- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 411
- Messages
- 5,981
- Reaction score
- 2,694
- Points
- 3,913
- Age
- 40
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
সাতকাহন
(১ম খন্ড)
মূল লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
(১ম খন্ড)
মূল লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
পর্ব - ১
আজ সারাটা দিন সূর্যদেব উঠলেন না। কাঠ-কয়লার মত মেঘ ভুটান পাহাড় থেকে নেমে সারা আকাশ জুড়ে অনড় হয়ে রয়েছে সেই শেষরাত থেকে। সারাটা দিন কেটে গেল গভীর আলস্য নিয়ে। শেষ বিকেলে বাতাস রইল; কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে এমন আমেজ ছিল সেই বাতাসে। একটু শীতেল হয়ে উঠল। চারপাশ।
চকোলেট মিলিয়ে যাওয়ার পরও জিভে যেমন তুলতুলে অনুভূতি ছড়ানো থাকে তেমনি এক আলো এখন মাঠের ওপরে, দেওদার গাছের মাথায়, কোয়াটার্সগুলোর টিনের চালের চুড়োয় চুড়োয় নেতিয়ে রযেছে। মুখ তুলে আকাশ দেখলে মনে হয় মেঘেরা বুঝি হওয়ার ধকল সইতে না পেরে এক ছুটে নেমে এল; কিন্তু আজ বৃষ্টি হবে না। মেঘগুলো এই হঠাৎ নামা শীতের দাঁত সইতে না পেরে কুঁকড়ে যাবে। এইভাবেই দু-তিনদিন সইবার পর জল ঝরবে। চা-বাগানের ওপর, কোয়াটার্স, মাঠ, আসাম রোড ভিজবে তেমাথা বুড়ির মত অসাড়ে। এবং সেই পর্ব শেষ হলেই শীত নামবে জাঁকিয়ে। আজকের মেঘ যেন বুধুয়ার তরকারি কোটা, রান্নাঘরে মায়ের উনুনে কড়াই চাপানোর অনেক দেরি। মাঠের মাঝখানে চাঁপা ফুলের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিরসিরে হাওয়ায় একটু কেঁপে উঠে দীপা চিৎকার করল, তাড়াতাড়ি কর, আমার শীত করছে।
ওপর থেকে কোন উত্তর এল না। যে উঠেছিল ডালে ডালে পা দিয়ে হাওয়া তার পাঁজরে কাঁপন তুলেছিল। কিন্তু মরিয়া হয়ে সে হাত বাড়াচ্ছিল। সদ্যাফোটা সোনালী চাঁপার দিকে। এবছর ওই গাছে প্রথম কুঁড়ি ফুটেছে। লক্ষ্য করেছিল সে, আর তারপরই এই জেদ। অথচ ফুলটা কেবলই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পায়ের চাপে ডালটা দুলছে। আর সেই সঙ্গে ফুলটাও। দীপা যখন দ্বিতীয়বার চিৎকার করল তখন তার মনোযোগ নষ্ট হল। চোখ তুলে আকাশ দেখে ভয় ঢুকল মনে। শাঁখ বাজছে কোয়াটার্সে কোয়াটার্সে। সে আবার মরীয়া হল। এবং এইবার পাতাশুন্ধু ফুল চলে এল হাতে। তর তর করে দুটো ডাল নেমে এসে নিচে তাকিয়ে দেখল দীপা নেই।
মাঠটা একনিঃশ্বাসে দৌড়ে আসতেই শীত উধাও, ঘন ঘন নিঃশ্বাসে শরীর গরম। দীপা দাঁড়িয়ে গেল। এখন সামনের গেট দিয়ে ঢোকা মানে একশটা বকুনির সামনে দাঁড়ানো। ঠাকুমা যতটা না মা তার তিনগুণ। সে পায়ে পায়ে পিছিয়ে এল। দুটো কোয়াটার্সের মাঝখানের সরু গলি দিয়ে চলে যাওয়া যায় পেছনে। যদিও ও-পাশটায় অযত্নে বেড়ে ওঠা জঙ্গল সাধারণ বিকেলেই গা ছমছমে হয়ে থাকে এবং আজ মেঘ আছে বলে আরও মারাত্মক তবু পেছনের বাগানের গেট খুলে ভেতরে ঢুকে একেবারে উঠোনে চলে গেলে অনেকের দৃষ্টি এড়ানো যাবে। দীপা দ্রুত পা চালাল। গলিটা পেরিয়ে কলাগাছের বনের মধ্যে ঢুকে যাওয়ামাত্র দ্বিতীয় চিন্তায় সে থেমে গেল। এখনও শীত পড়েনি। অতএর সাপেরা, রাত্রির বেলায় সাপ বলতে নেই, ঠাকুমা বলেন অন্ধকারে পথ চলতে গেলে তালি দিতে হয় এবং সেইসঙ্গে আস্তিক আস্তিক বললে তেনার সরে যান, দীপা সেইভাবে এগোতে লাগল। মাঠের ভেতর তবু কিছু দেখা যাচ্ছিল কিন্তু এখানে ঘাসগুলোও নজরে আসছে না। বাড়ির পেছনের পায়ে হাঁটা পথটায় এসে দীপা বাতাবি লেবুর ফুলের গন্ধ পেল। এদিকটায় খোকনদের বাড়ির কোণে তিন তিনটে বাতাবির গাছ আছে। পূর্ণিমার রাত্রে, সেই ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে, খোকনের ঠাকুমা আকাশ থেকে নেমে আসেন বাতবি লেবুর রস খেতে। যখন বেঁচে ছিলেন তখন তিনি কিছুতেই ডিসেম্বরের পূর্ণিমার আগে বাতাবি খেতেন না। তাঁর ধারণা ছিল কালীপুজো পেরিয়ে যাওয়াব অনেক পরে বাতাবির বুকের রস, ঘন হয়। মারা যাওয়ার পর এক ডিসেম্বরের পূৰ্ণিমায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কোয়াটার্সের জানলা দিয়ে চাঁদ দেখতে গিয়ে খোকনের মা নাকি দেখেছিলেন তাঁর শাশুড়ি বাতাবিগাছের ডালে বসে রস চুষে খাচ্ছেন। তারপর থেকে ওই দুই পূর্ণিমার পরের সকালে গাছের নিচে পড়ে থাকা বাতাবিগুলো তুলে নদীতে ফেলে দিয়ে আসা হয়। গন্ধ নাকের মধ্যে দিয়ে শরীরের ভেতরে যেতেই পড়ি কি মারি করে ছুট দিল দীপা। খোকনের ঠাকুমাকে সে দেখেছে এই এ্যাট্টুকিনি বয়সে। ফোকলা দাঁতে হেসে বলতেন, হ্যারে বেটি, তোর বরের সঙ্গে আমার বে। দিবি? শুধু এইটুকুনি মনে আছে কিন্তু তাতেই গায়ে কাঁটা উঠে এখন একাকার। টিনের দরজাটা একটা তারের হুকে আটকানো থাকে। হাতড়ে হাওড়ে সেটাকে খুলে তবে স্বস্তি। লক্ষ্মী ডাকছে গোয়ালঘরে। ঠাকুমা বলেন গরুটা কুকুরের কাজ করে। বাগানে কারো পায়ের আওয়াজ পেলেই হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে দেয়। ওই ডাক কানে যাওয়ামাত্র দীপার মনে হল সে নিজের জায়গায় এসে গিয়েছে, আর কোন ভয় নেই। টিনের দরজাটা তারের জালের দেওয়াল কেটে বানানো। সেটাকে বন্ধ করতে গিয়ে দীপা পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকাল। ঝোপঝাড়ের পরই ছোট্ট নদীটা। এখনও জল আছে হাঁটু পর্যন্ত। চৈত্রমাসে পায়ের পাতায় নেমে যায়। বর্ষায় এক বুক। চওড়ায় আসাম রোডটার মতন। কিন্তু এখন তার বুকে কুন্দ ফুলের মত জোনাকি ফুটে রয়েছে। রাত যত বাড়বে সমস্ত চরাচরে তখন জোনাকিরা কুরুক্ষেত্র শুরু করে দেবে। কী মজা লাগে তখন চেয়ে দেখতে। দীপার হঠাৎ মনে হল একমাত্র মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে আর কারও বোধ হয় শীত করে না।
রান্নাঘরের পাশ দিয়ে উঠোনে ঢুকতেই সে হ্যারিকেনের আলো দেখতে পেল। সর্বনাশ! হ্যারিকেন জ্বালা হয়ে যাওয়া মানে মায়ের হাত এখন খালি। নিশ্চযই ইতিমধ্যে দীপার খোঁজ পড়েছে কয়েকবার। বিশুর ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল তার। লক্ষবার বলেছে আজ চাঁপা ফুল তোলার দরকার নেই। তবু কথা শুনল না। কেউ ফুলের জন্যে গাছে উঠলে শেষপর্যন্ত না দেখে তাকে গাছের ডালে ফেলে রেখে চলে আসা যায়? গাছের ডালের কথা মাথায় আসতে দীপা ফিক করে হেসে ফেলল। খোকনের কাকা এক বিকেলে কুল পাড়তে গাছে উঠেছিলেন নদীর ধারে। কেউ নাকি বলেছিল ওই গাছের নিচের ডালের কুলগুলো যত টক ওপরের ডালে তত মিষ্টি। ওঠার সময় বুঝতে পারেননি। প্রায় মগ ডালে ওঠার পর মিষ্টি কুল খেয়ে সময়টা ভুলে গিয়েছিলেন। খেয়াল হল যখন তখন এই আজকের মত আঁধার নেমেছে। তড়মড়িয়ে নামতে গিয়ে ঠিক নিচের ডালটা গেল ভেঙ্গে। ওপরের ডালটা ধরা ছিল বলে রক্ষা। তখন আর নামার উপায় নেই। সেই ডালেই কোনমতে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করলেন। রাতটা ছিল অমাবস্যার। নদীর ধারে বড় বড় গাছের জঙ্গল ভেদ করে কেউ অকাজেও যায় না সন্ধে নামলে। খোকনের কাকার চিৎকার শুনতে পাবে কেন কেউ? ডেকে ডেকে গলা ধরে গেল। খিদে পেল এবং তারপরেই তাঁর মনে পড়ল গাছটা কুলে। আশশ্যাওড়া আর কুলগাছে পৃথিবীর যত শাঁকচুন্নীরা গল্পে করতে খুব ভালবাসে। বট অশ্বখ হলে তবু ব্ৰহ্মদৈত্যির দর্শন পাওয়া যেত। তেনারা ভালমানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন না। কিন্তু শাঁকচুন্নিরা হল খুব খারাপ শ্রেণীর পেত্নী। তারা নাকি আইবুড়ো ছেলে দেখলেই আনন্দে ডিগবাজি খায়। আইবুড়ো ছেলের ঘিলু খেলে শাঁকচুন্নীদের আয়ু বেড়ে যায়। খোকনের কাকা যেই সেটা মনে করলেন তখনই রাম নাম করতে লাগলেন। ওই নদীটি যে পাশে সেই খেয়াল নেই তখন। নদী তো মেছোপেত্নীদের প্রিয় জায়গা। সেটা মনে পড়তেই তার চিৎকার বেড়ে গেল। ভাগ্য ভাল ওপরের লাইনের একটা মাতাল কুলি সেই চিৎকার শুনতে পেয়ে নদীর ওপারে এসেছিল পেত্নী পড়েছে মনে করে। তার চেচামেচিতে সবাই খোকনের ছোটকাকাকে নামিয়ে আনে। পরে নাকি তিনি খুব আফসোস করেছিলেন, যদি মাতালটা না আসতো তবে সেইরাত্রে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হত। এই বছর খানেক হল খোকনের ছোটকাকা জলপাইগুড়িতে চাকরি করতে গিয়ে বিয়ে করেছেন। ফর্সা লম্বা সুন্দর চেহারা। বিয়ের পর এখানে যখন বউ নিয়ে এলেন তখন ঠাকুমাকে বলতে শুনেছিল, কপালে যা লেখা আছে তা খণ্ডাবে কে বউমা! কুলগাছের শাঁকচুন্নীর হাত থেকে না হয় মাতাল বাঁচিয়েছিল। কিন্তু শহরের শাঁকচুন্নী তো ঠিক ঘিলু চুষে নেবে। ছেলেটার হাড়ে দুৰ্ব্বেবাঘাস গজিয়ে ছাড়বে, দেখো। পরদিন দীপা সটান খোকনদের বাড়িতে গিয়ে ওর নতুন কাকিমাকে ভাল করে দেখেছিল। গায়ের বঙ কালো, মাথায় ঘোমটা নেই, বড় রোগা আর জোরে জোরে কথা বলেন। কিন্তু শাঁকচুন্নী বলে মনে হয়নি। ওর কেবলই মনে হয়েছিল সবাই যখন জানেই তখন মাথার ঘিলু ঠিক বাখার জন্যে খোকনের কাকুকে সাবধান করে দিচ্ছে না কেন?
চট করে বাথরুমে ঢুকে গেল দীপা। অন্ধকারেই চৌবাচ্চার জলে হাত দিতেই মনে হল সেখানেও ঠাণ্ডা সেদিয়েছে। শিউলি ফুল ঘাসের ওপর পড়া মানেই শিশির জমা। কিন্তু ওই বৃষ্টিটা না নামা পর্যন্ত সোয়েটার পরতে হয় না। তাহলে জল এত ঠাণ্ডা হল কেন? কিছুদিন হল একটা কথা ওর কেবলই মনে হচ্ছে, আকাশ, মাটি, গাছপালা, চা-বাগান, নদী এমন কি? পাখিদের মধ্যে কিরকম গোপন যোগাযোগ রযেছে যা কেবল তারাই বুঝতে পারে। বাড়ির। পোষা কুকুব বেড়াল গরুদেব সঙ্গে ততটা যোগাযোগ নেই, বেডালের সঙ্গে তো একদম না। এইসময় একই সঙ্গে ধারাপাত আর বর্ণপরিচয় পড়া আরম্ভ হল। দুজন দুগলায় সুর করে করে। আজ আর নিস্তার নেই। ওই মেঘটাও গোলমাল করে দিল। এমন ভাবে আকাশটাকে ঢেকে ঢুকে রেখেছিল যে আলো নেবার সময়টাকে ধরতে পারেনি। অথচ মায়ের কড়া হুকুম শাঁখ বাজার আগেই ঢুকতে হবে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দার তারে ঝোলানো গামছা টেনে পা মুছতে গিযে জবাকুসুমের গন্ধ পেয়ে আবার শক্ত হল দীপা। মাযেব গামছা টেনে নিয়েছে সে। মা কাউকে নিজের গামছা ব্যবহার করতে দেয় না। চটজলদি পা না মুছেই সেটাকে তবে টানটান করে মেলে দিল সে। তারপর লম্বা ঘরটায় উঁকি মারল। ঠাকুমা নেই, মাকেও দেখা যাচ্ছে না। কোণার দিকে মাদুর পেতে দুই ভাই পড়তে বসেছে। ওকে দেখামাত্র একজন একগাল হাসল, আই দিদি, বিশুদা তোকে ডাকছিল! দীপা ঠোঁট কামড়াল। বিশু কেন এল? ও বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসেছে বটে। কিন্তু এমন কিছু দেরি করেনি। আর একমধ্যেই বিশু এসে গেল? দ্বিতীয়জন আরও কচি গলায় বলল, তোর চাঁপা ফুল দিয়ে গিযেছে।
প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল দীপার। সে চাপা গলায় বলল, চুপ কর! মনে মনে ঠিক করল
কাল বিশুর সঙ্গে মোটেই কথা বলবে না। কিন্তু ফুলটা কার হাতে দিয়েছিল?
পাশের ঘরে ঢুকতেই সে থতিমত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মা ঠাকুরঘরের দরজা ভেজিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ওকে দেখতে পেয়েছে, কোথায় ছিলি?
মাঠে। দীপার গলার স্বর কেঁপে উঠল।
তা মাঠেই থাকলে পারতে। এত্ত করে বলেছি শাঁখ বাজার আগেই বাড়ি ফিরবি, কথা কানে যায় না, না? বলতে বলতে কয়েক পা এগিয়ে এসে বা হাতে খপ করে চুলের মুঠি ধরে টান দিল অঞ্জলি। আর মাথাটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই তার ডান হাত এসে পড়ল মেয়ের গালে, ধিঙ্গি মেয়ে কোন কথা কানে যায় না? ফুল তোলানো হচ্ছে? মেরে তোমার বিষদাঁত ভেঙ্গে দেব আজ। বল, কেন শুনিসনি কথা?
দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটাকে সামলালো দীপা। অভিজ্ঞতায় জানে এইসময় কোন প্রতিবাদ করা মানে প্রহার আরও বেড়ে যাবে। বেশ কয়েকবার মারার পর অঞ্জলি ওকে ঠেলে সরিয়ে দিল, আজ রাত্রে তোমার খাবার জুটবে না। এই তোমার শাস্তি।
এইসময় ঠাকুমার গলা বাজল দরজায়, কানে মেরো না। মারতে হলে পিঠে মারবে।
আমি অত হিসেব করে মারতে পারব না। কানে লেগে কালা হয়ে যায় যদি যাক। এত বড় বেয়াড়া মেয়ে আমার কোন কথা শুনবে না! শরীর বড় হচ্ছে অথচ দেখুন বুদ্ধি যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে। অঞ্জলি আবার মেয়ের হাত ধরে টান দিল, আয় তুই আলোর কাছে। প্ৰায় হিড়ি হিড়ি করে হ্যারিকেনের কাছে নিয়ে যেতে যেতে বলল, পৃথিবী তো উদ্ধার করে এলে, পা ধুয়েছ?
ততক্ষণে এক পড়ুয়া বলে উঠল, মা, দিদির পায়ে জল।
অঞ্জলির চোখ বাঁদিকে পড়ামাত্র চিৎকারটা জোরালো হল, দেখুন মা, আপনার নাতনির কাণ্ড, হয়েছেন এমন করে যে হাঁটু পর্যন্ত ধূলায় সাদা হয়ে আছে, মোছার সময় পর্যন্ত পায়নি।
মনোরমা গম্ভীর গলায় বললেন, দীপু, যাও, ভাল করে হাত পা ধুয়ে এস। মায়ের হাতের বাঁধন আলগা হওয়ামাত্র দীপা আবার বাথরুমে চলে এল। জোরে জোরে মগের শব্দ তুলে জল তুলে পায়ে ঢালতে ঢালতে সে অমরনাথের গলা শুনতে পেল, আজি রাত্রে খুব ঢালবে মনে হচ্ছে! আরে, কি হয়েছে তোমাদের?
অঞ্জলির গলা কানে এল, অনেকের তো দশ এগার বছরে মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়, তুমি তোমার পেয়ারের মেয়ের ওরকম একটা ব্যবস্থা কর। এরপর বারান্দা দিয়ে একজোড়া পা দুপদাপ শব্দ করতে করতে উঠোনে নেমে গেল। আর কথাগুলো কানে যাওয়ামাত্র দীপার বুক মুচড়ে একটা কান্না ছিটকে এল গলায়, সেইসঙ্গে চোখ ছাপিয়ে জল। সে কোনমতে কান্নাটাকে গিলতে চাইল। অমরনাথের গলা কানে এল, কি ব্যাপার?
তোর মেয়েকে এবার শাসন কর অমর। বয়স হচ্ছে, এখন ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো ঠিক নয়। সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফেরেনি বলে বউমা রাগ করে ঠিকই করেছে।
ছেলেদের সঙ্গে মানে? ওর বন্ধু তো খোকন, বিশু, ওরাই।
হা, ওরা তো ছেলেই।
কি যে বল মা, তোমাদের মাথার ঠিক নেই। মারধর হয়েছে?
মনোরমা জবাব দিলেন না। দীপার হাত আর চলছিল না। অন্ধকার বাথরুমে যদি অনন্তকাল থাকা যেত তাহলে যেন সে বেঁচে যেত। কিন্তু এসবের মধ্যেই হ্যারিকেনের আলোটা এগিয়ে এল। অমরনাথ সেটিকে নিচে নামিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কি করছিস ওখানে? আয়, বেরিয়ে আয়। দীপার চিবুক এবার বুকে মিশল। এবং কান্নাটা ছিটকে বের হবার পথ পেয়ে গেল। সেই শব্দ উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছাতেই অঞ্জলি উঁচু গলায় বলে উঠল, নাও, আরম্ভ হল, বাপকে দেখে মেয়ে এবার গলে গেলেন।
অমরনাথ সেদিকে কান না দিয়ে ডাকলেন, তোকে বেরিয়ে আসতে বলছি।
প্রচুর জড়তা পায়ে নিয়ে দীপা বাইরে বেরিয়ে এসে বারান্দায় উঠে এল। অমরনাথ মেয়ের দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, মুখ তোল।
পেছন থেকে মনোরমা নিচু গলায় বললেন, থাক, অনেক হয়েছে। আর কিছু বলিস না।
আমি মুখ তুলতে বলেছি। অমরনাথের গলার স্বর বেশ কড়া।
দীপা মুখ তুলল চোখ বুজে। দুই গাল ইতিমধ্যেই চোখের জলে ভেজা, আর একপ্রস্থ জল উপচে নামল। অমরনাথ দুহাতে মেয়েকে বুকে টেনে নিতেই কান্নাটা বাঁধন-ছেঁড়া হল। বাবার বুকে মুখ চেপে পিঠটা বারংবার ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ ওরা এইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। কান্না যখন প্রায় থামো থামো তখন রান্নাঘর থেকে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, মা, ওকে হাতমুখ ধুয়ে নিতে বলুন, চা হয়ে গিয়েছে।
অমরনাথ বললেন, কিছু খেয়ে নিয়ে পড়তে বস মা। দীপার ফোঁপানি তখন স্থির। পেছন থেকে ঠাকুমা বললেন, ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরলেই তো হয়। বড় হচ্ছে, তবু মাথায় বুদ্ধি হচ্ছে না কেন? তুই বিশুর কাছে চাঁপা ফুল চেয়েছিলি?
দীপা কথা বলতে গিযে দেখল গলা শুকনো। সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল।
অমরনাথ হাসলেন, চাঁপা ফুল তোর ভাল লাগে?
মেয়ে দুবার মাথা ওপর নিচ করল। ঠাকুমা বললেন, ছেলেদের কাছে কক্ষনো ফুলটুল চাইবি না।
অমরনাথ মেয়েকে ছেড়ে নিজের গামছা বারান্দার তার থেকে টেনে নিলেন, তাহলে তো ও চাঁপা ফুল পাবেই না। তোমার নাতনি গাছে উঠতে চাইলে দুটো পা-ই ভাঙ্গবে।
রান্নাঘর থেকে গলা ভেসে এল, নবাবনন্দিনীকে একটু এখানে আসতে বলুন মা।
ঠাকুমা কিছু না বলে। ঘরেব ভেতর চলে গেলেন। অমরনাথ ততক্ষণে বাথরুমে। দীপা দুহাতে চোখ মুছল। জোনাকিগুলো উঠোনেও ঢুকতে আরম্ভ করেছে। পা যেন চলতেই চাইছে না। এমনভাবে সে রান্নাঘরেব দরজায গিয়ে দাঁড়াল! একটা ট্রেতে চায়ের কাপ ডিশ আব্ব বিস্কুট রেখে গালে হাত দিয়ে বসেছিল অঞ্জলি। হ্যারিকেন জ্বলছে। কিন্তু পাশের; কাঠেব উনুনের লকলকে শিখায় তাকে অন্যরকম লাগল এখন। দীপার মনে হল মায়ের মুখটা মুখেব ভেতব জিভ ঢুকিয়ে রাখলে মা কালীকে যেমন দেখাবে ঠিক সেইরকম দেখাচ্ছে। অঞ্জলি ট্রেটা তুলে ধরে বলল, দয়া করে বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখ। এক ফোঁটা চা যেন চলকে ডিশে না পড়ে। মানুষকে চা দেবার সময় ডিশ শুকনো রাখতে হয়।
দীপা হাত বাড়িয়ে দেখল সে-দুটো কাঁপছে। অঞ্জলি ট্রে নামিয়ে চোখে চোখ রাখতে চাইলেই মেয়ে চোখ নামাল। অঞ্জলি বলল, থাক। এখানে বস। আমি না আসা পর্যন্ত উঠবে না।
পড়ব। গলা থেকে অনেক কষ্টে স্বরটা বের হল।
পড়ে তো আমাকে উদ্ধার করে দিয়েছ। আমি না ফেরা পর্যন্ত বসে থাকবি এখানে।