Collected আমার দেখা একটি বর্ষার দিন

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
473
Messages
7,824
Reaction score
7,104
Points
4,113
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
আমার দেখা একটি বর্ষার দিন

মূল লেখকঃ সোহেল আর রানা







আমি জীবনে প্রায় দশ হাজার খাতা দেখেছি। বাংলা পরীক্ষার খাতা। লাল কালির কলম দিয়ে নম্বর দিয়েছি। কোথাও আট। কোথাও বারো। কোথাও পঁচিশ। কোথাও শূন্য। মানুষের লেখা দেখে মানুষকে বিচার করা আমার পেশা ছিল। কখনো ভাবিনি, একদিন একটা খাতা আমার নিজের জীবনটাকেই বিচার করবে।

ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগের।

তখন আমি মোহনগঞ্জ হাই স্কুলের শিক্ষক। নবম শ্রেণির খাতা দেখতাম। সেবার একটা রচনা ছিল, “আমার দেখা একটি বর্ষার দিন।”

বেশিরভাগ ছাত্র একই কথা লিখেছিল। বৃষ্টি। কাদামাটি। ছাতা। ভেজা রাস্তা। খিচুড়ি। নদী। কারও কারও লেখায় রবীন্দ্রনাথও এসেছিলেন। কারও লেখায় নজরুল। কেউ লিখেছিল, “বর্ষা আমার প্রিয় ঋতু।” কেউ লিখেছিল, “বর্ষার সৌন্দর্য অপরূপ।” সবই পরিচিত কথা।

তারপর একটা খাতা পেলাম। খাতাটা অন্যগুলোর মতো ছিল না। ছেলেটা লিখেছিল,
“আমাদের বাড়িতে বৃষ্টি হলে মা হাঁড়ির নিচে আরেকটা হাঁড়ি বসায়। কারণ ছাদ দিয়ে পানি পড়ে।”
আমি পড়তে থাকলাম।
“আমার মা বলে, বৃষ্টি ভালো। কারণ বৃষ্টি হলে ধুলো কমে।”
তারপর,
“আমি বৃষ্টি পছন্দ করি না।”
পরের লাইনে কারণ লিখেছে,
“বৃষ্টির দিনে বাবার মেজাজ খারাপ থাকে।”
আমি একটু থেমে গেলাম।
ছেলেটা লিখেছে,
“বাবা রিকশা চালায়। বৃষ্টি হলে মানুষ রিকশায় কম ওঠে। তাই সেদিন আমাদের ভাত কম হয়।”
তারপর শেষ দিকে একটা লাইন,
“আমি বড় হয়ে এমন একটা কাজ করতে চাই, যেদিন বৃষ্টি হলে কারও ভাত কমবে না।”

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ছেলেটা সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লেখেনি। মাত্র তিনটা প্রশ্নের উত্তর লিখেছে। বাকী দুইটাতে তেরো পেয়েছে। অর্থাৎ রচনায় বিশের মধ্যে বিশ না পেলে ছেলেটা ফেইল করবে।

জানি না কেন, আমি আমার শিক্ষাগত জীবনে প্রথমবারের মতো নিয়ম ভাঙলাম। আমি খাতাটা বন্ধ করলাম। উপরে নম্বর দিলাম, ৩৩।
৩৩ খুব বেশি নম্বর না। ছেলেটা ভালো লিখেছিল।
আমি খাতার উপর ছোট করে লিখে দিলাম,
“ভাষা ভালো। নিজের অভিজ্ঞতা ধরে রাখবে।”

সেদিন প্রায় একশো বিশটা খাতা দেখেছিলাম। রাতে বাসায় ফিরে খাতাটার কথা ভুলে গেলাম।

বারোদিন পর স্কুল থেকে একটা চিঠি এলো। কয়েকটা খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। একটা খাতায় অভিযোগ, নম্বর বেশি দেওয়া হয়েছে। খাতাটা আমার হাতে এলো। আমি নাম দেখে চিনতে পারলাম। সেই ছেলেটা। নাম,
সাইফুল ইসলাম। তার নম্বর ৩৩ থেকে ২০ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কারণ হিসেবে হেডস্যার লিখেছেন,
“অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। প্রশ্নের বিষয়বস্তু যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি।”

আমি আবার খাতাটা পড়লাম। একই লেখা। একই বৃষ্টি। একই ভাঙা ছাদ। একই রিকশাওয়ালা বাবা। আমি ৩৩ ই রাখলাম।

হেডস্যার আমার উপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলেন। এই কারণেই কি-না, মাসখানেক পর আমাকে রাঙামাটি সরকারি হাইস্কুলে বদলি করা হলো।

তারপর অনেক বছর কেটে গেল।

আমি অবসর নিলাম। আমার ছাত্ররা দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেল। কেউ ডাক্তার। কেউ ব্যাংকার। কেউ শিক্ষক। কেউ বিদেশে। কেউ আর কোনোদিন যোগাযোগ করেনি। এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষকের জীবনে ছাত্ররা আসে। থাকে।তারপর চলে যায়। শুধু কিছু খাতা থেকে যায়। কিছু বাক্য থেকে যায়।

একদিন দুপুরে আমার বাসায় একজন যুবক এল। বয়স পয়ত্রিশের কাছাকাছি। পরনে খুব সাধারণ শার্ট। হাতে একটা ফাইল।
সে বলল,
“স্যার, আমাকে চিনেছেন?”
আমি বললাম,
“চেহারা পরিচিত লাগছে।”
সে হাসল।
“চিনবেন না।”
তারপর ফাইল খুলে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।
আমার লেখা।
লাল কালিতে।
“ভাষা ভালো। নিজের অভিজ্ঞতা ধরে রাখবে।”
আমি অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তারপর বললাম,
“সাইফুল?”
সে মাথা নেড়ে হাসল।
“জি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“এত বছর পর?”
“আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে আসছি।”

সে ফাইল থেকে একটা ছবি বের করল। ছবিতে একটা বড় ঘর। অনেকগুলো মেশিন।
দেয়ালে লেখা,
“বৃষ্টির দিনেও কাজ বন্ধ হবে না।”
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“এটা কী?”
সে বলল,
“আমার কারখানা।”
“তুমি কারখানা করেছ?”
“জি।”
“কী তৈরি করো?”
“রেইনকোট।”
আমি হেসে ফেললাম।

সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
আমি তাকে চা দিলাম।
সে বলল,
“স্যার, আমি একটা কথা বলতে চাই।”
“বলো।”
“আপনি যদি ঐ খাতায় ৩৩ না দিতেন!”
সে থেমে গেল।
“তাহলে?”
“বাবা আমার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতো।”
তারপর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
”হয়তো বাবার মতো আমাকেও রিকশা চালাতে হতো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দাওনি কেন?”
সে একটু নিচের দিকে তাকাল।
“আমার মা খুব অসুস্থ ছিল।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
“নেত্রকোনা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময়ও জানতাম না মা বাঁচবে কি না। হলের মধ্যে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, আমি এখানে কী করছি?”
সে একটু থামল।
“সেদিন আমার মাথায় পরীক্ষা ছিল না, স্যার। শুধু মনে হচ্ছিল, মা একা শুয়ে আছে।”
“তোমার মা?”
“একমাস পর মারা গেছেন।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
বললাম,
“কলেজে ভর্তি হয়েছিলে?”
“জি”
“বিশ্ববিদ্যালয়?”
“জি?”
“কী নিয়ে পড়েছো?
“টেক্সটাইল।”
আমি হেসে বললাম,
“তাহলে রেইনকোটের সঙ্গে সম্পর্ক আছে।”
সে বলল,
“আছে।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“কিন্তু আমার আসল কাজ অন্য।”
“কী?”
সে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি এমন কাপড় বানানোর চেষ্টা করি যেটা খুব সস্তায় মানুষের শরীর শুকনো রাখতে পারে।”
আমি বললাম,
“কেন?”
সে আমার দিকে তাকাল।
“কারণ আমি বৃষ্টিতে ভাত কম খেয়েছি।”

আমি আর কথা বললাম না। তারপর সে আমাকে কারখানায় নিয়ে গেল। বিশাল কারখানা। হাজারের উপর কর্মী। বেশিরভাগই নারী।
একটা মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে সাইফুল বলল,
“বৃষ্টি হলে এখানে কারো ভাতের অভাব হয় না।”
আমি বললাম,
“তুমি কি সব কর্মীকে বৃষ্টির দিনে বাড়তি টাকা দাও?”
সে বলল,
“না।”
“তাহলে?”
“বৃষ্টি হলে কাজ বেশি দিই।”
আমি বুঝলাম না।
সে বলল,
“বাইরে যারা রাস্তায় কাজ করতে পারে না, তাদের জন্য এই কারখানাটা খোলা থাকে।”

তারপর আরেকটা মেশিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
একজন মহিলা সেলাই করছিল।
সাইফুল তাকে বলল,
“খালা, আজ কয়টা?”
মহিলা বললো,
“বত্রিশ।”
সাইফুল হেসে বলল,
“ঠিক আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তার নাম?”
“শাহিদা।”
“কতদিন ধরে কাজ করে?”
“দুই বছর।”
শাহিদা আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো।
তারপর আবার কাজ করতে লাগলো।

বাড়ি ফেরার আগে সে আমাকে একটা ছোট প্যাকেট দিল।
আমি বললাম,
“এটা কী?”
“পড়ে খুলে দেখবেন।”
“কেন?”
“আমার সামনে খুললে আমি লজ্জা পাব।”
আমি হেসে প্যাকেটটা নিলাম।

বাড়ি ফেরার পথে খুলে দেখি, একটা রেইনকোট। খুব সুন্দর। ভেতরে ছোট একটা কাগজ। তাতে লেখা- “স্যার, আপনি আমাকে নম্বর দিয়েছিলেন। আমি শুধু চেষ্টা করেছি, নম্বরটার মান রাখতে।”
আমি অনেকক্ষণ কাগজটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। সময়টা উদযাপন করতেই কি-না, বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। আমি রেইনকোটটা ব্যাগ থেকে বের করে গায়ে দিলাম। রাস্তা ভিজে যাচ্ছিল। রিকশাগুলো ধীরে চলছিল। দোকানের টিনের চাল থেকে পানি পড়ছিল। একটা বাচ্চা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে ছাতা নেই। কিন্তু সে ভয় পাচ্ছিল না। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকে দেখলাম। তারপর হঠাৎ মনে হলো, মাঝে মাঝে পৃথিবীর এক প্রান্তে নিয়ম ভাঙতে হয়, যেন পৃথিবীর আরেক প্রান্তে দারুণ কিছু গড়ে ওঠে।

আমি হয়তো সারা জীবন খাতায় নম্বর দিয়েছি। কিন্তু সেদিন প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছি, কখনো কখনো একজন শিক্ষক শুধুমাত্র ছাত্রের খাতা দেখেন না। তার সামনে পড়ে থাকে একজন মানুষের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে পাশ করিয়ে দেওয়ার জন্য সামান্য কয়টা নম্বরই যথেষ্ট!
 
Back
Top