- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 443
- Messages
- 6,933
- Reaction score
- 4,861
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
শঙ্খনীল কারাগার
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
পর্ব - ১
সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোট গল্প ইন্দুরা পড়ার পরই নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার ও মনসুবিজন নামে তিনটি আলাদা গল্প প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি। নিজের উপর বিশ্বাসের অভাবের জন্যেই লেখাগুলি দীর্ঘদিন আড়ালে পড়ে থাকে। যাই হোক, জনাব আহমদ ছফা ও বন্ধু রফিক কায়সারের আগ্রহে নন্দিত নরকে প্রকাশিত হয় মাস ছয়েক আগে। এবারে প্রকাশিত হল শঙ্খনীল কারাগার।
নন্দিত নরকের সঙ্গে এই গল্পের কোনো মিল নেই। দুটি গল্পই উত্তম পুরুষে বলা এবং নিম মধ্যবিত্তের গল্প এই মিলটুকু ছাড়া। নাম ধাম দুটি বইতেই প্রায় একই রেখেছি। প্রথমত নতুন নাম খুঁজে পাই নি বলে, দ্বিতীয়ত এই নামগুলির প্রতি আমি ভয়ানক দুর্বল বলে। কার্যকরণ ছাড়াই যেমন কারো কারো কিছু কিছু দুর্বলতা থাকে, এও সেরকম।
আন্তরিক চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু ছাপোর ভুল রয়ে গেছে। ভুলগুলি অন্যমনস্ক পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে এইটুকুই যা ক্ষীণ আশা।
হুমায়ূন আহমেদ
পর্ব :১
বাস থেকে নেমে হকচকিয়ে গেলাম। বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সব। রাস্তায় পানির ধারাস্রোত। লোকজন চলাচল করছে না, লাইটপোস্টের বাতি নিভে আছে। অথচ দশ মিনিট আগেও যেখানে ছিলাম, সেখানে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। শুকনো খটখট করছে চারদিক। কেমন অবাক লাগে ভাবতে, বৃষ্টি এসেছে, রূপ রূপ করে একটা ছোট্ট জায়গা ভিজিয়ে চলে গেছে। আর এতেই আশৈশব পরিচিত এ অঞ্চল কেমন ভৌতিক লাগছে। হাঁটতে গা ছমছম করে।
রাত নটাও হয় নি, এর মধ্যেই রশীদের চায়ের স্টল বন্ধ হয়ে গেছে। মডার্ণ লন্দ্ৰিও বীপ ফেলে দিয়েছে। এক বার মনে হল হয়তো আমার নিজের ঘড়িই বন্ধ হয়ে আছে। রাত বাড়ছে ঠিকই, টের পাচ্ছি না। কানের কাছে ঘড়ি ধরতেই ঘড়ির আওয়াজ ছাপিয়ে মন্টুর গলা শোনা গেল।
রাস্তার পাশে নাপিতের যে-সমস্ত ছোট ছোট টুলকাঠের বাক্স থাকে, তারই একটায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। আলো ছিল না বলেই এতক্ষণ নজরে পড়ে নি। চমকে বললাম, মন্টু কী হয়েছে রে?
কিছু হয় নি।
স্পঞ্জের স্যাণ্ডেল হাতে নিয়ে মন্টু টুলবাক্স থেকে উঠে এল। কাদায় পানিতে মাখামাখি। ধরা গলায় বলল, পা পিছলে পড়েছিলাম, স্যাণ্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে গেছে।
এত রাতে বাইরে কী করছিলি?
তোমার জন্যে বসে ছিলাম, এত দেরি করেছ কেন?
বাসায় কিছু হয়েছে মন্টু?
না, কিছু হয় নি। মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, বলেছে ভিক্ষে করে খেতে।
মন্টু শার্টের লম্বা হাতায় চোখ মুছতে লাগল।
টুলুদের বাসায় ছিলাম, টুলুর মাস্টার এসেছে। সে জন্যে এখানে বসে আছি।
কেউ নিতে আসে নি?
রাবেয়া আপা এসে চোর আনা পয়সা দিয়ে গিয়েছে, বলেছে তুমি আসলে তোমাকে নিয়ে বাসায় যেতে।
মন্টু আমার হাত ধরল। দশ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে সন্ধ্যা থেকে বসে আছে বাইরে, এর ভেতর ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে, বাতিটাতি নিভিয়ে লোকজন ঘুমিয়েও পড়েছে। সমস্ত ব্যাপারটার ভেতরই বেশ খানিকটা নির্মমতা আছে। অথচ মাকে এ নিয়ে কিছুই বলা যাবে না। বাবা রাত দশটার দিকে ঘরে ফিরে যখন সব শুনবেন, তখন তিনি আরো চুপ হয়ে যাবেন। মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াবেন এবং একদিন ক্ষতিপূরণ হিসেবে চুপি চুপি হয়তো একটি সিনেমাও দেখিয়ে আনবেন।
দাদা, রুনুকেও মা তালা বন্ধ করে রেখেছে। ট্রাঙ্ক আছে যে ঘরটায়, সেখানে।
রুণু কী করেছে?
আয়না ভেঙেছে।
আর তুই কী করেছিলি?
আমি কিছু করি নি।
ঝুনু বারান্দায় মোড়া পেতে চুপচাপ বসেছিল। আমাদের দেখে ধড়মড় করে উঠেজ দাঁড়াল।
দাদা, এত দেরি করলে কেন? যা খারাপ লাগছে।
কী হয়েছে, ঝুনু?
কত কি হয়েছে, তুমি রাবেয়া আপনাকে জিজ্ঞেস কর।
গলার শব্দ শুনে কুশবেয়া বেরিয়ে এল। চোখে ভয়ের ভাবভঙ্গি প্রকট হয়ে উঠেছে। চাপা গলায় বলল, মার ব্যথা শুরু হয়েছে রে খোকা, বাবা তো এখনো আসল না, কী করি বল তো?
কখন থেকে?
আধা ঘণ্টাও হয় নি। মার কাছ থেকে চাবি এনে দরজা খুলে দেব রুনুর, সেই জন্যে গিয়েছি–দেখি এই অবস্থা।
ভেতরের ঘরে পা দিতেই রুনু ডাকল, ও দাদা, শুনে যাও। মারা কী হয়েছে দাদা?
কিছু হয় নি।
কাঁদছে কেন?
মার ছেলে হবে।
অ। দাদা তালাটা খুলে দাও, আমার ভয় লাগছে।
একটু দাঁড়া, রাবেয়া চাবি নিয়ে আসছে।
এখান থেকে মায়ের অস্পষ্ট কান্না শোনা যাচ্ছে। কিছু কিছু কান্না আছে, যা শুনলেই কষ্টটা সম্বন্ধে শুধু যে একটা ধারণাই হয় তাই নয়, ঠিক সেই পরিমাণ কষ্ট নিজেরও হতে থাকে। আমার সেই ধরনের কষ্ট হতে থাকল।
রাবেয়া এসে রুনুর ঘরের তালা খুলে দিল। রাবেয়া বেচারি ভীষণ ভয় পেয়েছে।
তুই এত দেরি করলি খোকা, এখন কী করি বল? ওভারশীয়ার কাকুর বউকে খবর দিয়েছি, তিনি ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আসছেন। তুই সবাইকে নিয়ে খেতে আয়, শুধু ডালভাত। যা কাণ্ড সারা দিন ধরে, রাধব কখন? মার মেজাজ এত খারাপ আগে হয় নি।
হড়বড় করে কথা শেষ করেই রাবেয়া রান্নাঘরে চলে গেল। কলঘরে যেতে হয় মার ঘরের সামনের বারান্দা দিয়ে। চুপি চুপি পা ফেলে যাচ্ছি, মা তীক্ষ্ণ গলায় ডাকলেন, খোকা।
কি মা?
তোর বাবা এসেছে?
না।
আয় ভেতরে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
ব্যথাটা বোধহয় কমেছে। সহজভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। মার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর ফ্যাকাশে ঠোঁট ছাড়া অসুস্থতার আর কোনো লক্ষণ নেই।
খোকা, মন্টু এসেছে?
এসেছে।
আর রুনুর ঘর খুলে দিয়েছে রাবেয়া?
দিয়েছে।
যা, ওদের নিয়ে আয়।
রুণু ঝুনু আর মন্টু জড়সড় হয়ে দাঁড়াল সামনে। কিছুক্ষণ চুপ থেকেই মা বললেন, কাঁদছ কেন রুনু?
কাঁদছি না তো।
বেশ, চোখ মুছে ফেল। ভাত খেয়েছ?
না।
যাও, ভাত খেয়ে ঘুমাও গিয়ে।
মন্টু বলল, মা, আমি বাবার জন্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকব?
না-না। ঘুমাও গিয়ে। রুনু মা, কাঁদছ কোন তুমি?
কাঁদছি না তো।
আমার কিছু হয় নি, সবাই যাও, ঘুমিয়ে পড়। যাও, যাও।
ঘর থেকে বেরিয়েই কেমন যেন খারাপ লাগতে লাগল আমার। আমাদের এই গরিব ঘর, বাবার অল্প মাইনের চাকরি। এর ভেতরে মা যেন সম্পূৰ্ণ বেমানান।
বাবার সঙ্গে তাঁর যখন বিয়ে হয়। তিনি ৩ খন ইতিহাসে এম. এ. পরীক্ষা দেবেন। আর বাবা তাঁদের বাড়িরই আশ্রিত। গ্রামের কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করে চাকরি খুঁজতে এসেছেন শহরে। তাঁদের কী-যেন আত্মীয় হন।
বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে ওঠেন দু জন। মার পরীক্ষা দেওয়া হয় নি। কিছু দিন কোনো এক স্কুলে মাস্টারি করেছেন। সেটি ছেড়ে দিয়ে ব্যাঙ্কে কী-একটা চাকরিও নেন। সে চাকরি ছেড়ে দেন। আমার জন্মের পরপর। তারপর একে একে রুণু হল, ঝুনু হল, মন্টু হল–মা গুটিয়ে গেলেন নিজের মধ্যে।
সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে মা আমাদের গরিব ঘরে এসেছেন বলেই তাঁর সামান্য রূপের কিছু কিছু আমরা পেয়েছি। তাঁর আশৈশব লালিত রুচির কিছুটা (ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ হলেও) সঞ্চারিত হয়েছে আমাদের মধ্যে। শুধু যার জন্যে ভূষিত হয়ে আছি, সেই ভালোবাসা পাই নি কেউ। রাবেয়ার প্রতি একটি গাঢ় মমতা ছাড়া আমাদের কারো প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। মারি অনাদর খুব অল্প বয়সে টের পাওয়া যায়, যেমন আমি পেয়েছিলাম। রুনু ঝনুও নিশ্চয়ই পেয়েছে। অথচ আমরা সবাই মিলে মাকে কী ভালোই না বাসি।
উকিল সাহেবের বাসায় টেলিফোন আছে। সেখান থেকে ছোট খালার বাসায় টেলিফোন করলাম। ছোট খালা বাসায় ছিলেন না, ফোন ধরল কিটকি।
কী হয়েছে বললেন খোকা ভাই?
মার শরীর ভালো নেই।
কী হয়েছে খালার?
কী হয়েছে বলতে গিয়ে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল, এদিকে উকিল সাহেব আবার কান খাড়া করে শুনছেন কী বলছি। কোনো রকমে বললাম, মার ছেলে হবে কিটকি।
আপনাদের তো ভারি মজা, কতগুলি ভাই-বোন। আমি একদম একা।
কিটকি, খালাকে সকাল হলেই বাসায় এক বার আসতে বলবে।
হ্যাঁ বলব। আমিও আসব–।
মার বাড়ির লোকজনের ভেতর এই একটিমাত্র পরিবারের সঙ্গে আমাদের কিছুটা যোগাযোগ আছে। ছোট খালা আসেন মাঝে মাঝে। কিটকির জন্মদিন, পুতুলের বিয়ে–এই জাতীয় উৎসবগুলিতে দাওয়াত হয়। রুনু-ঝুনুর।
বাসায় ফিরে দেখি বাবা এসে গেছেন। ওভারশীয়ার কাকুর বউ এসেছেন, ধাই সুহাসিনীও এসেছে। রান্নাঘরে বাতি জ্বলছে। রাবেয়া ব্যস্ত হয়ে এঘর-ওঘর করছে। বাবা ভেতরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছেন। আমাকে দেখে যেন একটু জোর পেলেন। তোর ছোটখালাকে খবর দিয়েছিস খোকা?
জ্বি দিয়েছি। আপনি কখন এসেছেন? আমার একটু দেরি হয়ে গেল। তোর আজিজ খাঁকে মনে আছে? ঘড়ির দোকান ছিল যে, আমার খুব বন্ধুমানুষ। সে হঠাৎ মারা গেছে। গিয়েছিলাম তার বাসায়।
বাবা যেন আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিচ্ছেন, এমন ভাব-ভঙ্গি করতে লাগলেন, আজিজ খাঁর বউ ঘন ঘন ফিট হচ্ছে। এক বার মনে করলাম থেকেই যাই। ভাগ্য ভালো থাকি নি, নিজের ঘরে এত বড়ো বিপদ।
বিপদ কিসের বাবা?
না। বিপদ অবশ্যি নয়। কিন্তু রাতে এমন একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছি। যতবারই মনে হয়, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। কিছুক্ষণ আগে রাবেয়াকে বলেছি সে-কথা।
কী স্বপ্ন?
না-না, রাতের বেলা কেউ স্বপ্ন বলে নাকি রে? যা তুই, রাবেয়ার কাছে গিয়ে বস একটু।
ঘরে যদিও অনেকগুলি প্ৰাণী জেগে আছি। তবু চারদিক খুব বেশিরকম নীরব। রান্নাঘরে দু-একটি বাসনকেশন নাড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বাবা অবশ্যি মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। তাঁর একা একা কথা বলার অভ্যাস আছে। মাঝে মাঝে যখন মেজাজ খুব ভালো থাকে, তখন গুনগুন করে গানও গান। কথা বোঝা যায় না, ও মন মন রে এই লাইনটি অস্পষ্ট শোনা যায়। রাবেয়া বলে, বাবার নৈশ সংগীত। রাবেয়াটা এমন ফাজিল।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখি একটা মস্ত এলুমোনিয়ামের সসপ্যানে পানি ফুটছে। রাবেয়ার ঘুম ঘুম ফোলা মুখে আগুনের লাল আঁচ এসে পড়েছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে কি ভেবে অল্প হাসল। আমি বললাম, হাসছিস যে?
এমনি। সুহাসিনী মাসির আমি কী নাম দিয়েছি জানিস?
কী নাম?
কুহাসিনী মাসি। ওর হাসি শুনলেই আমার গা জ্বলে। একটু আগে কী বলেছে। छोनिन?
কী বলেছে?
থাক, শুনে কাজ নেই।
বল না?
বলে, আজ তোমার মার জনো এসেছি, এক দিন তোমার জন্যেও আসব খুকি। বলতে বলতে রাবেয়া মুখ নিচু করে হাসল। সে মনে হল কথাটা বলে ফেলে বেশ লজ্জা পেয়েছে। হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে কী খুজতে লাগল মিটসোফে। আমি বললাম, ৩োর ভাবভঙ্গি দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ খুশিই হয়েছিস শুনে।
তুই একটা গাধা।
লজ্জায় ব্রাবেয়া লাল হয়ে উঠল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম লজ্জা পাওয়ার কী হয়েছে?
যা! লজ্জা পেলাম কোথায়, তোর যে কথা! যাই, দেখে আসি রুনু-ঝনুরা মশারি ফেলে ঘুমিয়েছে কি না, যা মশা!
রাবেয়া আমার পাঁচ বৎসরের বড়ো। এই বয়সে মেয়েরা খুব বিয়ের কথা ভাবে। তাদের অন্তরঙ্গ সখীদের সাথে বিয়ে নিয়ে হাসাহাসি করে। রাবেয়ার একটি বন্ধুও নেই। আমিই তার একমাত্র বন্ধু। সুহাসিনী মাসির সেই কথাটি হয়তো এই জন্যেই বলেছিল আমাকে। আর আমি এমন গাধা, তাকে উন্টো লজ্জা দিয়ে ফেললাম। মেয়েরা লজ্জা পেলে এত বেশি অপ্রস্তুত হয় যে, যে লজ্জা দিয়েছে তার অস্বস্তির সীমা থাকে না।
ঘরে খুব হৈহৈ করে বেড়ালেও রাবেয়া ভীষণরকম লাজুক। কলেজে যাওয়া বন্ধ করার ব্যাপারটিই ধরা যাক। তিন বছর আগে হঠাৎ এক দিন এসে বলল, বাবা, আমি আর কলেজ করব না।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, কেন মা?
এমনি।
মা বললেন, রাবেয়া, তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?
না মা, কেউ কিছু বলে নি।
কোনো চিঠিফিটি দিয়েছে নাকি কোনো ছেলে?
না মা। আমাকে চিঠি দেবে কেন?
তবে কলেজে যাবে না কেন?
এমনি।
না, এমনি না। বল তোমার কী হয়েছে?
রাবেয়া হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, মা, ছেলেরা আমাকে মা কালী বলে ডাকে।
আমাদের ভেতর রাবেয়াই শুধু মার রং পায় নি। যতটুকু কালো হলে মায়েরা মেয়েদের শ্যামলা বলেন, রাবেয়া তার চেয়েও কালো। কিন্তু ছেলেরা শুধু গায়ের রংটাই দেখল?
ও ছেলে।
তাকিয়ে দেখি সুহাসিনী মাসি। ধবধব করছে গায়ের রং, ফোলা ফোলা চোখে এক বেমানান চশমা। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
খামাখা তোমার বাবা আমার ঘুম ভাঙিয়ে এনেছে, এখনো অনেক দেরি। নটার আগে নয়।
আমি চুপ করে রইলাম। সুহাসিনী মাসি বললেন, মেয়েটি কই? লম্বামতো মেয়েটি?
আসবে এক্ষণি, কেন?
এক কাপ চা করে দিতে বলতাম।–এই যে, ও খুকি, মাসিকে চা করে দাও না এক কাপ।
রাবেয়া হাসিমুখে বলল, দিই, আপনি বসবেন এখানে?
না, আমি একটু শোব ভেতরের ইজিচেয়ারে।
রাবেয়া তাকাল আমার চোখে চোখে, তোর লাগবে নাকি এক কাপ?
দে।
তাহলে পাঁচ কাপ দি। বাবাকে এক কাপ, আমার নিজের দু কাপ।
রাবেয়া চায়ের সরঞ্জাম সাজাতে লাগল। অভ্যস্ত নিপুণ হাত, দেখতে ভালো লাগে। আমি বললাম, মাসির বয়স কত রে?
অনেক। আমি ছাড়া সবাই তো তার হাতে। দেখলে মনে হয় না, তাই না?
হুঁ। মার ব্যথাটা একটু কম মনে হয়।
ছ বার মা এমন কষ্ট পেলেন। তোরা তো সুখে আছিস, কষ্ট যা তা তো মেয়েদেরই। পেটে ছেলে-মেয়ে আসা মানেই এক পা কবরে রাখা।
আমি বললাম, কষ্টটা যদি পুরুষরাও পেত, তাহলে তুই খুশি হতি?
জানি না।
বলেই রাবেয়া হঠাৎ কী মনে করে হাসতে লাগল। হাসির উচ্ছাসে পেয়ালার দুধ গেল উন্টে, অচল খসে পড়ল মেঝেয়।
অবাক হয়ে বললাম, হাসির কী হয়েছে? এত হাসছিস কেন?
একটা গল্প মনে পড়ছে, তাই হাসছি।
কী গল্প?
বাজে গল্প, তবে খুব মজার। শুনলে তুই নিজেও হাসবি। শুনবি?
বল।