Collected অ্যাবিসের কাবার্ড

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
430
Messages
6,781
Reaction score
4,559
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
অ্যাবিসের কাবার্ড

মূল লেখকঃ সুবর্ণা শারমিন নিশী






বিয়ের নয় মাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু শিবলী আর শারমিনের জীবনে তখনো হানিমুন নামক শব্দটা এক ধূসর স্বপ্ন হয়েই ছিল। বিয়ের মাত্র তিন দিন পরেই শিবলীর বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আনন্দ উৎসবের ঘর নিমেষেই বিষাদে ডুবে গিয়েছিল। এরপর শুরু হলো সংসারের ঘানি আর দুই কর্মজীবী মানুষের ছুটির হাহাকার। শিবলী একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এবং শারমিন একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করে। যদিও উচ্চবিত্ত পরিবারের শারমিনের চাকরি না করলেও চলে তবুও সে নিজে স্বাবলম্বী হতে চায়। আর এই স্বাবলম্বী হওয়ার চক্করে এখন তার জীবন ওষ্ঠাগত। দুজনের ছুটি মেলানো মানে অমাবস্যার চাঁদ হাতে পাওয়া।

অবশেষে জানুয়ারির মাঝামাঝি একটা সুযোগ এল। সরকারি ছুটি আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে একটু ফুরসত। শিবলী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।
- আর দেরি না শারমিন, চলো এবার কক্সবাজার ঘুরে আসি।

-কিন্তু এভাবে, কোন প্রিপারেশন ছাড়া.. শারমিনের মনে একটু আশঙ্কা।

-আমাদের যে অবস্থা! তাতে এভাবেই যেতে হবে। তোমার আমার ছুটি একসাথে মেলাতে গেলে বছর পার হয়ে যাবে।

শারমিন ভেবে দেখল কথাটা ঠিক। সে রাজি হয়ে গেল।তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গোছানো হলো। কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কোনো হোটেল বুক করা হয়নি। শিবলী ভেবেছিল, গেলে কোন না কোন ব্যবস্থা তো হবেই। কিন্তু তারা যখন কক্সবাজার পৌঁছাল, তখন বুঝতে পারল অবস্থা কতটা শোচনীয়। পুরো শহর পর্যটকে ঠাসা।

বাস থেকে নেমে কয়েক ঘণ্টা হোটেলের খোঁজে এদিক-সেদিক ঘুরে তারা যখন ক্লান্ত, ঠিক তখন তারা এসে দাঁড়াল সি-ভিউ প্যারাডাইস হোটেলের সামনে। ঝকঝকে নাম হলেও হোটেলের অবয়বে কেমন যেন একটা গুমোট ভাব।

রিসেপশনে ছিল বছর পঞ্চাশের এক লোক, নাম রফিক। তাদের দেখে লোকটা পেশাগত নরম হাসি হাসলো।

-আমাদের ডাবল বেডের একটা এসি রুম দরকার। শিবলী বলে উঠলো।

-দুঃখিত স্যার ক্ষমা করবেন, আসলে এখন পিক সিজন চলছে তো, কোন রুম খালি নেই।

শারমিন ক্লান্তিতে সোফায় ভেঙে পড়েছিল। শিবলী কিছুটা নরম হয়েই বলল,
-আমার ওয়াইফ খুব অসুস্থ বোধ করছে। যে কোনো একটা রুম অন্তত আজ রাতের জন্য দিন। আমরা অনেক ঘুরেছি কিন্তু কোথাও রুম ফাঁকা নেই। দেখুন না ভাই ব্যবস্থা করা যায় কিনা।

রফিকের এক কথায় উত্তর,
-ক্ষমা করবেন স্যার।

ঠিক তখনই পেছন থেকে হোটেলের মালিক মাজহারুল সাহেব বেরিয়ে এলেন। তিনি এসেই রফিককে ধমক দিলেন, -আরে গেস্ট ফিরে যাচ্ছে কেন? ৩০৪ নম্বর রুমটা তো খালি আছে, ওটা দিচ্ছেন না কেন?

মালিকের কথায় শিবলী যেন ভরসা পেল। শারমিন নিজেও এখন এদিকে তাকিয়ে আছে।

রফিক ফ্যাকাশে মুখে বলল,
-কিন্তু স্যার, ওই রুমের কাবার্ডটা নষ্ট। লক হয়ে আছে। ওটা পাল্টানো হয়নি। গেস্টদের সমস্যা হতে পারে।

-কোন সমস্যা নেই আমরা অ্যাডজাস্ট করে নিব, সোফায় বসে থাকা শারমিন বলে উঠলো।

-শুনলে তো। রুমটা উনাদেরকে দিয়ে দাও। মাজহারুল সাহেব বলে চলে গেলেন।

রফিক একপ্রকার অনিচ্ছায় যেন রুমটা শিবলী আর শারমিনকে দিল। শিবলী মনে মনে ব্যাটাকে একদম ধুয়ে দিল। নিশ্চয়ই তার নিজস্ব কোন গেস্ট আসার কথা যার কারণে রুমটা সে দিতে চাইছিল না।

লিফট দিয়ে তৃতীয় তলায় ওঠার পর করিডোরটা কেমন যেন অন্ধকার মনে হলো। ৩০৪ নম্বর রুমের তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই শারমিন নাকে আঁচল চাপা দিল।
-শিবলী, কি বিশ্রী একটা গন্ধ, বমি আসছে।

শিবলীও গন্ধটা পেল। এটা সাধারণ কোনো ময়লার গন্ধ না। কেমন যেন একটা মরা-পচা গন্ধ। যেন কোনো মাংস অনেকদিন ধরে আলো-বাতাসহীন জায়গায় পচে গলে একাকার হয়ে গেছে। ইঁদুর টিদুর মরে পড়ে আছে কিনা কে জানে? ওদের ট্রাভেল ব্যাগ টানতে থাকা ছেলেটাও গন্ধ পেল। সে পুরো রুম জুড়ে এয়ার ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিল।

রুমটা বেশ বড়, সাদা চাদরে বিছানাটা যেন ধপধপ করছে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা আছে আর সবচেয়ে ভালো যে বিষয়টা বারান্দায় দাঁড়ালে দূর থেকে সমুদ্র চোখে পড়ে। শিবলী দেখল খুব সুন্দর একটা পেইন্টিং টানানো। সাধারণত এ ধরনের হোটেলে রুমগুলোতে এত সৌখিন কিছু থাকে না। এটা কি শুধু তাদের রুমেই আছে নাকি সব রুমেই আছে তা অবশ্য জানার উপায় নেই।

রুমের একদম কোণে রাখা ছিল সেই বিশাল সেগুন কাঠের কাবার্ড। প্রায় সাত ফুট উঁচু। কাবার্ডের পাল্লায় খোদাই করা চমৎকার নকশা। শিবলী কাবার্ডের হাতল ধরে টান দিয়ে দেখল ওটা সত্যিই লকড হয়ে আছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কাবার্ডের চারপাশ দিয়ে সিলভার রঙের মোটা টেপ দিয়ে মুখগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেই অল্প এয়ার ফ্রেশনারে কাজ হয়নি।

ম্যানেজমেন্টকে খবর দিলে তারা এক গাদা কড়া পারফিউম আর এয়ারফ্রেশনার নিয়ে এল। সারা ঘরে স্প্রে করে দিয়ে সেগুলো সেখানেই রেখে গেল, প্রয়োজনে যদি আবার লাগে।

রাত তখন আড়াইটা। শারমিনের ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। শিবলী পাশেই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সারা ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু হালকা নীলচে একটা ছোট্ট নরম আলো জ্বলছে। শারমিন অনুভব করল ঘরের তাপমাত্রা হুট করে অনেক কমে গেছে, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। অথচ এসির টেম্পারেচার দেখাচ্ছে ২৪°, হঠাৎ সে শুনতে পেল একটা শব্দ। খস... খস... খস...

মনে হচ্ছে কেউ একজন নখ দিয়ে কাঠের ওপর আঁচড় কাটছে। শব্দটা আসছে ওই কাবার্ডের ভেতর থেকে। শারমিন ভয়ে পাথর হয়ে গেল। মনকে বোঝালো হয়তো কোনো বড় ইঁদুর ভেতরে আটকে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে যা দেখল, তাতে তার চিৎকার করার ক্ষমতাও লোপ পেল।

ব্যালকনির স্বচ্ছ কাঁচের দরজার ওপাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। একটা মেয়ে, পরনে নীল সালোয়ার কামিজ। মেয়েটার চুলগুলো কোমড় পর্যন্ত লম্বা, বাতাসে উড়ছে। মেয়েটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে তাই মুখটা দেখা যাচ্ছে না। সে ব্যালকনির গ্রিল ধরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে আর যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সেই কান্না এতটাই করুণ যে শারমিনের বুকটা কেঁপে উঠল।

শারমিন কাঁপা হাতে বিছানার পাশের সব কয়টা সুইচ টিপে দিলো। ঘরটা আলোয় ঝকঝক করে উঠলো। আলো জ্বলতেই মুহূর্তের মধ্যে ব্যালকনি ফাঁকা! কেউ নেই। আলোর কারনে শিবলীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাকে সবটাই বললো শারমিন। সে উঠে ভালো করে বারান্দা থেকে করে আসলো।

- শারমিন, ওখানে কেউ নেই। তুমি ঘুমের ঘোরে ভুল দেখেছো।

- হয়তো, কিন্তু বিশ্বাস করো এতো জীবন্ত ছিল ব্যাপার টা আমতা আমতা করে শারমিন বললো।

-চলো, শুয়ে পড়ি। তুমি ক্লান্ত। তাছাড়া নতুন জায়গা, উৎকট গন্ধ এসব তোমার মনে প্রভাব ফেলেছে।

শারমিন বাধ্য মেয়ের মতো শিবলীকে জড়িয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে গেল।

পরদিন প্রায় সারাদিনই ওরা বাইরে ছিল। সমুদ্র সৈকতের তাজা হাওয়ায় শারমিন গত রাতের কথা প্রায় ভুলেই গেছে। ওরা ফিরলো সন্ধ্যায়।

শিবলী প্রথমে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গেল। শারমিন বিছানায় বসে আজকের তোলা ছবিগুলো ইন্সটাগ্রামে দিচ্ছিল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল কাবার্ডের নিচ থেকে একটা কালচে তরল গড়িয়ে বের হচ্ছে। গন্ধটা এখন এতটাই অসহ্য যে রুমের ভেতরে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়। সে সাহস করে কাবার্ডের সামনে গেল। কাবার্ডের গায়ের সেই টেপগুলো কেমন যেন ঢিলে হয়ে গেছে। একটা ফাঁক দিয়ে শারমিন ভেতরে দেখার চেষ্টা করল।

হঠাৎ ভেতর থেকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা এল। ধাঁপাং!

মনে হলো কেউ কাবার্ডের ভেতরে সজোরে লাথি মারল। শারমিন ছিটকে পেছনে পড়ে গেল। সে পরিষ্কার শুনতে পেল কাবার্ডের ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলছে, "বাঁচাও... আমাকে বের করো....."

শারমিন আর এক মুহূর্তও ওখানে থাকতে চাইল না। সে ওয়াশ রুমের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কাতে লাগলো। তড়িঘড়ি করে শিবলী বের হয়ে এলো। শিবলী কারো কথা তো শুনতে পেল না কিন্তু কালচে তরল টা দেখতে পেয়েছে। সে এটা নিয়ে ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলতে চাইলো কিন্তু শারমিন কিছুই শুনবে না। সে ওই রুমে আর এক সেকেন্ড থাকবে না। সে শিবলীকে বাধ্য করল ঢাকা ফেরার টিকিট কাটতে। রাতে আর ঘুমানো হলো না তাদের। পরদিন সকালে বাস। সারা রাত শিবলী আর শারমিন দুজনে বিছানায় বসে রইল। এবার শিবলীও দেখল, কাবার্ডের ভেতর থেকে একটা সরু আঙুল, যার নখগুলো উপড়ানো, সেটা বের হবার চেষ্টা করছে । কাবার্ডের পাল্লাগুলো থরথর করে কাঁপছিল, যেন ভেতরে কোনো এক উন্মত্ত পশু বন্দি আছে।

ঢাকায় ফেরার পর দুজনেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিছু একটা গন্ডগোল আছে ভেবে দিন দুয়েক পর শিবলী চলে গেল ছোটবেলার বন্ধু কবিরের কাছে। কবির পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চে কাজ করে। শিবলী যখন কক্সবাজারের সেই বাজে অভিজ্ঞতার কথা কবিরকে বলছিল, কবিরের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।

-তোরা কোন হোটেলে ছিলি বলতো? গম্ভীর কন্ঠ কবিরের।

- সি-ভিউ প্যারাডাইস।

-রুম নাম্বার কত? কবিরের প্রশ্নগুলো তীরের মতো ধেয়ে এল।

-৩০৪ কেন রে? কি হয়েছে? শিবলী অবাক।

কবির একটা ফাইল খুলে ধরল। তাতে রাখা ছবিগুলো দেখে তার বমি চলে এল। ছবিতে সেই কাবার্ডটা দেখা যাচ্ছে, যেটা পুলিশ ভেঙে ফেলেছে। আর সেই কাবার্ডের ভেতরে... এক বীভৎস দৃশ্য।

কবির বলতে শুরু করল,
-ঘটনাটা বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। মেয়েটার বাবার বাড়ি ঢাকায়, কলাবাগানে, নাম মায়া। ওর স্বামী রায়হান। মাস ছয়েক আগে বিয়ে হয়েছে। রায়হানের বাবা রফিক ওই হোটেলেই ম্যানেজারের পদে আছে। ছেলেটা নেশাখোর, জুয়ায় আসক্ত। হোটেল মালিকের ছেলে জাবেদের কাছে তার অনেক টাকা ঋণ ছিল। জাবেদের হঠাৎ মায়া কে দেখে পৈশাচিক একটা মনোবাসনা তৈরি হয় সে শর্ত দেয় মায়া যদি তার সাথে রাত কাটায় তবে রায়হানের সব ঋণ সে মাফ করে দেবে। বদমাইশ রায়হান রাজি হয়ে মায়াকে নিয়ে ওই হোটেলে যায়। মায়া কিছু সন্দেহও করেনি তখন।

কবির থামল একটু, তারপর আবার বলতে শুরু করল,
-রুম নাম্বার ৩০৪ এ রায়হান মায়াকে নিয়ে গেল। মায়া যতক্ষণে বুঝতে পারল ততক্ষণে জাবেদ তার ঘরে। চরম অপমান অবজ্ঞা আর যৌ*ন হেনস্থার শিকার হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়া বলে যে, সে পুলিশে খবর দেবে, ওদের দুজনকে জেলের ভাত খাওয়াবে। রাগের মাথায় অথবা হয়তো নিজেদেরকে বাঁচাতেই জাবেদ আর রায়হান মিলে মেয়েটাকে নির্মমভাবে খুন করে। কিন্তু পিক সিজন, হোটেল ভর্তি গেস্ট। লা*শ বের করার কোনো উপায় নেই। তাই তারা মায়ার দেহটাকে দুমড়ে-মুচড়ে ওই কাবার্ডের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। বাবার কাছে রায়হান অবশ্য সবকিছু স্বীকার করে, ছেলেকে বাঁচাতে রফিক সাহেব প্রথমে লাশটার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল কিন্তু বাগড়া দিলি তোরা। অবশ্য এর আগেই কাবার্ড টা সে পুরোপুরি লক করার ব্যবস্থা করে ফেলে। তোরা ওই লা*শের সাথেই দুই রাত কাটিয়েছিস শিবলী। তোদের ওই পচা গন্ধটা ছিল মায়ার লা*শের। আমারই এক ব্যাচমেট, মানে একসাথে আমরা ট্রেনিং করেছিলাম। তার এখন কক্সবাজারে পোস্টিং, তার মাধ্যমে পুরো ঘটনা বিস্তারিত জেনেছি। মেয়েটার জন্য খারাপ লাগছে রে, মেয়েরা কোথায় নিরাপদ? নিজের স্বামীকে বিশ্বাস না করলে আর কাকে বিশ্বাস করবে?

পুলিশ ফাইল আর কবিরের বর্ণনার মাঝে শিবলী যখন মায়ার মৃ*তদেহের ছবিগুলো দেখছিল, তখন তার বুকটা ধক করে উঠল। মায়ার শরীরের সেই বীভৎস জখম ছাপিয়ে গলার সেই ছোট জন্মদাগটা দেখে শিবলী জমে যেন পাথর হয়ে গেল।

কক্সবাজার থেকে ফেরার পর শারমিনের ঘুম যেন উড়ে গেছে। সে তার নিজের ঘরের আলমারি দেখে ভয় পাচ্ছে। প্রতিরাতেই নিশ্চল চোখে আলমারির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে এলোমেলো কথাবার্তা বলে। তার আচরণও ইদানীং বদলে গেছে।

হঠাৎ এক সন্ধ্যায় বেডরুম থেকে শারমিনের তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল। শিবলী দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখল, শারমিন বিছানার ওপর খুব অস্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত দুটো নিজের গলার ওপর বসে গেছে। সে নিজের নখ দিয়ে নিজের গলার চামড়া তুলে ফেলছে। তার মুখ দিয়ে অমানুষিক এক কণ্ঠস্বর বেরোচ্ছে।

-শারমিনের শরীরটা বেশ নরম শিবলী। ওর হাড়গুলো কিন্তু এখনো আস্ত। বলে শারমিন কিংবা শারমিন এর ভেতরে বসবাসকারী কেউ বীভৎসভাবে হাসতে থাকে।

শিবলী দেখল শারমিনের চোখের মণি একদম সাদা হয়ে গেছে। শারমিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এল শিবলীর দিকে। তার হাঁটার ভঙ্গিটা অদ্ভুত, যেন শরীরের হাড়গুলো সব ভেঙে গেছে। মটমট শব্দে সে এগোচ্ছে। শিবলীকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল সে।

-তুমি টাকা চেয়েছিলে না? এই নাও টাকা। শারমিন তার মুখ থেকে পচা রক্ত আর মাংসের দলা উগড়ে দিতে লাগল শিবলীর ওপর।

-কে...কে তুমি! কি চাও আমার কাছে?

-মায়া... মনে পড়ে আমার কথা? আমি মায়া...

আধো আলো আধো অন্ধকারের ভেতর থেকে মায়ার ফ্যাসফ্যাসে গলা ভেসে এল,
-নয়টা মাস তো শারমিনের বাবার টাকায় বেশ রাজকীয় হালেই আছো। ঘর ভর্তি দামী জিনিসপত্র। কিন্তু আমি কি পেলাম, কালো নিকষ অন্ধকার ছাড়া?

শিবলী কাঁপতে কাঁপতে বলল,
-মায়া, আমাকে মাফ করে দাও। আমি বুঝতে পারিনি।

-মাফ! মায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসি দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়তে লাগল। আমাকে যখন ওই কাবার্ডের ভেতরে কোঁচকানো হচ্ছিল, তখন আমার হাড়গুলো মটমট করে ভাঙার শব্দ হচ্ছিল। জানো শিবলী, সেই শব্দটা তোমার বিয়ের সানাইয়ের চেয়েও মিষ্টি ছিল। বীভৎস ভাবে হাসতে থাকে শারমিন, না... না মায়া।

এই মায়াই সেই মায়া, যার সাথে তিন বছর সম্পর্ক রেখে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঝপথে একলা ফেলে এসেছিল।

শারমিনের বাবা বিত্তবান মানুষ। তার একমাত্র মেয়ের জামাই হওয়ার লোভ শিবলী সামলাতে পারেনি। মায়া ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাধারণ একটা মেয়ে। শিবলী যখন শারমিনের সাথে সম্পর্কের কথা জানিয়ে মায়াকে ব্লক করে দেয়, মায়া পাগলপ্রায় হয়ে শিবলীর অফিসে গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছিল তখন শিবলী সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে প্রায় জোর করে অফিস থেকে তাকে বের করে দেয়।

আশেপাশের লোকজন জেনে যাওয়াতে তড়িঘড়ি মায়ার পরিবার তাকে একপ্রকার জোর করেই বিয়ে দেয় সেই নেশাখোর রায়হানের সাথে।তারা হয়তো ভেবেছিল বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসের সাথে কে কবে লড়তে পেরেছে? মায়াকে তার লোভী স্বামী নিয়ে গেল ঠিক সেই হোটেলে, যেখানে তার প্রাক্তন প্রেমিক তার স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুন করতে আসবে। মায়া হয়তো ওই কাবার্ডের ভেতর ধুঁকে ধুঁকে মরার সময় শেষবার শিবলীর নামটাই আওড়েছিল।

পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা শিবলীর অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর থেকে এক বীভৎস গন্ধ পায়। তারা পুলিশ নিয়ে ভেতরে ঢুকে যা দেখল, তা কোনো মানুষের কল্পনার বাইরে।

শিবলীকে পাওয়া গেল বেডরুমের সেই আলমারির ভেতরে। তার বিশাল দেহটাকে অবিশ্বাস্যভাবে ভাঁজ করে ওই ছোট তাকের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার হাড়গুলো সব চূর্ণবিচূর্ণ। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটা লাশ কিভাবে এভাবে প্রায় গলিত স্তুপ হয়ে যেতে পারে সেটা সবার কাছেই অবিশ্বাস্য।

আর শারমিনকে অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় ব্যালকনিতে। সে পাগলের মতো হাসছে আর দেয়ালে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে লিখছে "আমাদের হানিমুন এবার পূর্ণ হলো।"

দ্রুত সমস্ত প্রসিডিউর শেষ করে শারমিনকে এসাইলামে পাঠানো হলো। এবং তার চেয়েও অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই শারমিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে। মায়ার অতৃপ্ত আত্মা হয়তো শারমিন কে কোন শাস্তি দিতে চায়নি কারণ সে পুরোপুরি নির্দোষ, সে কিছুই জানতো না। কিন্তু শিবলীকে সে বাঁচতে দেয়নি। শারমিনকে নিয়ে কিছুটা কানাঘুষো শুরু হলেও সেটা হঠাৎই থেমে যায় কারণ শিবলীর মত একই অবস্থা হয়েছে কক্সবাজারে দুজনের। একজনের নাম রায়হান আর অন্যজন জাবেদ। সারা দেশে ঘটনাগুলো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে কিছুদিন পর তা ধামাচাপা পড়ে যায় অন্য কোন ইস্যুর আড়ালে।

মাঝরাতে হঠাৎ করে রফিক সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়। কে যেন ফিসফিস করে তাকে ডাকছে,
-রফিইইইইক..... রফিইইইইইক.....
 
Back
Top