Own/Self ফোঁটার গান

WhisperBD

Special Member
Moderator
1K Post
Joined
Dec 28, 2024
Threads
173
Messages
6,713
Reaction score
7,211
Points
2,263
Age
47
Location
Dhaka
Gender
Male
ফোঁটার গান
[লেখক: আমার অনুভূতির রঙে গাঁথা শব্দমালা, যা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে]

গ্রামের নাম ছিল কলমাকান্দা, নদীর কোলে এক টুকরো সবুজের আলপনা। নদীটা ছিল শান্ত, নাম তার শঙ্খিনী। গ্রামের মানুষ বলত, শঙ্খিনীর জলের মধ্যে গান আছে, যে শোনে, সে হারিয়ে যায়। কিন্তু এ গল্প নদীর নয়, এ গল্প এক ফোঁটা জলের, আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা এক অচেনা ছেলের।

ছেলেটির নাম ছিল রিদান। বয়স কুড়ি-বাইশ, চোখে একটা উদাসী ভাব, যেন সে কিছু খুঁজছে, কিন্তু নিজেও জানে না কী। রিদান গ্রামে নতুন এসেছিল, শহর ছেড়ে। শহরে তার জীবন ছিল ইট-কংক্রিটের জঙ্গল, যেখানে স্বপ্নগুলো যান্ত্রিক শব্দে চাপা পড়ত। একদিন, ব্যাগে দুটো জামা আর একটা পুরনো ডায়েরি নিয়ে, সে চলে আসে কলমাকান্দায়। কেন এল, সে নিজেও জানত না। শুধু মনে হল, এখানে হয়তো তার হারানো কিছু মিলবে।

গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা ভাঙা বাঁশের ঘরে থাকত রিদান। সকালে উঠে শঙ্খিনীর ধারে বসত। নদীর জলে সে নিজের মুখ দেখত, আর ভাবত, এই জল কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়? একদিন, সকালের নরম রোদে, সে দেখল এক ফোঁটা জল। নদীর বুকে ভাসছে, কিন্তু আলাদা। ফোঁটাটি যেন ঝিকমিক করছে, যেন তার নিজস্ব আলো আছে। রিদান হাসল। “এক ফোঁটা জল, তুই কি আমার মতোই ভেসে বেড়াস?”

সেদিন থেকে রিদানের মনে একটা খেলা শুরু হল। সে ফোঁটাটিকে দেখত, কল্পনা করত, এই ফোঁটা কোথায় যাবে। সে ভাবত, ফোঁটাটি একা, কিন্তু একা থাকতে চায় না। হয়তো অন্য ফোঁটার সাথে মিলে নদী হবে, হয়তো সমুদ্রে পৌঁছবে। রিদানের ডায়েরিতে ফোঁটার গল্প লেখা শুরু হল। “আজ ফোঁটা নদীর স্রোতে ভাসছে। সে একটা পাথরে ধাক্কা খেল, কিন্তু থামল না। সে যেন আমাকে বলছে, রিদান, তুইও থামিস না।”

দিন গেল। রিদান গ্রামের মানুষের সাথে মিশতে শুরু করল। সে দেখল, গ্রামের মানুষের জীবনও যেন ফোঁটার মতো। ক্ষুদ্র, সাধারণ, কিন্তু একসাথে মিললে অপার। কেউ ধানের খেতে কাজ করে, কেউ মাছ ধরে, কেউ গল্প বলে। রিদানও তাদের সাথে কাজ করতে শুরু করল। সে ধান রোপল, নৌকা বাইল, আর শঙ্খিনীর ধারে বসে গ্রামের বুড়োদের গল্প শুনল। তার ডায়েরিতে ফোঁটার গল্পের সাথে গ্রামের গল্প জড়িয়ে গেল।

একদিন বর্ষা এল। শঙ্খিনী উথলে উঠল। গ্রামের মানুষ বলল, “এবার বন্যা হবে।” রিদান ভয় পেল, কিন্তু গ্রামের মানুষ হাসল। “ভয় কীসের? আমরা একসাথে আছি।” বন্যা এল, জল ঢুকে গেল ঘরে-বাড়িতে। কিন্তু গ্রামের মানুষ থামল না। তারা নৌকা বাঁধল, উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিল, একে অপরের হাত ধরল। রিদানও তাদের সাথে ছিল। সে দেখল, কীভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষের শক্তি মিলে একটা বিরাট শক্তি তৈরি হল। বন্যার জল যখন কমল, গ্রাম আবার হাসল।

সেদিন রাতে, রিদান শঙ্খিনীর ধারে বসল। তার ডায়েরি খুলল। সে লিখল, “ফোঁটা, তুই আমাকে শিখিয়েছিস। তুই একা ছিলি, কিন্তু অন্য ফোঁটার সাথে মিলে তুই নদী হয়েছিস, বন্যা হয়েছিস। আমিও একা ছিলাম, কিন্তু এই গ্রামের মানুষের সাথে মিলে আমি নতুন রিদান হয়েছি। আমার স্বপ্নগুলো আর ছোট নয়। তারা এখন বিরাট, কারণ তারা একা নয়।”

রিদানের ডায়েরি শেষ হল না। সে গ্রামেই থেকে গেল। কখনো সে শঙ্খিনীর ধারে বসে ফোঁটার গল্প লিখত, কখনো গ্রামের ছেলেদের সাথে নৌকা বাইত। কিন্তু তার চোখের উদাসী ভাবটা গেল। তার জায়গায় এল একটা হাসি, যেন সে খুঁজে পেয়েছে তার হারানো কিছু।

আর শঙ্খিনী? সে বয়ে চলল, তার জলে মিশে রইল ফোঁটার গান। ক্ষুদ্র ফোঁটারা, যারা একসাথে মিলে গড়ে তুলল এক অপার গল্প।
 
Back
Top