Collected রুপালি ভাতের হোটেল

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
411
Messages
5,992
Reaction score
2,710
Points
3,913
Age
40
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
রুপালি ভাতের হোটেল

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






হোটেলের অর্ধেকটা খোলা, বাকি অর্ধেক আটকে রাখা। দুজন লোক এসে বলল, খাবারের আছে কি? হোটেলের কর্মচারী জামাল বলল, আজকে দুপুরে রান্না করা হয়নি কিছু। কেন রান্না করা হয়নি? এই হোটেল আর চলবে না, দুই একদিনের ভিতরে বিক্রি করে ফেলা হবে। কি বলো? হোটেল বিক্রি করবে কেন? জামাল বলল, মহাজনের বউয়ের জটিল রোগ হয়েছে একটা সেই রোগে অনেক টাকা খরচ হলো, তাঁর যে জমানো টাকা ছিলো শেষ, আর হোটেলে এখন এতো বাকি টাকা রয়ে গেছে। কেউ টাকা দিচ্ছে না, তাই মহাজন হোটেল বিক্রি করে দিবে।

লোক দু'জনের কেউ হোটেল থেকে উঠলো না। এখন দুপুর, তাঁরা ভেবেছে এই হোটেলে ভাত খাবে। বহুদিন পরে এই হোটেলে এসেছে। হোটেলটার নাম ‘রুপালি ভাতের হোটেল’ রুপালি মালিকের বড় মেয়ের নাম। যে মেয়েটা বেঁচে ছিলো একুশ দিন। সেই একুশ দিন জীবিত মেয়ের নামে এই হোটেলের নাম রেখেছেন।

হোটেলে এখন যে দু'জন বসে আছে দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তখন একমাত্র হাসমত আলীর এই ‘রুপালি ভাতের হোটেল ছিলো’ এখন অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো অনেক ভাত খিচুড়ির হোটেল, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট উঠেছে। তখন শুধু ছিলো ‘রুপালি ভাতের হোটেল’ শুক্রবার রাতে রুপালি ভাতের হোটেলে বিশ টাকা প্লেট খিচুড়ি রান্না করা হতো। ছাত্রজীবন ছেড়ে চাকরি জীবনে যাওয়র পরে ক্যাম্পাসে অনেকে ফিরে এসেছে কেবল রুপালি ভাতের হোটেলের শুক্রবারের বিশেষ এই খিচুড়ি খেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের স্মৃতির সাথে এই রুপালি ভাতের হোটেল আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে।

হোটেলের মালিক হাসমত আলীর বাবার প্রথমে এখানে ভাতের হোটেল ছিলো, তারপরে ওয়ারিশ সুত্রে হাসমত আলী হোটেল সামলায়।

হাসমত আলী জামালকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, কি সমস্যা কি চাই ওই দুজনের? ভাত খাইতে এসেছে, বলে দিছি ভাত হবে না। হাসমত আলী বলে তাহলে এখন যাচ্ছে না কেন?

হাসমত আলী নিজেই ক্যাশ থেকে উঠে লোক দুজনের সামনে গেলো। হাসমত আলী বলল, আসলে আমার হোটেল বিক্রি করা হবে তাই ভাত হবে না আপনার অন্য কোনো হোটেলে চলে যান। একজন উঠে বলল, হাসমত ভাই, আপনারা বাসায় কিছু রান্না করেননি নিজেদের খাবারের জন্যে সেটা থেকেই দেন না।
হাসমত আলী দরজন ঠেলে ভেতন ঘরে চলে গেলো। কতো ছাত্রদের তিনি বাকি খাওয়াইছেন, কতো ছাত্র ফ্রিতে খেয়েছে তাঁর হোটেলে হিসেব নেই। তখন ব্যবসা ভালো ছিলো, অনেক ছাত্রের মাস শেষে পনেরোশো টাকা হতো। হাসমত আলীর কাছে এসে বলতেন, হাসমত ভাই পুরো টাকা জোগার করতে পারিনি, এই হাজার টাকা রেখে দেন। হাসমত আলী এক হাজার টাকাই রেখে দিতেন। হাসমত আলী বিশ্বাস করেন, মানুষ মানুষকে খাওয়াতে পারেন না, খাওয়ানোর মালিক উপর আল্লাহ। আর এই ছাত্ররা একদিন দেশ সামলাবে, তাঁদের খাওয়ালে ক্ষতি নেই।

হাসমত আলী সারাজীবন মানুষকে খাওয়ালেন আজকে হোটেল বন্দ করবার দিন অন্তত এই দুইজনকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত না। ঘরের ভিতরে এসে দেখলো পাতিলে লাউ শাক আর কই মাছ রান্না করা। হাসমত আলী কই মাছ আর লাউ শাক দিয়ে দুজনকে ভাত দিলেন।

এই হোটেলে সবসময় ভীড় থাকতো, আজ হোটেলে মাত্র দুজন মানুষ খাবার খাচ্ছে। হাসমত আলীর এই দৃশ্যটা ভীষণ মন দিয়ে দেখলেন, কয়েকদিনের ভিতরে হয়তো হোটেল বিক্রিও হয়ে যাবে। হাসমত আলীর বুকের ভেতরে এক চাপানো দুঃখ যেনো হুট করে জেগে উঠেছে, চোখের চশমা খুলে রেখেছেন পানিতে ঝাপসা হয়ে উঠছে সব।
হাসমত আলী ঠিক করেছেন বউকে নিয়ে গ্রামে চলে যাবেন৷ তাঁর পৈতৃক কিছু সম্পত্তি গ্রামে আছে, সেসব দিয়ে সংসার চলে যাবে। জামাল বারবার অনুরোধ করলো হোটেল বিক্রি না করতে, হাসমত আলী বলেন, এখন হোটেল চালানোর মতো পয়সা তাঁর কাছে নেই। যতো যাইহোক জামাল এই হোটেলের কর্মচারী হিসেবে সতেরো বছর আছে, জামালের বয়স যখন এগারো বছর তখন থেকে হোটেলের সাথে আছেন। হোটেলের প্রতি তাঁরও যে একটা মায়া কাজ করে। প্রতিবার যখন হোটেল কিনতে লোক আসে জামালের মুখের দিকে তাকানো যায় না। হাসমত আলীর চেয়ে বেশি দুঃখী তখন জামালকে লাগে।

দুজন লোকের খাওয়া শেষ হলো। তাঁরা টাকা দিতে মানিব্যাগ বের করতে গেলে হাসমত আলী বলল, থাক টাকা দিতে হবে না। হাসমত আলী কিছুতেই টাকা নিতে রাজি হলেন না।

একজন উঠে বলল, হাসমত ভাই চিনছেন আমারে? হাসমত আলী চোখটা মুছে চশমা চোখে দিয়ে দেখলেন, তিনি যদিও চিনতে পারেননি কতো ছাত্রই যে তাঁর হোটেলে খেয়েছে, কতোজনের মুখ আর সে মনে রাখতে পারবেন! হাসমত আলী না চিনেও চিনতে পেরেছে এমন ভাব নিয়ে একটা হাসি দিয়ে বললেন, আরে তোমরা কেমন আছো, কোথায় থাকো, কতোদিন পরে দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে কি আসো না এখন ঘুরতেও। আর আসবেই বা কেন, চাকরি সংসার, ছেলেমেয়ে কতো কি সামাল দিতে হয় এখন তোমাদের।

হাসমত ভাই আমি শিমুল চিনছেন? পাশ থেকে অপরজন বলল, আমি মোমেন। হাসমত আলী বললেন, তোমাদের চিনবো না সে কি করে হয়।
শিমুল এবং মোমেন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে এগারো বছর হয়। এগারো বছর পরে আবার দুই বন্ধু এখানে এসেছে। শিমুল গ্রাজুয়েশেন শেষ করে বউকে নিয়ে দেশের বাহিরে চলে যায়, মোমেনের চাকরি হলে সে চলে যায় চট্টগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেও ‘রুপালি ভাতের হোটেলে’ আসা হয়নি। আজকে এমন একটা সময় এসেছে, যখন রুপালি ভাতের হোটেলের শেষ সময়।

শিমুলের প্রায়ই মাস শেষের কয়েকদিন পকেট খালি থাকতো। হাসমত ভাইয়ের হোটেলে কতোদিন না সে ফ্রিতে খাবার খেয়েছে তাঁর হিসেব নেই।
শিমুল বলল হাসমত ভাই আপনি হয়তো আমাদের ঠিক করে চিনতে পারেননি। হাসমত আলী বলল, না চিনছি, ওই যে তুমি আর একটা মেয়ে আসতে প্রায় দুপুরে ভাত খেতে। শিমুল বলল, হ্যাঁ ওর নাম বকুল, বকুলের সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে, এখন আমাদের দুই বাচ্চা। হাসমত আলীর এই দুইজনকে চিনতে অনেকটা সময় লেগেছে। বয়স হয়েছে অনেক, এখন এতোকি আর মনে থাকে।

শিমুল আর মোমেন পরদিন ঠিক দুপুরে ‘রুপালি ভাতের হোটেলে’ আসে। কাঁধে ছোটো একটা ব্যাগে ছয় লাখ টাকা। তাঁরা পাঁচজন বন্ধু মিলে টাকাটা দিয়েছে। শিমুল যখন হাসমত আলী হোটেল বন্দ হবার কথা আলাপ কনে বন্ধুদের সাথে, বেশ কয়েকজন টাকা দেয়। শিমুল হাসমত আলীর হাতে ব্যাগটা দিয়ে বলল, হাসমত ভাই আজকে আপনার সেই স্পেশাল খিচুড়ি খেতে চাই, আমি একা আসিনি কিন্তু বকুলও সাথে এসেছে। হাসমত আলীর ‘রুপালি ভাতের হোটেলের সবকটা ঝাপ খুলে দেওয়া হয়েছে, হোটেলে বাতি জ্বলছে। হাসমত আলীর হোটেলে স্পেশাল খিচুড়ি রান্না হচ্ছে।

পরদিন হাসমত আলীর হোটেলে দুপুরে ভাত রান্না হয়। হোটেলের সবকটা টেবিল ভর্তি ছাত্ররা। জামাল ছুটছে সবাইকে খাবার দিতে। রুপালি ভাতের হোটেল যেনো বহুদিন পরে একটা হারানো দুপুর ফিরে পেয়েছে।
 
Back
Top