগ্রাবাদের একটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে মিটিং। রিসেপশনে বসে অপেক্ষা করছি, এমন সময় একটা মেয়ে ফাইল হাতে হেঁটে এল। আমি একনজর দেখেই স্থির হয়ে গেলাম।

শারমিন।

ও আমাকে দেখে থমকে দাঁড়াল, হাত থেকে ফাইলটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ড আমরা দুজন শুধু তাকিয়ে রইলাম, যেন সময় থেমে গেছে।

মিটিং শেষ করে আমি আর সেদিন হোটেলে ফিরিনি। ওর অফিসের বাইরে অপেক্ষা করলাম। ও বের হয়ে আমাকে দেখে প্রথমে কিছু বলতে পারল না। তারপর ফিসফিস করে বলল, “তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ আমার জন্য?”

“তিন বছর ধরে খুঁজেছি, শারমিন। কেন চলে গিয়েছিলে, একটা কথাও না বলে?”

ও অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কাছের একটা পার্কে নিয়ে গেল আমাকে। বেঞ্চিতে বসে, চোখ নামিয়ে, ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।

“আসিফ, তোমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে আমার একটা অতীত ছিল, যেটা আমি কখনো তোমাকে বলিনি। আমার একটা মেয়ে আছে। ওর বয়স এখন সাত বছর। ওর জন্মের পর থেকেই শরীরে একটা জটিল সমস্যা ছিল, চিকিৎসার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য আমার ছিল না। ওর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল ওর জন্মের আগে।

“তখন জুলফিকার নামের লোকটার সঙ্গে পরিচয় হয়। ও শিখিয়েছিল কীভাবে সহজ-সরল মানুষদের বিশ্বাস অর্জন করে সহানুভূতির নামে টাকা আদায় করতে হয়। আমি প্রথমে রাজি হইনি, কিন্তু মেয়ের চিকিৎসার সামনে একসময় সব লজ্জা, সব নীতিবোধ হারিয়ে যায়। তোমার মেসে যাওয়াটাও আসলে ছিল সেই পরিকল্পনারই অংশ। জুলফিকার বলেছিল, এখানে অনেকে আছে সহজ মানুষ, যাদের কাছ থেকে সহানুভূতি দেখিয়ে সাহায্য নেওয়া যাবে।”

আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল, কিন্তু আমি কিছু বললাম না।

“কিন্তু তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে আমি ভুলেই গেলাম কেন এসেছিলাম। তোমার সারল্য, তোমার বিশ্বাস, কোনো হিসাব ছাড়া ভালোবাসা—এসব আমাকে বদলে দিল। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেললাম। কিন্তু ঠিক তখনই বুঝলাম, আমার অতীত জানলে তুমি হয়তো ঘৃণা করবে আমাকে। আর আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ, আমার এই অন্ধকার অতীত—এসব নিয়ে তোমার জীবনটা আমি জটিল করে দিতে চাইনি। তাই একদিন সব ফেলে চলে এসেছিলাম। ফোন বদলেছি, ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছি, যাতে তুমি আর খুঁজে না পাও।”

শারমিনের চোখে পানি টলমল করছিল।

তারপর আমাদের মাঝে অনেক সময়ের নীরবতা। শারমিন উঠে দাঁড়াল।

“আসিফ, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি চাই তুমি আমাকে ভুলে যাও। তুমি অনেক ভালো আছ এখন, আমি জানি। তোমার জীবনে আমার মতো একটা অতীত থাকা মানুষের কোনো জায়গা হওয়া উচিত না। আমি চলি।”

ও হাঁটতে শুরু করল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“শারমিন, তুমি যা বললে, তার একটা কথাও আমার কাছে নতুন কিছু বদলায়নি। তুমি অতীতে কী করেছ, কেন করেছ, সেটা আমি বুঝি। একজন মা তার সন্তানের জন্য কতদূর যেতে পারে, সেটা বিচার করার অধিকার আমার নেই। কিন্তু আমি এইটুকু জানি—তুমি যেমনই হও, যা-ই করে থাকো, আমি তোমাকেই চাই। তিন বছর ধরে আমি প্রতিটা ভালো মুহূর্তে তোমাকে খুঁজেছি, তোমাকে ছাড়া আমার কোনো সফলতা পূর্ণতা পাবে না। এখন তোমাকে সামনে পেয়ে আমি তোমাকে আবার হারাতে দেব না।”

শারমিন থমকে দাঁড়াল। ওর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। ও ফিসফিস করে আমাকে জিজ্ঞেস করলো

“তুমি কি নিশ্চিত?”

“আমার জীবনে এত নিশ্চিত আর কিছুতে হইনি।”

সন্ধ্যা নামছিল পার্কে। দূরে কোথাও একটা রিকশার ঘণ্টি বাজল। শারমিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল।

“তুমি কি আমার মেয়েসহ মেনে নেবে? আমার মেয়েকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি আসিফ।

“তুমি এবং তোমার মেয়ে দুজনই আমার আত্মার অংশ হয়ে থাকবে, শারমিন। তুমি আমার যতটা প্রিয়, অবশ্যই তোমার মেয়ে আমার কাছে তার চেয়েও বেশি প্রিয় হবে।”

আমি জানি না জুলফিকার নামের লোকটা এখন কোথায় আছে, কাকে কী মিথ্যা গল্প শোনাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, তার বলা একটা মিথ্যা গল্প থেকেই শুরু হয়েছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সত্যি ভালোবাসার গল্প।



সমাপ্ত
 
Back
Top