স্কাই ডাইভার ফেলিক্স বমগার্টনার

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
443
Messages
6,964
Reaction score
4,918
Points
4,013
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
স্কাই ডাইভার ফেলিক্স বমগার্টনার

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






রেডবুলের বিখ্যাত প্যারাজাম্পার ফেলিক্স বমগার্টনার কে চিনেন? গত বৃহস্পতিবার ইতালিতে প্যারাগ্লাইডার দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন। সম্ভবত যান্ত্রিক কোনো সমস্যার কারণে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান। মেডিক্যাল ইমার্জেন্সির কথাও শুনেছি। পরে বিস্তারিত জানা যাবে। এসময় তিনি একটি সুইমিংপুলে আছড়ে পড়েন, সাথেসাথেই তার মৃত্যু হয়। আরেকজন মহিলা আহত হয়।

একটা বিষয় দেখেন, মানুষের মৃত্যু যেভাবে তার ভাগ্যে লিখে রাখা আছে, সেভাবেই হয়। এই ব্যক্তি এর আগে ৩৯ কিলোমিটার (জ্বি, ভুল বলিনি) উপর থেকে জাম্প দিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন। আর মৃত্যু হলো কয়েকশত মিটার উপর থেকে পড়ে গিয়ে। উনাকে নিয়ে ৫ বছর আগে Roar বাংলায় লিখেছিলাম। আজ আবার রিপোস্ট করলাম:

✅কে এই ফেলিক্স বমগার্টনার?
ফেলিক্স বমগার্টনার ২০ এপ্রিল, ১৯৬৯ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুব ডানপিটে স্বভাবের। বড় হয়ে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্যারাট্রুপার হিসেবে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। সেনাবাহিনী ছাড়ার পরও তিনি স্কাইডাইভিংয়ের চর্চা চালিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বিখ্যাত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের ওপর থেকে প্যারাসুট জাম্প করে প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন। এটি ছিল তৎকালীন সবচেয়ে উঁচু ভবন থেকে লাফানোর বিশ্বরেকর্ড।

বিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পাড়ি দেয়ার অনেক রেকর্ডের কথা আপনারা হয়তো শুনেছেন। ফেলিক্স বমগার্টনারই প্রথম ব্যক্তি যিনি এটি পাড়ি দিয়েছেন স্কাইডাইভ দিয়ে! ২০০৩ সালে তিনি বিশেষভাবে নির্মিত কার্বন ফাইবারের ডানা বা উইংস্যুট ব্যবহার করে বাতাসে ভেসে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই ফেলিক্স মনস্থির করেন যে, তিনি এমন উচ্চতা থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেবেন যা এর আগে কেউ দেয়নি। তিনি জোসেফ কিটিংগারের ৩১.৩ কি.মি উপর থেকে লাফ দেয়ার কথা জানতেন। এজন্য রেকর্ড ভাঙতে তিনি পাঁচ বছর ধরে পরিকল্পনা করেন এবং প্রতিনিয়ত একটু একটু করে বেশি উচ্চতা থেকে লাফ দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। তার স্বপ্ন পূরণে পৃষ্ঠপোষকতা করতে এগিয়ে আসে একটি খ্যাতনামা পানীয় তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান।

✅মিশন প্রস্তুতি
ভূপৃষ্ঠের উপরের ১০-৬০ কি.মি. পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থান বায়ুমন্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অঞ্চল। এজন্য এই মিশনের নামকরণ করা হয় ‘রেড বুল স্ট্র্যাটস’। কারণ তার এই মিশনের সব খরচ বহন করে অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘রেড বুল‘। আর এই দুঃসাহসী লাফ দেয়ার জন্য ফেলিক্সকে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন আগের রেকর্ডধারী ব্যক্তি জোসেফ কিটিংগার।

আকাশের এত উপরে বায়ুচাপ খুবই কম। সমুদ্র সমতলে বাতাসের যে স্বাভাবিক চাপ, সেখানে সেই চাপ ২ শতাংশেরও কম। ফলে অবধারিতভাবেই ফেলিক্সের বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া সেখানে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে প্রায় ৯০ ডিগ্রির কাছাকাছি। তাই তার জন্য বানানো হয় বিশেষ স্যুট, যা দেখতে কিছুটা মহাকাশচারীদের স্যুটের মতোই। আরও বানানো হয় বিশালাকৃতির হিলিয়াম বেলুন। হিলিয়াম গ্যাস বায়ুর চেয়ে হালকা বিধায় সহজেই উপরে উঠে যায়- এ ধর্মকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহার করা হয় হিলিয়াম গ্যাস বেলুন। ফেলিক্সের বেলুনের নিচে বসার জায়গাসহ একটি কন্ট্রোল মডিউল ছিল, যা বেলুন কন্ট্রোল করা ছাড়াও অক্সিজেন সাপ্লাই, ভিডিও রেকর্ডিং ও লাইভ স্ট্রিমিং করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

✅চূড়ান্ত মিশন
সেই বছর মার্চ ও জুলাইয়ে দুটো প্রস্তুতিমূলক হাই অ্যালটিটিউড জাম্প দেন বমগার্টনার। প্রথমবার ২১,৮১৮ মিটার ও দ্বিতীয়বার ২৯,৪৬০ মিটার উপর থেকে লাফ দেন। প্যারাসুট জাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে আপনি যতক্ষণ প্যারাসুট না খুলে অভিকর্ষের কারণে নিচে পড়তে থাকবেন, ততক্ষণ সময়কে বলা হয় ফ্রি-ফল টাইম। এসময় পড়ন্ত বস্তুর ন্যায় স্কাইডাইভারের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার বা প্রায় ৩২ ফুট/সেকেন্ড করে বৃদ্ধি পাবে। যত উপরে উঠে লাফ দেয়া যাবে ততই গতি বাড়বে। এছাড়া উপরে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কম বিধায় বাতাসের প্রতিরোধ বলের মানও কম। তাই ফ্রি-ফলের গতি খুবই দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। ফেলিক্সের দ্বিতীয় জাম্পের ফ্রি ফলের সময় সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৬৩ কিলোমিটার!

সাধারণত স্কাইডাইভারদের ফ্রি ফলের গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটারের মতো হয়ে থাকে। সামরিক বাহিনীর প্যারাট্রুপারদের সাথে বাড়তি রসদ থাকায় তাদের গতি ঘণ্টায় ৩৮০-৪৩০ কি.মি পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্যারাসুট খোলার পর গতি কমে যায় এবং এর সাহায্যে গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

✅সেই বিখ্যাত স্যালুট
অবশেষে এলো সেই দিন। ২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর বিশেষভাবে নির্মিত হিলিয়াম বেলুন ও ক্যাপসুলের সাহায্যে আকাশে উড়লেন। ১,২৮,০০০ ফুট উচ্চতায় উঠতে তার প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছিল।যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর রসওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এয়ার সেন্টারের মিশন কন্ট্রোল রুমের সাথে শেষবারের মতো যোগাযোগ করলেন ফেলিক্স। নিজের হেলমেটের রেডিও কানেকশন, অক্সিজেন সাপ্লাই সিস্টেম পরীক্ষা করলেন। ভূমিতে থাকা ফেলিক্সের জাম্প সুপারভাইজার ও মেন্টর জোসেফ কিটিংগারের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো রেডিওতে, “ক্যামেরাগুলো চালু করো। আমাদের গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল তোমাকে রক্ষা করবেন।“

ধীরে ধীরে ক্যাপসুলের সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালেন ফেলিক্স। মাইক্রোফোনে ভেসে এল তার কণ্ঠস্বর,
"জানি পুরো বিশ্বই এখন আমাকে দেখছে। হায়! আমি যা দেখছি, সেটা যদি আপনারাও দেখতে পেতেন! আপনি যে কত ক্ষুদ্র, সেটা উপলব্ধি করার জন্য আপনাকে কখনো কখনো অনেক উঁচুতে উঠে আসা উচিত"

কথাটা বলেই ফেলিক্স বমগার্টনার সামরিক কায়দায় একটা স্যালুট ঠুকে দিলেন লাফ। যেন-তেন লাফ নয় এটি, ফেলিক্সের আগে এমন উচ্চতা থেকে কোনো মানব সন্তান লাফ দেয়নি। ভূপৃষ্ঠের ৩৯ কিলোমিটার উপর থেকে লাফ দিয়েছেন তিনি!

✅অনন্য রেকর্ড
ক্যাপসুল থেকে জাম্প দেয়ার ফেলিক্সের গতি বাড়তে বাড়তে ঘন্টায় ১,৩৫৭.৬৪ কি.মি বা ৮৪৩.৬ মাইল হয়ে যায়। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি কোনোপ্রকার বাহন ছাড়াই শব্দের গতিকে অতিক্রম করেন। হাই স্পিড অবজেক্ট, যেমন: যুদ্ধবিমান, মিসাইলের গতিকে ম্যাক স্কেলে হিসাব করা হয়। কেননা কিলোমিটার/ঘণ্টা স্কেলে হিসাব করাটা কিছুটা অসুবিধাজনক। ম্যাক ১ বলতে শব্দের গতিকে অতিক্রম করাকে বোঝায়। একে সুপারসনিক গতিও বলা হয়। ফ্রি ফলের সময় ফেলিক্স বমগার্টনারের গতি ছিল ম্যাক ১.২৫, অর্থাৎ তিনি বাহন ছাড়াই যুদ্ধবিমানের মতো সুপারসনিক গতি অর্জন করেছিলেন।

✅নিরাপদ ল্যান্ডিং
৩৯ কি.মি উপরে উঠতে তার প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছিল। কিন্তু লাফ দেয়ার ১০ মিনিট পরে তিনি প্যারাসুটের মাধ্যমে নিরাপদে নিউ মেক্সিকোর মরূভূমির বালু স্পর্শ করেন।

আরেকটি রেকর্ডের কথা বলা হয়নি। ফেলিক্স বমগার্টনারের এই বিখ্যাত লাফ সরাসরি ইউটিউবে দেখেছে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। একইসঙ্গে সরাসরি (লাইভ স্ট্রিমিং) কোনো ঘটনা এত মানুষ এর আগে কখনোই ইউটিউবে দেখেনি। নেমে আসার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ফেলিক্স জানান,
"নিম্ন তাপমাত্রায় আমার হেলমেটের সামনের অংশে প্রায় বরফ জমে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে, আমি ডাইভ বাতিল করতে চেয়েছিলাম"

ইতিহাস সাহসী মানুষদের দ্বারাই লেখা হয়ে থাকে। দুঃসাহসী স্কাইডাইভার ফেলিক্স বমগার্টনার ছিলেন তেমনই এক মানুষ।



FB-IMG-1753169173238.jpg


FB-IMG-1753169187841.jpg
 
Back
Top