- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 419
- Messages
- 6,579
- Reaction score
- 4,073
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
সাতকাহন
মূল লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
মূল লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
পর্ব - ১
কাকভোর বলে কিছু নেই এখানে। রাতটাকে একটানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দিন এসেই জাঁকিয়ে বসে। সেই যে সূর্যের উনুন জ্বলল সারা দিন ধরে চরাচর পুড়িয়ে খাক করে দিলেও শান্ত হয় না, দিন নিবে গেলেও তেতে থাকে চারপাশ অনেকক্ষণ। ঘড়িতে যখন প্রায় পাঁচটা, ছায়া সরতে শুরু করেছে পৃথিবীতে, দীপাবলী স্নান সেরে অফিসঘরে চলে এসেছিল। এই একটু সময় প্ৰাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারা যায়। তার আবাস এবং অফিস একই বাড়িতে। পেছনের তিনটে ঘরে সংসার, সামনের তিনটে ঘরে অফিস। ভেতরের উঠোনে একটি গভীর কুয়া আছে। যার জল নামতে নামতে এখন আর চোখে দেখা যায় না। দড়ি নামিয়ে বালতিতে ভরে তুললেও ছেঁকে নিতে হচ্ছে। জষ্ঠি মাসেই যদি এই অবস্থা, আষাঢ়ে কি হবে।
এখন অফিসে কারো আসার কথা নয়। তবে এসে পড়বে। এই সময় অফিস বসে ছটায়, দশটায় যে যার বাড়িতে। আবার সাড়ে তিনটেয় এসে সাড়ে ছটায় ফিরে যাওয়া। ওই সাড়ে তিনটের সময় আসাটায় কষ্টের, শরীর পুড়ে যায়। জানলা খুলে দিয়ে চেয়ারে বসল দীপাবলী। বড়জোর নটা পর্যন্ত এটাকে খুলে রাখা যাবে। ততক্ষণ হাওয়া না আসুক, আকাশ তো দেখা যাবে। চাবি ঘুরিয়ে ড্রয়ার খুলতেই চিঠিটা নজরে এল। গতকালের ডাকে এসেছে। একটা জবাব লেখা দরকার। কাগজ টেনে নিল সে।
অমল। আপনার চিঠি পেয়ে আরাম লাগল। মাসীমার শরীর ঠিক নেই জেনে অবশ্য ভাল লাগেনি। কি করছেন মশাই? ভাল ডাক্তার দেখাচ্ছেন তো? এইটে লিখেই অবশ্য মনে হল আমি অবান্তর ভাবছি। মাসীমার ব্যাপারে আপনি অবহেলা করার মানুষ নন।
আমার কথা আপনি জানতে চেয়েছেন। আমি এখন যেখানে আছি সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সবুজের কোন সম্পর্ক নেই। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানগুলো এখানে বসে স্বপ্ন বলেই মনে হয়। শ্রাবণে পথ ভুলে দুই-তিন টুকরো মেঘ যদি আকাশে আসে তাহলে স্থানীয় মানুষ মুগ্ধ চেখে তাকায় বলে শুনেছি। সারা বছরে সবসমেত চব্বিশ ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে এমন কথা কেউ বলতে পারেননি। মাটি ফেটে চৌচির। হাতে নিলে ঝুরু ঝুরু ধুলো হয়ে ঝরে পড়ে। মাটিকে বেঁধে রাখে যে রস তার অস্তিত্ব নেই এখানে। নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলালাইনটা এইখানে এসে বড় সত্যি বলে বুঝেছি। সবুজ নেই কারণ গাছে পাতা নেই অথচ নিম্পত্র গাছেরা দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রকৃতিতে যেসব মানুষেরা বেঁচে আছে তারা জানে না কেন বেঁচে আছে! মেদ দূরের কথা, মাংস খুঁজে পাওয়া যাবে না কারো শরীরে। আমার কাজ এদের নিয়ে। ঢাল নেই তলোয়ার নেই তবু যুদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে আমার কাজের লোক একটা চমৎকার শিক্ষা দিল। সকালে বেরিয়েছিলাম। ফিরতে দুপুর। রোদে পুড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে অফিসে ফিরে মনে পড়ল আজ সকালে ওকে বাজারের টাকা দিতে ভুলে গিয়েছি। ঘরে এক ফোঁটা তরিতরকারি নেই। খিদে পেয়েছিল খুব এবং সেই সঙ্গে আলস্য। তা থেকেই স্থির করলাম আজ উপোস দেব। বিকেল না হলে দোকানপাট খুলবে না। তখন রাত্রের ব্যবস্থা করা যাবে। ভেতরের ঘরে ঢুকে শুনলাম কাজের মেয়েটি আমাকে খেতে ডাকছে। জানেন, যা আমরা ফেলে দিই, গত দু-তিন দিন তরকারি কুটে ফেলে দেওয়া খোসা বা গোড়া সে সরিয়ে রেখেছিল। তাই দিয়েই বেঁধেছিল। খেতে গিয়ে অমৃত মনে হল। পরে বুঝেছি সে ওই দিয়েই রাতে অভ্যস্ত। আলু যার জোটে না অথচ খোসা পেয়ে যায় চেয়েচিন্তে সে তো খোসার রান্নাতেই সিদ্ধহস্ত হবে। এইটে আমাকে উৎসাহিত করল। আমি ঢাল তলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধ করতে নেমেছি। এদের, এই এলাকার মানুষের জন্যে জল চাই, অমৃত নয়। অমৃতে তৃষ্ণা মেটে না।
চিঠি বড় হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাল আছি। রজনী নিদ্রাহীন (গরমে), দীর্ঘ দগ্ধ দিন, আরাম নাহি যে জানে রে। আপনি যে কি করছেন। এবার ঘরে তাঁকে নিয়ে আসুন। মাসীমার পাশে যিনি সবসময় থাকবেন। একটু আগেভাগে জানালে ছুটি নিয়ে হাজির হবই। শুভেচ্ছা সহ, দীপাবলী।
চিঠিটা ভাঁজ করতে করতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। এখনই রোদে ঝলমল করছে চরাচর। এখানে বসলেই একটা ন্যাড়া গাছ নজরে পড়ে। গাছটার প্রতিটি ডাল বেঁকেচুরে আকাশের দিকে প্রতিবাদের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। সতীশবাবুর মুখে শুনেছে ওই গাছে নাকি প্রথমবার জল পড়লেই পাতা গজায়। অবশ্য বেশী দিন সেই পাতা হাওয়া খাওয়ার সুযোগ পায় না। দীপাবলী অনেক দূরে দৃষ্টি বোলালে। ফাটা মাটি আর শূন্য আকাশে রোদের রঙ পাল্টানো শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশীক্ষণ তাকালে বুকের ভেতরটায় থম ধরে। নিজেকে নীরক্ত মনে হয়। শূন্যতা গলা টিপে ধরে।
ম্যাডাম!
দীপাবলী মুখ ফেরাল। চিঠি খামে ঢুকিয়ে বলল, বলুন সতীশবাবু।
ম্যাডাম, আপনি কি নিশ্চিত যে আজ এস. ডি. ও. সাহেব আসবেন!
নিশ্চয়ই, আমার সঙ্গে কথা হয়েছে ওঁর।
ও। ঘুরে দাঁড়ালেন প্রৌঢ়।
কেন জিজ্ঞাসা করলেন বলুন তো? দীপাবলী জানতে চাইল।
আমি এখানে আট বছর চাকরি করছি। আজ অবধি এস. ডি. ও. সাহেব মাত্র দুবার। এসেছেন। তাও বৃষ্টি পড়লে। চারজন এস. ডি. ও. সাহেব এই সময় বদলি হয়ে গিয়েছেন। তাই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আর হ্যাঁ, স্টাফদের তাহলে দুপুরে থাকতে বলি। উনি এসে না দেখতে পেলে–!
না, না। এখানকার নিয়মমত যেমন সবাই কাজ করেন তেমন করবেন। উনি যদি দুপুরে এসে যান আমিই কথা বলব! দীপাবলী এক মুহূর্ত ভাবল, আপনি শুধু নেখালির ফাইলটা আমাকে দিয়ে যান।
সতীশবাবু মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলে খামে আঠা সেঁটে ঠিকানা লিখল সে। সতীশবাবু ফাইলটা নিয়ে ফিরে এলেন, একটু বসতে পারি?
নিশ্চয়ই। বসুন।
সতীশবাবু বসলেন। রোগা বেঁটে খাটো মানুষ, মাথায় চুল আশিভাগ পেকে গিয়েছে। দুটো হাত কচলালেন, ম্যাডাম, আপনার আগে যাঁদের দেখেছি তারা মানুষ খারাপ ছিলেন না। তবে সবাই পুরুষমানুষ বলে এসেই বদলির চেষ্টা করতেন। এই হতচ্ছাড়া জায়গায় কে থাকতে চায় বলুন। আর যাঁরা বদলির চেষ্টা করেন তাঁদের কাজে মন বসতেই পারে না।
কিন্তু আপনি কাজ করতে চাইছেন। এখানকার মানুষের জন্যে কেউ কাজ করে না।
আমাকে চাকরি দেওয়া হয়েছে কাজ করার জন্যে, নয় কি?
কিন্তু আপনি কোন কাজ করতে পারবেন না, এইটে আমার অভিজ্ঞতা।
সতীশবাবু, চেষ্টা করতে দোষ কি?
এখানকার সাধারণ মানুষগুলোকে দেখেছেন? বুক পিঠ আলাদা চেনা যায় না। কারো পেটে ভাত দুরের কথা সেদ্ধ পর্যন্ত রোজ পড়ে না। অথচ কোন প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই, কেড়ে খাওয়ার সাহস নেই। এদের কোন উপকার করবেন আপনি?
দীপাবলী অবাক হয়ে ঢাকাল, সতীশবাবু, আপনি কি কমিউনিস্ট?
চমকে উঠলেন প্রৌঢ়, না, না। আমি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই।
সমর্থক নন কথাটা সত্যি নয়।
কেন?
আপনি তো ভোট দেন। ব্যালট পেপারে ছাপ দেওয়ার সময় সমর্থন জানানো হয়ে যায়।
মাথা নাড়লেন সতীশবাবু, আমি ভোট দিই না ম্যাডাম।
সে কি? কেন? আপনি সরকারি কর্মচারী, স্বাধীন ভারতের নাগরিক।
জানি, ভোট দেওয়া আমার উচিত, কিন্তু কাকে ভোট দেব বুঝতে পারি না। যে জিনিসটা নিজে বুঝতে পারি না সেইটে কখনও করি না। ব্রিটিশ আমলের অভ্যেস।
কোন আমল ভাল সতীশবাবু?
শুনতে খারাপ লাগবে, কাজের কথা যদি বলেন ব্রিটিশ আমলে ভাল কাজ হত।
ফাইলটা তুলে নিল দীপাবলী, আচ্ছা, এই নেখালির মানে কি? শব্দটা শুনলে মনে হয় খালি নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অথচ ওই জায়গা থেকে নেওয়ার কিছু নেই।
না ম্যাডাম। লোকে বলে বটে নেখালি, আসলে জায়গাটার নাম নেইখালি। নেই, খালি হয়ে গেছে। বলার সময় উচ্চারণের দোষে অমন শোনায়।
তাই বলুন।
সতীশবাবু উঠে গেলেন। ফাইলে চোখ রাখল দীপাবলী। মোট বাহান্ন ঘর পরিবার আছে নেখালিতে। এরা বেশীর ভাগ জনমজুরি করে। পাঁচ মাইল দূরে অর্জুন নায়েকের জমি চাষ করতে যায় কেউ কেউ। সরকারি প্রকল্পে শ্রম দিয়ে টাকা পায় অনেকেই। কিন্তু সেই টাকার পরিমাণ এত কম এবং ধার শোধ করতে যা বেরিয়ে যায় তারপর দিনের অন্ন জোটানোই দায় হয়ে ওঠে।
নেখালি গ্রামে সতীশবাবুকে নিয়ে সে যখন প্রথম যায় তখন বিকেল। রোদ মরেছে, ছায়া ঘন হয়নি। সে এসেছে জানতে পেরেই পিলপিল করে কঙ্কালসার মানুষগুলো বেরিয়ে এসেছিল কুঁড়েঘরগুলো থেকে। হাঁউমাউ করে চিৎকার কান্নায় মিশিয়ে যা বলতে চেয়েছিল তা প্রথম বোধগম্য হয়নি দীপাবলীর। সে আতঙ্কিত হয়েছিল। এমন মানুষ একসঙ্গে দেখা আতঙ্ক। সতীশবাবু ধমকে রাগারাগি করে ওদের দূরে সরিয়ে রাখছিলেন। একটু একটু করে অভিযোগ বুঝতে পেরেছিল সে। এদের পেটে খাবার নেই, জল নেই, তিন ক্রোশ দূরে যে কুয়ো আছে জল তার তলায় চলে যাওয়ায় কাল এই গ্রামে কারো তৃষ্ণা মেটেনি। দুজন বুড়ো আর বাচ্চা গত সাত দিনে মরে গিয়েছে। ভগবান দেবীকে পাঠিয়েছে তাদের কাছে। এখন দেবী যদি তাদের না বাঁচায় তাহলে আর কোন পথ নেই।
মন্বন্তর দ্যাখেনি দীপাবলী, উপন্যাসে পড়েছে। আজ শিউরে ওঠার পর সে থমকে গেল। অভাবী মানুষেরা শ্রোতা পেলে শুধু নালিশের পর নালিশ জানিয়ে যায়। অর্জুন নায়েক তাদের যে পয়সায় কাজ করতে ডাকে দেবার সময় তার অর্ধেক দেয়। জিজ্ঞাসা করলে বলে ওই পয়সা জমিয়ে গ্রামে কুয়ো করে দেব। গ্রামের দুটি ছেলে এখন চুরি করতে শুরু করেছে। বয়স্করা তাদের নিষেধ করেছিল কিন্তু তারা বিদ্রোহী হয়েছে। চুপচাপ সমস্ত কথা শুনে গেল দীপাবলী। সে আবিষ্কার করল একটি শব্দ উচ্চারণ করলে তা কাঁপা শোনাবে নিজের কাছেই। সমস্ত গ্রাম ঘুরে সে হতশ্ৰী আর হতাশা প্রত্যক্ষ করল। এই মানুষগুলো কেন এখানে পড়ে আছে তাই তার মাথায় ঢুকছিল না। স্বাধীন ভারতবর্ষের একটি গ্রামের এমন বীভৎস চেহারা কজন শহুরে মানুষ জানে সন্দেহ আছে। মন্ত্রীরা যে জানেন না এটা সত্যি।
সতীশবাবু ওদের বোঝাচ্ছিলেন। আজ পর্যন্ত কোন অফিসার এই গ্রামে পা দেয়নি। এবার যখন একজন দিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই একটা কিছু ব্যবস্থা হবেই। দীপা সতীশবাবুকে বলল, জনা চারেক মানুষকে বলুন আমার বাড়ির কুয়ো থেকে জল নিয়ে আসতে। তিরি বলে ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাদে কুয়োতে জল জমে।
সতীশবাবু গলা নামালেন, এমন কাণ্ড করবেন না ম্যাডাম।
কেন? ছাগলকে বেড়ার ফাঁক দেখালে কি আর বাগান বাঁচাতে পারবেন?
তা হোক, আজ তো প্রত্যেকে একটু জল খেয়ে বাঁচুক।
অগত্যা সতীশবাবু ওদের প্রস্তাবটা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে ছুটে যেতে চায় জল আনতে। সতীশবাবু বাধা দিয়ে জানিয়ে দিলেন চারজনের বেশী ওখানে গেলে ম্যাডাম রাগ করবেন। আর তিনি রেগে গেলে যে সমস্ত উপকার করবেন বলে ভাবছেন তা আর করবেন না। দীপাবলী দেখল, এতে কাজ হল।
নির্বাচিত চারজন রওনা হল পাত্র নিয়ে জল আনতে।