আনেখসেনামুন : একটি অশ্রুবিন্দুর নাম

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
443
Messages
6,994
Reaction score
5,011
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
আনেখসেনামুন : একটি অশ্রুবিন্দুর নাম

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






কথক - পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি হলো পিরামিড। পিরামিড যে দেশে গড়ে উঠেছিল সেই দেশটি নীল নদের তীরে অবস্থিত। সেই দেশের সভ্যতার সূচনা ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।হ্যাঁ মিশর সভ্যতার কথা বলছি। ৫ হাজার বছর ধরে প্রবহমান এই সভ্যতায় নারীর স্থান ছিল ঠিক সেইখানটায় যেখানে এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও আমরা নারীকে খুঁজে পাই, পুরুষের সমকক্ষ বলে বলেও যাকে রাখা হয় পুরুষের পায়ের নিচে।এরকম অজস্র নারীর একজনের গল্প শোনাবো আজকে আপনাদের, তিনি - রানী আনেখসেনামুন।

আনেখসেনামুনের পিতা অষ্টাদশ রাজবংশের ফারাও চতুর্থ আমেন হোটেপ পূর্বপুরুষদের ধর্ম পরিত্যাগ করে নিজের নাম রেখেছিলেন আখেনাতেন। তার একেশ্বরবাদ জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন প্রজাদের উপর। তার যোগ্য সহধর্মিনী ছিলেন আখেনাতেনের মামা আইয়ের কন্যা মিশরের সুন্দরী রানী নেফারতিতি। স্বামীকে নিজের বশে রাখার জন্য স্বামীর শয্যায় নিজের তিন মেয়েকে পাঠাতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। আশা ছিল এই মেয়েদেরই কারও না কারও গর্ভে জন্ম নেবে আখেনাতেনের পুরুষ উত্তরাধিকারী। কিন্তু বড়ো দুটি কন্যার মৃত্যু ঘটে প্রসবকালে। ।বাল্যকালে পিতার কাছে ধর্ষিতা আনেখসেনামুন পরবর্তীকালে হয়েছিলেন তার সৎ ভাই তুতেনখামেনের সাম্রাজ্ঞী। কিন্তু বালক সম্রাট তুতেন খামেনের অকাল মৃত্যুর কথা আপনারা সকলেই জানেন।তার পরে আনেখসেনামুন যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই রাজ্য শাসন করছিলেন কারণ তুতেনখামেন ফারাও থাকলেও আদতে শাসন করতেন তিনিই। কিন্তু নারীর শাসন মানবে কেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ? তাদের একজন পুরুষেরই খুব দরকার। আর এই সুযোগে আখেনাতনের মামা, নেফারতিতির পিতা বৃদ্ধ আই বিবাহ করার অভিপ্রায় জানালেন নাতনি সাম্রাজ্ঞী আনেখসেনামুনকে। রাজপ্রাসাদে তখন অস্থির এক সময় -
দিনা - হে মিশর-সাম্রাজ্ঞী আনেখসেনামুন, তুমি অধীর হয়ো না। এ নিতান্তই সৈনিকদের প্রাত্যহিক জমায়েত। আমি প্রাসাদের অলিন্দ থেকে যা দেখতে পাচ্ছি তাই তোমাকে জানাবো। কোন বিদেশি সৈন্যদলকে সীমান্ত বরাবর দেখা যাচ্ছে না।

আনেখসেনামুন - অধীর তো সেই কারণেই আরও হচ্ছি ।এখনো কেন হিত্তির রাজকুমার তার সৈন্যদল নিয়ে মিশর আক্রমণ করল না? তুমি হিত্তির রাজাকে আমার লেখা প্যাপিরাসখানি দিয়েছিলে তো দিনা? আমি স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছি রাজা যেন তার যেকোনো একজন রাজপুত্রকে মিশরে পাঠান আমাকে উদ্ধার করার জন্য। মহামান্য আই আমাকে বিবাহ করে মিশরের সিংহাসনে বসতে চান।লোলচর্ম বৃদ্ধের লালসার লালা টসটস করছে। তাকে পরাজিত করলেই আমি রাজকুমারকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নেব। তিনিই হবেন ভবিষ্যৎ মিশরের ফারাও। তবুও কেন অপেক্ষা এতো দীর্ঘ?
দিনা - একি আর নীল নদের বন্যা যে হুড়হুড় করে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! তোমার সংবাদ পেয়ে সৈন্য সামন্ত প্রস্তুত করে মিশর আক্রমণ করতে কিছু তো সময় লাগবে নাকি?

আনেখসেনামুন - আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না দিনা, এই দেখো আমার হাতে শক্ত হয়ে কেটে বসেছে শিকলের বেড়ি। আমার শরীরে বিগত কয়েকদিনের ব্যবহৃত বস্ত্র।, আমি প্রাসাদের এই কক্ষটি ছেড়ে কোথাও যেতে পারিনি এই কদিন।

দিনা - আনেখসেনামুন, তোমার কষ্টে আমার বুক ফেটে যায়।তুমি আমার সেই ছোট্ট, রাজকুমারী। তোমার মা নেফারতিতির দাসী ছিলাম আমি। যখন এই আল- আমারনায় রাজধানী স্থাপন হল তখন আমিও ওর সাথে এখানে চলে এলাম। নিজের ধর্ম, নিজের দেশ - আমার সবকিছু বদলে গেল ।
আনেখসেনামুন - এতো কষ্ট নিয়ে তুমি আজীবন থেকে গেলে এই আল -আমারনা শহরে?

দিনা - সব কষ্ট চলে গেছিলো। কখন জানো? যেদিন ছোট্ট তোমাকে আমার কোলে তুলে দিয়েছিল ওরা। কী সুন্দরীই যে ছিলে তুমি ,ছোট্ট তুলতুলে একটা পরী।

আনেখসেনামুন - ভাগ্য না সহায় থাকলে রূপ কোন কাজে লাগে না। রূপ হয়ে ওঠে অভিশাপ।প্রতি রাতে আমাদের এক এক বোনকে বলি দেওয়া হতো, রেহাই মিলতো না। আর সেই সব রাত আমার জীবনে আবার ফিরে আসতে চলেছে। বৃদ্ধ আই প্রতি রাতে আখেনাতনের মতোই আবার.....আহ্, অসহ্য সবকিছু।দিনা, কেন তুমি ভালো করে দেখছো না হিত্তির রাজকুমার আসছে নাকি।

দিনা - নাহ্, কেউ আসেনি আনেখসেনামুন, এমন কি প্রাসাদের সৈন্যদলেরও হট্টগোল থেমে গেছে এখন।কি অদ্ভুত নীরবতা এক প্রাসাদে।
আনেখসেনামুন - যেমন নেফারতিতি কি অসম্ভবভাবে নীরব থাকতো আমাদের তিন বোনের উপর অত্যাচারের সময়।কোন প্রতিবাদ নেই, যেন পুরুষকে ধরে রাখার একটাই মন্ত্র - তার সমস্ত অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া।
দিনা - পুরুষকে ভাল রাখার, ধরে রাখার সব দায় যেন একা নারীরই।

আনেখসেনামুন - মা কিন্তু আমাদেরকে ভালবাসত দিনা। পরদিন সকালে কি আপ্রাণ পরিচর্যা তার। সব ক্ষত প্রলেপে প্রলেপে ঢেকে দিতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু বল সব ক্ষত নিরাময় হয়?
দিনা - আনেখসেনামুন , সেদিনও তোমার যন্ত্রণায় আমার বুক ফেটে যেত, আজও যাচ্ছে। কিন্তু আমি যে সামান্য ক্রীতদাসী।

আনেখসেনামুন - কিন্তু আজ এই ক্রীতদাসীর কাছেই আমার জীবনের শেষ আশাটুকু বন্ধক রেখেছি। দেখো দেখো, জানলা দিয়ে একবার দেখো ,হিত্তির কোন ঘোড়সওয়ার দেখা কি যায় না?
দিনা - ধৈর্য ধরো মিশর সম্রাজ্ঞী, আমাকে যতটুকু করতে বলেছ আমি করেছি, মহামান্য আইয়ের বিরুদ্ধাচরণ করেছি, তিনি ফারাও আখেনাতনের মামা,তোমার মা নেফারতিতির পিতা। তার উপর তিনি রাজপুরোহিত,সূর্যের উপাসক।

আনেখসেনামুন - সবাই শুধু সূর্যের আলো দেখে। সূর্যের কলঙ্ক দেখবে কে?
দিনা - মিশরের মহান ঐতিহ্য ,সভ্যতার ইতিহাস - এটাই পৃথিবী দেখবে। অন্দরমহলের ক্লেদ,যন্ত্রণা, রক্তের দাগ মুছে ফেলতে হয়।

আনেখসেনামুন - কি অদ্ভুত না আমাদের এই মিশরের ঐতিহ্য,যেখানে সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্য পরিবারের মধ্যেই বিয়ে করতে হয় মেয়েদেরকে। যোগ্যতা থাকলেও সংসারই হোক বা সাম্রাজ্য - চালানোর জন্য একজন পুরুষ প্রতিনিধির অত্যন্ত প্রয়োজন এ জগতে।আখেনাতনের মৃত্যুর পর নেফারতিতি যখন সিংহাসনে বসলো,তখনও জরুরি ছিল একজন পুরুষ ফারাও এর।
দিনা - তুমি তখন সদ্য ফুটে ওঠা ১৭ বছরের ফুল আর তোমার সৎ ভাই তুতেনখামেন ন'বছরের বালক মাত্র। তবু বিয়ে দেওয়া হলো তোমাদের।

আনেখসেনামুন - নারীর কি নিজস্ব ইচ্ছে থাকতে নেই?
দিনা - না নেই। আমি ক্রীতদাসী, আমার ইচ্ছেও যেমন কেউ কখনো জিজ্ঞাসা করেনি, তুমি রাজকুমারী আনেখসেনামুন - মিশরের পরম্পরা তোমারও ইচ্ছে জানতে চায়নি কখনো।

আনেখসেনামুন - আমার তখন উদ্যত যৌবন ,উন্মত্ত মনবাসনা ,আর বিপরীতে একটি নবছরের বালক সম্রাট ।
দিনা - মিশরের মতো উত্তপ্ত দেশে যদিও ন'বছরের বালককে অপাপবিদ্ধ বলা চলে না, তবুও উন্মত্ত নীলনদের জল কি সামান্য বালির বাঁধে আটকায়?

আনেখসেনামুন - তুতেনখামেন আর আমার অসম দাম্পত্য আমাদের জীবনে সুখ শান্তি আনতে না পারলেও মিশরবাসীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তাদের ধর্মাচরণের অধিকার। এক ঈশ্বরবাদ থেকে আমরা মিশরবাসীকে আবার দাঁড় করাতে পেরেছিলাম বহু ঈশ্বর বিশ্বাসের পুরোনো জায়গায়।
দিনা - আমরা দুহাত তুলে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেছিলাম তাই। ভেবেছিলাম তোমাদের যৌথ শাসনে মিশরের স্বর্ণযুগ আবার ফিরে আসবে।

আনেখসেনামুন - যৌথ? কখনো দেখেছো চার চাকার রথের একটি চাকা ভাঙ্গা থাকলে সেই রথ চলে? তোমাদের তুতেনখামেন দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী, একটি পা তার পঙ্গু। সে আমার সঙ্গে যৌথ জীবনই চালাতে পারেনি তো যৌথ শাসন চালাবে।
দিনা - তোমাদের মধ্যে যে অসীম ফাঁক ছিল সেটা পূরণ হয়ে যেত যদি নীলনদের উর্বর পলি যেরকম ঢেকে দেয় সমস্ত এবড়ো খেবড়ো জমি, সেরকম সন্তান এসে যদি -

আনেখসেনামুন - সন্তান, আসেনি সন্তান?তোমার মনে পরেনা দিনা?যখন প্রথম মা হবো জানলাম ,কতনা আনন্দ আমার।
দিনা - কিন্তু তুতেনখামেনের চোখে কেমন যেন ভয় ,অবিশ্বাস আর হিংস্রতা।

আনেখসেনামুন - আমিও বুঝতাম ওর অস্থিরতা।কিন্তু ভেবেছিলাম বয়সে কত ছোট ও আমার চেয়ে। আমার স্নেহের প্রতি ওরও যে দাবি আছে। হয়তো অনাগত সন্তান ওর সেই স্নেহের দাবি কেড়ে নেবে বলে ও এত শঙ্কিত।
দিনা - আমি ভেবেছিলাম সন্তানের মুখ দেখলে আমাদের ছোট্ট রাজকুমার তুতেনখামেন পিতৃত্বের আনন্দ অনুভব করবেন, দায়িত্ব নিতে শিখবেন।

আনেখসেনামুন - জানো দিনা, যখন ছোট্ট তুলতুলে মানুষের রূপ ধরে আমার বুকের কাছে ঘনিয়ে এলো একটা শিশু তখন ওরা খবর দিল ওদের সম্রাটকে। তুতেনখামেন এলো ,হাতে তুলে নিল আমাদের সন্তানকে। বারবার আমার মুখের দিকে তাকালো আর সন্তানের মুখের দিকে। তারপর একজন দাসকে ইঙ্গিত করলে সে একটা আয়না নিয়ে এলো সম্রাটের সামনে। সেই আয়নায় তুতেনখামেন নিজের মুখ দেখতে লাগল আর শিশুটিকে। তারপর দাসীরা শিশুটিকে নিয়ে গেল চোখের আড়ালে। যখন ফিরিয়ে দিয়ে গেল তখন সে ছিল নিথর, ঠান্ডা মাংসপিণ্ড।
দিনা - হা ঈশ্বর,হা দেবতা আমুন,দেবী হাথর রক্ষা করো।তুমি অযথাই এই শিশুহত্যার দোষ আরোপ করছো। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সে জন্ম নিয়েছিল। এই পৃথিবী তার বাঁচার পক্ষে অনুকূল ছিল না।

আনেখসেনামুন - রক্ষা করেননি কেউ।এক নয়, দুই নয়, পরপর তিন সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল। তুতেনখামেনের সন্দেহ ছিল কোন সন্তানই ওর নয়। কিন্তু দিনা আমি যে দেবতা আমনের সামনে শপথ করে সম্রাটকে নিজের স্বামী হিসেবে স্বীকার করেছিলাম। বিশ্বাসঘাতকতা আমি করিনি কখনো।
দিনা - কিন্তু ভালোও কখনো বাসোনি সম্রাট তুতেনখামেনকে।

আনেখসেনামুন - ভালোবাসা কখনো কোন সম্রাটের জীবনে অপরিহার্য নয় দিনা।
দিনা - ভালোবাসা হীনতা কিন্তু সম্রাটের পক্ষে প্রাণঘাতী। কিশোর সম্রাট কেন আর বেশি দিন বাঁচলেন না এই সম্বন্ধে কত না গল্পকথা ছড়িয়েছে প্রাসাদের দেওয়ালে দেওয়ালে।

আনেখসেনামুন - এই নিয়ে বিতর্কের কী আছে? সবাই জানে রোগে ভুগে মারা গেছিলেন সম্রাট।
দিনা - কিন্তু যারা মমি তৈরি করেছিল তারা বলেছিল সম্রাটের মাথার পিছনে গভীর ক্ষত ছিল।

আনেখসেনামুন - মৃত্যুটাই আসল সত্য, তার কারণে কী এসে যায়? তোমাদের সম্রাট কে যথাপযুক্ত সম্মানে পিরামিডে স্থান দেওয়া হয়েছিল তো? তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল তো কারুকার্যখচিত সারকোফেগাস অর্থাৎ পাথরের শবাধার?অতি যত্নে নির্মাণ করা হয়েছিল তো তার মমি? তার পিরামিড ভরে দেওয়া হয়েছিল তো সোনা, মণি, মুক্তো, বিবিধ অলংকার আর তৈজসপত্রে? আর কী চাও দিনা?
দিনা - সত্য, ফেরাউন আনেখসেনামুন, সাধারণ জনগণ শুধু সত্য জানতে চায়।

আনেখসেনামুন - সত্য? সত্য বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব নেই দিনা। ফারাও- ফেরাউনরা যা দেখাবে তাই একমাত্র সত্য।
দিনা - তাই যদি হয় তবে ফারাও তুতেনখামেন আর ফেরাউন আনেখসেনামুন জনগণকে কেন দেখালেন না রানী নেফারতিতির শেষ পরিণতি কী হল? কেন তার কবর সমগ্র মিশরে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না?

আখেনসেনামুন - চুপ, দিনা চুপ। জানোনা নেফারতিতির নাম মিশরের নেওয়া বারন।নেফারতিতি ধর্মদ্রোহী। আমরা সমস্ত প্যাপিরাসের পাতা থেকে নেফারতিতির নাম মুছে দিয়েছি। রানী নেফারতিতি এখন শুধু কিছু মন্দিরের গাত্রে ছবি হয়ে আছেন। সেই ছবিগুলো মুছিনি আমরা। ছবি মুছলে ভাস্কর্যের ক্ষতি হয়।
(বাইরে সৈন্যদলের হট্টগোল)
দিনা - বাইরে ও কিসের চিৎকার? দাঁড়াও , আমি দেখে আসি।

আনেখসেনামুন - তাড়াতাড়ি বলো দিনা।বলো হিত্তির রাজকুমার চলে এসেছে তাই তো?
দিনা - হঠাৎ যেন সৈন্যবাহিনী ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির ঘুম ভেঙে জলন্ত লাভার মতন বেরিয়ে আসতে চাইছে।

আনেখসেনামুন - ওহ্ মুক্তি, তোমার স্বাদ নীল নদের জলের থেকেও মিষ্টি। দেখো দেখো দিনা জানলা দিয়ে একটু দেখো। রাজকুমার কি সুন্দর দেখতে? শক্তিশালী বাহু তার?জানো তো পুরুষের সব সৌন্দর্য তার বাহুতে।দুই বাহু, সারা শরীর নিশ্চয়ই এতোক্ষণে ধুলো আর রক্তে একাকার হয়ে গেছে?
দিনা - দেখেছি সম্রাজ্ঞী আখেনসেনামুন, হিত্তির রাজকুমারই এসেছেন বটে।রক্তাক্ত, ধূলি ধুসরিত।মৃতদেহের তার বিঁধে আছে আমূল তরবারি।

আনেখসেনামুন - না,তা কী করে সম্ভব?আমার সবকিছু এভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে না।হিত্তির রাজকুমার আক্রমণ করছে এ কথা আগে থেকেই সৈন্যদলের জানা না থাকলে তো এমনটা হওয়ার কথা নয়।কে সেই বিশ্বাসঘাতক?
দিনা - মহামান্যা,আমিই সেই বিশ্বাসঘাতিনী।

আনেখসেনামুন - তুমি?কেন? কিসের জন্য?
দিনা - প্রেম।

আনেখসেনামুন - প্রেম?কে সেই প্রেমিক তোমার? যার জন্য আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও তুমি দ্বিতীয়বার ভাবোনি?
দিনা - মহামান্য মিশর।

আনেখসেনামুন - ক্রীতদাসীর দেশপ্রেম?
দিনা - দাসদাসী কি ভালবাসতে পারে না দেশকে?এই দেশেই যে জন্ম আমার, এই দেশেই বেড়ে ওঠা।

(বাইরে জোরে জোরে দরজায় করাঘাত)
আনেখসেনামুন - ওরা আমাকে নিতে এসেছে।আমাকে ওরা টুকরো টুকরো করবে। ষড়যন্ত্রের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
দিনা -ঠিক এখনই নয় কারণ মিশরের ফারাও হওয়ার জন্য তোমাকে এখন দরকার আইয়ের। সৈন্যরা এসেছে আমাকে নিতে। মহামান্য আইয়ের আদেশে আমাকে ওরা জীবন্ত মমি করবে। শরীরের সমস্ত মাংসটা গলিয়ে গলিয়ে বার করে নেবে তারপর আমার চামড়ায় মাখাবে ওষধি.......

আনেখসেনামুন - হা হা হা হা, উপযুক্ত শাস্তি তোর পিশাচী। বিশ্বাস ,ভালোবাসার যারা মর্যাদা রাখে না তাদের এই রকম প্রতিদানই পাওনা।
দিনা - মিশরের ইতিহাসে ক্ষমতার প্রতি ভালবাসা ছাড়া আর কিছুর প্রতি ভালোবাসা ছিল না কখনো। তবু করুনা করে আই কিছু সময় দিয়েছিলেন আমাকে তোমার সাথে জীবনের শেষ প্রহরটুকু কাটিয়ে যাওয়ার। তোমার ক্ষমা যেন পাই এইটুকুই আমার শেষ প্রার্থনা। সেই ছোট্ট থেকে আমি তোমাকে বুকে করে আগলিয়েছি। ভালোবেসেছি নিজের কন্যাটির মত। কিন্তু যখন তুমি মিশরে বিদেশী শক্তিকে ডেকে আনলে আক্রমণ করাতে আমি সহ্য করতে পারলাম না।

(দরজায় প্রবল জোরে করাঘাত এবং লোকজনের শোরগোল) আমাকে যেতে হবে আনেখসেনামুন।এই সামান্য ক্রীতদাসী আর তার দেশপ্রেমকে ক্ষমা করো -

কথক - মাতামহ আইকে বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন আনেখসেনামুন। ফারাও হিসেবে আইয়ের প্রতিষ্ঠার পরে বেশি দিন আর আনেখসেনামুনকে মিশরবাসী দেখেনি। জানা যায় না তার শেষ পর্যন্ত কী শাস্তি হয়েছিল। এমনকি তার কবরও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু চিরকাল একটি অশ্রু বিন্দুর নাম হিসেবে মিশরের সবচেয়ে হতভাগিনী দুঃখিনী রানী আনেখসেনামুন রয়ে যাবেন মানুষের হৃদয়ে।
 
Back
Top