Collected পায়ের তলায় সর্ষে - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
419
Messages
6,331
Reaction score
3,353
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
পায়ের তলায় সর্ষে

লেখকঃ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়






পর্ব - ১

আমার ভ্রমণ



কম বয়সে ভ্রমণের একটা ভীষণ তীব্র ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছে হত যখন-তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি, কোথাও-না-কোথাও চলে যাই। কিন্তু পয়সা ছিল না। বিদেশে যাওয়ার কথা তো তখন কল্পনার বাইরে। কখনও হয়তো ভাবতাম, জাহাজে চাকরি নিয়ে বিদেশে-মনে-মনে এইরকম একটা শখ ছিল। দেশের মধ্যে খুব বেশি দূরে কোথাও যাওয়ার সংস্থান ছিল না। তবু দু-একবার গেছি, যেমন হায়দরাবাদ বা সিমলায়। গেছি—বলতে গেলে বিনা টিকিটে। একদম বিনা টিকিটে সাহস করে যাওয়া যায় না। তবে, আমার এক বন্ধুর বাবা রেলে চাকরি করতেন। তিনি তাঁর দুই ছেলের নামে পাস পেতেন। আমি ওই পাস নিয়ে চলে যেতাম। সবসময় বুকের মধ্যে একটা ধড়ফড় ধড়ফড় ভাব—এই বুঝি ধরে ফেলল। আর একটা ভয় হত, যদি বাবার নাম জিগ্যেস করে? ওদের পদবি ছিল দাশগুপ্ত। লোকে নিজের নামটা মিথ্যে বলতে পারে, কিন্তু বাবার নামটা মিথ্যে বলতে মনের মধ্যে একটা দ্বিধা থাকে। অবশ্য ওভাবে ভ্রমণে কখনও ধরা পড়তে হয়নি আমাকে। এইভাবে গিয়েছিলাম একবার, সিমলা পর্যন্ত, আর একবার হায়দরাবাদ পর্যন্ত।

ঘুরতে যেতাম কুড়ি টাকা পঁচিশ টাকা সম্বল করে। সঙ্গে হয়তো কোনও বন্ধু থাকত— দুটো পাস পাওয়া যেত আগেই বলেছি। ওই পাসের সুবিধা হল, টিকিটের খরচ তো বাঁচতই, আর যতদূর পাস, তার আগে যে-কোনও স্টেশনে নেমে পড়া যেত। কোনও স্টেশনে নেমে মালপত্র যা থাকত সঙ্গে, ওখানকার লকারে জমা করে দিতাম। তারপর ঝাড়া হাত-পায়ে সারা দিন ঘুরে বেড়িয়ে রাত্তিরে স্টেশনেই এসে শুয়ে থাকতাম। হোটেল খরচটাও বেঁচে যেত। এইভাবে ঘুরেছি তখন কলেজ-টলেজ পড়ার সময়ে। এরপর আরও বহু জায়গা ঘুরেছি। কিন্তু এখন যখন ভাবি, তখন মনে হয় ওই সবই যেন বেশি ভালো লাগত। তখন হয়তো কষ্ট হয়েছে। মাঝে মাঝে হত কি আমার এক বন্ধু ছিল—মহাপাজি, সে ট্রেনে উঠেই বলত, ওই যাঃ মানিব্যাগটা আনতে ভুলে গেছি। সবই ইচ্ছে করে করত। ফলে, একজনের টাকাতেই দুজনকে যেতে হত। এবং তাতেও শেষ পর্যন্ত কুলিয়ে যেত।

সিমলাতে গিয়ে কালীবাড়িতে উঠেছি, কিন্তু টাকা ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছি। খুবই সামান্য ভাড়া ছিল—তখনকার হিসেবে চার টাকা। কিন্তু আমাদের তো সম্বলই মাত্র পঁচিশ টাকা। কিছু খেতে হবে তো। আর সেই বয়সে তখন সাংঘাতিক খিদে পেত। কালীবাড়িতে দু-তিন দিন থাকার পরে হিসেব করে দেখলাম, ওদের ভাড়া মেটাতে গেলে তার পরের অন্তত দু-তিন দিন–ট্রেনে ফেরার সময়টুকুতে আর কিছু খেতে পাব না। দুপুরের দিকে কালীবাড়ি সুনসান থাকত, ওদের পাহারা দেবার লোকটোক থাকত না, টুক করে সুটকেসটা নিয়ে তখন বেরিয়ে পড়েছি, ভাড়াটাড়া না দিয়ে। সোজা স্টেশনে গিয়ে বসে আছি। সবসময় ভয়, এই বুঝি তাড়া করে আসবে। এই সবই তো ছিল প্রথম দিকের ভ্রমণ কাহিনী।

বিনা টিকিটে অনেক ঘুরেছি। এ-বেলায় তো তবু সঙ্গে একটা পাস ছিল। পরে আমরা বিহারের সাঁওতাল পরগনার দিকে অনেকবার গিয়েছি। তখন আমাদের প্রথাই ছিল, পাঁচজন হলে তিনজনের টিকিট কাটব, দুজনের কাটব না। কী করে যেন তালেগোলে ঠিক চলে যেত। অনেক সময় টিকিটচেকার উঠলে দু-জন নেমে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঘোরাঘুরি করতাম, হয়তো একজন বাথরুমে ঢুকে পড়ত।

একবার এরকম হল, কোথায় যেন যাচ্ছি ট্রেনে করে, একজন বন্ধু চেকারকে দেখে বাথরুমে ঢুকে লুকিয়ে রয়েছে। শীতের রাত্রি ছিল, প্ল্যাটফর্মে নেমে ঘোরাঘুরি করাটা সুবিধার ছিল না মোটেই। টিকিট চেকার এদিক থেকে ওদিকে টিকিট চেয়ে-চেয়ে ঘুরছে। হঠাৎ দেখি, সে কানে পৈতে গুটোচ্ছে। মানে, সে-ও যাবে বাথরুমে। বাথরুম বন্ধ। কিন্তু সে যদি বোঝে বাথরুমে একজন কেউ রয়েছে, সে হয়তো অপেক্ষা করবে তার টিকিট দেখার জন্য। তখন কী করা! আমাদের এক বন্ধু করল কি, টিকিট চেকারটাকে ঠেলে সরিয়ে ওই বাথরুমটাতেই ঢুকে গেল। ভাবটা এমন যেন সে আর হালকা না হয়ে থাকতে পারছে না।

যদি কখনও চেকার ধরত, ধরা পড়েছিও বেশ কয়েকবার, বিশেষ কিছু অবশ্য করত না। আমরা শুনতাম জেলে-টেলে দেয়। তা কিন্তু দিত না। প্ল্যাটফর্মে বসিয়ে রাখত অনেকক্ষণ। তারপর বলত দু-টাকা দাও, কি তিন টাকা দাও। তারপর ছেড়ে দিত। দু-টাকা দিয়ে যদি দশ-বারো টাকার টিকিট খরচা বাঁচানো যেত তো ভালোই হত ব্যাপারটা। জানি না, এখন কী শাস্তি দেয়, অথবা ঘুষের রেটটা কত বেড়েছে।

আমাদের সব থেকে প্রিয় জায়গা ছিল সাঁওতাল পরগনা। একটু একটু পাহাড়, একটু জঙ্গল—ফাঁকা ফাঁকা—খুব ভালো লাগত। ট্রেনে চক্রধরপুর অবধি চলে যেতাম। সেখান থেকে রাঁচি–পাহাড়ি রাস্তা। ওই রাস্তায় অনেক ট্রাক চলে। হাত দেখিয়ে থামানো হত। উঠে বসতাম ট্রাকের ওপরে। অনেক সময় পয়সাও নিত না বা একটাকা কি দুটাকা দিলেই চলত—কখনও বা সিগারেটের প্যাকেট। ভরতি ট্রাক, তার মাথায় চড়ে যাওয়া। বৃষ্টি এলে আর রেহাই ছিল না। পাঁঠাভেজার মতো ভিজতে হত। ওপর থেকে হাজার চেঁচিয়ে ডাকলেও ট্রাকওয়ালা শুনতে পেত না।

এই রাঁচি-চক্রধরপুর রাস্তাটার ওপরে জায়গায় জায়গায় অনেক ফরেস্ট বাংলো আছে। জায়গার নামগুলো খুব সুন্দর-টেবো, বদগাঁও, শোডি। কাছাকাছি অনেক ঝরনা ছিল, তখন জঙ্গলও ছিল খুব ঘন। হাতি বেরত প্রায়ই। লেপার্ড ছিল, ভালুক আসত—খুব রোমাঞ্চকর ছিল সে সব জায়গা। আদিবাসীদের গ্রাম মাঝে মাঝে—তারা মহুয়া তৈরি করে খাওয়াত। খাবারদাবারও সস্তা ছিল; তখনকার দিনে শহর বা আধা শহরের চাইতে সত্যিই জঙ্গলের অঞ্চলের খাবারদাবারের দাম কম ছিল।

ফরেস্ট বাংলোগুলোয় উঠতাম বটে, তবে বুক করতাম না। বুক করলে পয়সা লাগবে তো। আমরা উঠে পড়তাম—চৌকিদারের হাতে দু টাকা পাঁচ টাকা দিলেই চলত। অবশ্য যদি ফাঁকা থাকত, তবেই। কখনও সন্ধেবেলায় এসে পৌঁছেছি। বাংলায় লোক আছে। তখন আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। চৌকিদারের ঘরেই থাকতে হত, কি বাংলোর বারান্দায়। গরমকাল হলে বারান্দাটা ভালোই, কোনও অসুবিধা ছিল না। একবার কোনও এক জাঁদরেল অফিসার এসেছিল হয়তো, বারান্দায় জায়গা হল না, চৌকিদারের ঘরেই যেতে হল। কিছু পয়সা দিলে ওরাই রান্নাটান্না করে দিত। অল্পবয়সে অনেক কষ্ট সহ্য করা যায়। তখন সব কিছুই ভালো লাগে।

একবার মনে আছে, আমরা চার-পাঁচজন গেছি হেশাডির বাংলোতে। সিগারেট ফুরিয়ে গেছে। রাত্রিবেলায় মনে হচ্ছে যেন একটা সিগারেট না পেলে জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় সিগারেট পাওয়া যায়! তখন মনে পড়ল, কাছেই, চৌকিদারের ঘরের পাশে আর একটা ছোট্ট ঘরসেই ঘরে একটা লোক উঠেছিল। তার পেশা ছিল অদ্ভুত। পিচ ঠেলে রাস্তা সমান করার যে রোডরোলার, ওই যন্ত্র সে ডেলিভারি দিত। সেই গাড়ি গুড়গুড় গুড়গুড় করে এগোয়। ঘণ্টায় দুমাইলও যায় কি না সন্দেহ। একখান থেকে আরেকখানে পৌঁছতে ওর কদিন লাগত কে জানে। ও যেত, আবার কোথাও বিশ্রাম নিত, আবার যেত, এই রকম। দিনের বেলা লোকটার সঙ্গে দুএকবার কথাও হয়েছে। রাত্রিতে সেই সময়ে খেয়াল হল লোকটা তো সিগারেট খায়! লোকটা বেশ ভালো মানুষ মতন ছিল। তাকে ডেকে তুলে বললাম, দাদা আমাদের কয়েকটা সিগারেট ধার দেবেন? আমরা পাঁচজন ছিলাম। লোকটা বলল, পাঁচটা তো দিতে পারব না। তিনটে আছে। কাল সকালে একটা তো আমার লাগবেই, দুটো দিতে পারি। সিগারেট পাওয়া গেল। তখন মনে হচ্ছিল, ওই সিগারেট দুটোই না জানি কী অমূল্য সম্পদ—একটা লোক কী দারুণ উপকার করল আমাদের।

হেশাড়ির কাছে একটা সুন্দর ঝরনা ছিল–তার নামটা হয়তো শক্তির–মানে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মনে থাকতে পারে। শক্তি একবার ওখানে গিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে গিয়েছিল। আমাদের এক বন্ধু সমীর রায়চৌধুরী চাইবাসায় কাজ করত। চাইবাসা থেকে বাসে করে ওখানে যাওয়া যায়। শক্তি গিয়ে থেকে গেল অনেকদিন। আমরা ভাবলাম শক্তি বোধহয় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। তখন আবার গেলাম শক্তির খোঁজ করতে। এইভাবে অনেকবার গেছি ওইসব দিকে। ওখানকার মানুষজনও ছিল ভারী সুন্দর। জঙ্গল আর পাহাড় তো ছিলই।

পাহাড়ের প্রসঙ্গে বলি, বিহারে তখন একটা ব্যাপার ছিল, আমাদের কাছে যেটা বেশ রোমান্টিক বলে মনে হত—ওখানে অনেক পাহাড় বিক্রি হত। পাহাড় মানে ছোট ছোট টিলা। চাইবাসার কাছে দেখেছি মাঝে-মাঝে নিলাম হচ্ছে, লোকে কিনে নিচ্ছে। আমাদের তখন মনে হত, আঃ, যদি পয়সা থাকত একটা পাহাড় কিনে নিতাম। তিন হাজার চার হাজার টাকায় এক-একটা পাহাড় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তখনকার হিসেবে সেটা অনেক টাকা, অন্তত আমাদের কাছে। খালি মনে হত, ইস্ যদি কিনতে পারতাম একটা পাহাড়।

বেড়াতে বেরিয়ে বহু বিচিত্র ঘটনা ঘটে। একবার মধ্যপ্রদেশের একটা জায়গায় যাব বলে বেরিয়েছি। জায়গাটার নাম অবুঝমার। পাহাড় আছে। জিপ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যে রাস্তাটা দিয়ে সেটা হয়তো মান্ধাতার আমলে তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু তারপরে ওটার কথা কেউ আর মনে রাখেনি। তার মাঝে-মাঝে বিরাট-বিরাট খাদ, খাদ পেরিয়ে আবার কিছুটা ভালো রাস্তা—আবার আর একটা ঝকমারি কিছু। রাস্তার দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। এইরকম একটা জঙ্গলের মাঝখানে জিপটা একসময় খারাপ হয়ে গেল। প্রথমে আমরা চিন্তা করলাম হেঁটে এগানো যায় কি না। যেখানে জিপটা খারাপ হয়ে গেল, সেখান থেকে অবুঝমার কুড়ি মাইল, যেখান থেকে রওনা দিয়েছি সেটাও কুড়ি মাইল। প্রথমে ভাবলাম অবুঝমারের দিকেই যাওয়া যাক। কিন্তু পরে মনে হল অচেনা জায়গা, অতদূর হেঁটে-হেঁটে গিয়ে হয়তো দেখব রাত্রিতে থাকারও জায়গা নেই। তখন ফেরাই সাব্যস্ত করলাম।

ফিরতে গিয়ে বুঝলাম—-অসম্ভব। উঁচু-নীচু পাহাড়ি রাস্তা। সেই পথে এক ঘণ্টা হেঁটে দেখা গেল দেড় মাইলের বেশি এগোনো যায়নি। কুড়ি মাইল হাঁটতে দিন কাবার হয়ে যাবে। হেঁটে কোনও লাভ নেই। ঠিক করলাম ওখানে রাত কাটাতে হবে।

কিছু আদিবাসী অবুঝমারের দিক থেকে হেঁটে আসছিল। তারা যাবে রায়পুরের দিকে হাটে। কিন্তু তাদের সঙ্গে হেঁটে আমরা পারব কেন? তারা গ্রামের লোক, ওদের হেঁটে যাওয়া অভ্যাস আছে। যেখানে যাচ্ছে, সেখানে হয়তো পৌঁছবে মাঝরাতে। থাকা-শোওয়ার জন্য কোনও দুর্ভাবনা নেই ওদের। সেই লোকগুলোকে আমরা বলে দিলাম, ওরা ওখানকার এস.ডি.ও-কে যেন বলে যে, আমরা এখানে আটকে পড়েছি। ওখানকার এস.ডি.ওর সঙ্গে তার আগে আমাদের ঘটনাচক্রে একবার আলাপ হয়েছিল। সেই লোকগুলো অবশ্য আমাদের ভাষা ভালো বুঝল না। তখন তাদের হাতে একটা চিঠি লিখে দেওয়া হল।

এত সব কিছু করা হল বটে, কিন্তু আমাদের বিশেষ ভরসা ছিল না। কিছু গ্রামের লোক, তারা এস.ডি.ও-র সামনে যেতেই ভয় পায় এবং কোনওদিন তার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে হয় না। তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হতেই চিঠি তুলে দিলাম, সে চিঠি গন্তব্যে পৌঁছবে এমন ভরসা কম। খুব সহজ সেই চিঠি রাস্তাতেই ছিঁড়ে ফেলা। আবার চিঠি যদি দেয়ও, এস.ডি.ও ভদ্রলোকটি কতটুকু গুরুত্ব দেবেন তাতে সন্দেহ ছিল, কারণ সামান্য একটু আলাপের সূত্ৰই আমাদের সম্বল। আমরা আন্দাজের ওপর বসে রইলাম। আস্তে-আস্তে সন্ধে হতে থাকল।

যেই অন্ধকারটি হয়েছে অমনি জঙ্গলটাকে ভয়ানক বিপজ্জনক মনে হতে লাগল। তার আগে অবধি বেশ উপভোগ করছিলাম। একটা লোককে আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভাই এ জঙ্গলে কি বাঘ আছে? শুনে লোকটা ভীষণ অবাক হয়ে গিয়ে বলেছিল, জঙ্গলে বাঘ থাকবে না তো, কি তোমার বাড়িতে বাঘ থাকবে? আর সেই থেকে আমরা ভাবছি এই বুঝি অন্ধকারে বাঘের চোখ দেখব। অস্ত্রশস্ত্র কিছু সঙ্গে ছিল না, থাকলেও কী হত কে জানে। কিন্তু সে যাত্রায় আমাদের কোনও বিপদে পড়তে হয়নি। রাত বারোটা নাগাদ এস.ডি.ও. দু-দুটো গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন আমাদের উদ্ধার করতে। আমাদের উদ্ধার করে শহরে পৌঁছে দিলেন। এমনকি তিনি তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন শেষ পর্যন্ত। এমন নয় যে, তিনি আমাদের লেখক হিসেবে চিনতে পেরে সৌজন্যসূচক ব্যবহার করছেন। যে-মানুষ চিরকুট পৌঁছে দিয়েছিল, এবং এস.ডি.ও ভদ্রলোক এরকম মানুষের দেখা বোধহয় এইসব জায়গাতেই একমাত্র পাওয়া সম্ভব।

এই অবুঝমার পাহাড়টা ছিল বাস্তার জেলায়। আমার এক বন্ধু সেখানে জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বুনো পাট আর চা-গাছের খোঁজ করত। ও দেখত, কীভাবে কী বৈশিষ্ট্যের জন্য এই বুনো প্রজাতির গাছগুলো, চাষ করা প্রজাতিগুলোর তুলনায়, বিনা যত্নে, বিনা সারে, বিনা কীটনাশকে বেঁচে থাকে। ও যেমন-যেমন ঘুরত, আমরাও তার সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরতাম।

বাস্তারে আমরা ঘোঁটুল দেখতে পেয়েছিলাম। মারিয়া বা মুরিয়াদের মধ্যে এইরকম ঘোঁটুলের ব্যবহার আছে। এটা হল গ্রামের মধ্যে একটা ঘর—যেখানে সেই গ্রামের যুবক-যুবতীরা এক সঙ্গে রাত কাটায়। তারা এক-একদিন এক-একজন পছন্দ মতো সঙ্গীকে নিয়ে শোয়, বলা বাহুল্য যৌনসম্পর্কও স্থাপিত হয় পরস্পরের মধ্যে। কিন্তু কোনও ব্যাভিচার চলে না। কোনও নোংরামো নেই কোথাও। একসময় কোনও একটি ছেলের সঙ্গে কোনও একটি মেয়ের পাকাঁপাকি সম্বন্ধ গড়ে ওঠে। তখন যে-যার পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করে আলাদা সংসার পাতে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কী সাংঘাতিক ব্যাপার! বিয়ের আগে ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে শুচ্ছে! কিন্তু আসলে এই প্রথাটা ওদের ওখানে খুবই উপকারী। ওখানে এ নিয়ে কোনও লাম্পট্য বা মারামারি অশান্তি কিছুই শোনা যায় না। ভেরিয়ার এলুইনের একটা বই আছে—‘ওয়ার্ল্ড অফ দ্য ইয়ং। সেখানে এ-সম্পর্কে অনেক কথা পড়েছি। বাইরের লোক গেলে ওরা কিছু মনে করে না। খেতেটেতে দেয়, থাকতে দেয়। আমরা এরকম বেশ কয়েকটা ঘোঁটুল দেখতে পেয়েছিলাম।

বাস্তারের এক জায়গায় একবার গেছি, তখন সেখানে একটা হাট হচ্ছে। হাটে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না, সামান্য কিছু তরিতরকারি, মেটে আলুটালু, একটু গাজর, কি শালগম, এইসব। মাছটাছ পাওয়া যায় না। গরিব দেশ। মধ্যপ্রদেশের মতো গরিব বোধহয় আর কোথাও নেই, জিনিসও পাওয়া যায় না। খিদে পেয়েছিল বলে সেখানে একটা ভাতের হোটেলে ভাত খেতে গেছি। এরকম হোটেলও বোধহয় ভারতের আর কোথাও নেই, যেখানে ভাত আর ডাল ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। মাছমাংস চাই না একটা ভাজা বা তরকারি তো দেবে! তা-ও নেই। ওখানকার লোকেরা তাই-ই খাচ্ছে।

সেখানে একটা বোবা মতো লোক, অন্তত প্রথমে তাই মনে হয়েছিল, ভাতের থালাটালা এনে দিচ্ছিল। খেতে খেতে আমরা যখন ‘পানি’ ‘পানি’ বলে চেঁচাচ্ছি সে লোকটা একটা জলের গ্লাস টেবিলে নামিয়ে বলল ‘জল’। ওর মুখে ‘জল শুনে আমরা একটু চমকে উঠেছিলাম। পরে জেনেছিল, সে হল দণ্ডকারণ্যের রিফিউজি। লোকটাকে পরে জেরা করতে ও বলল, দীর্ঘদিন বাংলা

বলতে-বলতে ও বাংলা প্রায় ভুলে গেছে। লোকটা অবশ্য খুব বুদ্ধিমানও নয়। মাঝে-মাঝে দুচারটে বাংলা শব্দ বলে ফেলে। সেইরকম একবার রায়পুরে রিকশায় চেপে মনে হল রিকশাওয়ালার হিন্দি কথাগুলো যেন কানে কেমন লাগছে! বেরিয়ে পড়ল, সেই রিকশাওয়ালাও বাঙালি। ভাবতেই কেমন অবাক লাগে। বাস্তারের আদিবাসীদের হাটে কোনও বাঙালি ছেলে হোটেলে কাজ করছে, রায়পুরে রিকশা চালাচ্ছে।

একবার খুব অবাক হয়েছিলাম—যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহরে গেছি, মাত্র এক রাতের জন্য থাকব সেখানে, পরদিন সকালে অন্য কোথাও যেতে হবে। রাত্তিরটা কী করে কাটাই ভাবতেভাবতে পথে বেরিয়ে পড়েছি। ওই সব জায়গায় সন্ধের পর বেশ নিঝুম হয়ে যায়, কোনও জীবন থাকে না। কোথায় যাই ভাবতে-ভাবতে একটা লোককে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কাছাকাছি কোনও নদী আছে? সে বলল, হ্যা—এই তো এইখান দিয়ে হেঁটে যাও, একটু এগোলেই নদী পাবে। তা ভালোই। জিগ্যেস করলাম, নদীর কী নাম? সে বলল, ড্যানিয়ুব। শুনেই রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। সেই ড্যানিয়ুব! ইতিহাস-বিখ্যাত নদী! সেই বিখ্যাত গান ‘ব্লু ড্যানিয়ুব’ যাকে নিয়ে হয়েছে, সেই নদী? এত কাছে?

সিংভূমের কাছে কারো নামে একটা নদী আছে। ভারী সুন্দর। তখন প্রচুর জল থাকত। একটা নিবিড় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সেটা বয়ে গেছে। সারাণ্ডার জঙ্গল। এই জঙ্গলটার একটা গাম্ভীর্য আছে। গাছগুলো অনেক লম্বা লম্বা, মনে হয় অনেক পুরনো, ভেতরে ঢুকলে বেশ রোমাঞ্চ হয়। সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কারো নদীটা এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে। বেশ মনে হয় যেন কয়েক হাজার বছর ধরে একই রকম আছে জায়গাটা। এরকম আদিম অরণ্য আর দেখেছি আন্দামানের কয়েকটা দ্বীপে। ঝিনুক-মুক্তো দিয়ে গয়না-টয়না বানানোর ব্যাবসা ছিল আন্দামানের এক ভদ্রলোকের। তাদের একটা ছোট জাহাজ ছিল। ওদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে এরকম কয়েকটা দ্বীপে আমি গিয়েছিলাম। এখানকার জঙ্গলগুলোর একটা মজার ব্যাপার হল কোনও হিস্রে জন্তু-জানোয়ারের ভয় নেই। কোথাও কোথাও কিছু হাতি আছে। সেগুলো একসময় পোষা হাতি ছিল। রায় কোম্পানি নামে একটা টিম্বার কোম্পানি জঙ্গল থেকে কাঠ টেনে আনার জন্য বেশ কটা হাতি ওখানে নিয়ে যায়। কিন্তু একসময় ব্যাবসাতে ফেন্স পড়ে। অতগুলো হাতির খরচ চালানোও তো চাট্টিখানি কথা নয়। তখন ওরা হাতিগুলোকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়। তাদেরই কোনও-কোনওটাকে এখনও দেখা যায়।

হাতির প্রসঙ্গে বলি, উত্তরবঙ্গে লঙ্কাপাড়া টি-এস্টেটে একবার দেখেছিলাম একটা মাতাল হাতি। ওখানে মদেসিয়াদের বস্তিগুলোতে যেখানে মদ চোলাই হয়। গন্ধ পেয়ে হাতিরা সেখানে হাজির হয়। কোনও বাধাই মানে না, ঘরের বেড়া-টেড়া ভেঙে গুঁড় নামিয়ে দিয়ে চোর্চো করে মদ খেতে থাকে। তাতে বেশ নেশা হয়ে যায়। আমরা লঙ্কাপাড়ায় গিয়ে শুনতে পাচ্ছি ভারী একটা চেঁচামেচি হচ্ছে। তখন দেখি একটা হাতি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তুলছে আর চারপাশ থেকে যে-যা পারছে তাই দিয়ে পেটাচ্ছে হাতিটাকে। হাতিটার নড়ারও শক্তি নেই। নেশা হয়ে গেছে।

বহুবার এমন হয়েছে, বাস বা জিপ দাঁড়িয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর। একপাল হাতি রাস্তা পেরোচ্ছে। যেমন দেখেছি কেনিয়ায়। জেব্রা রাস্তা পেরোচ্ছে বলে গাড়িঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও জেব্রা দিয়ে গাড়িও টানত। যদিও এখন তা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। জেব্রার মাংসও খায়। কেনিয়ার কোনও কোনও বারে মদের সঙ্গে মাংসের চাট হিসেবে পাওয়া যায় জেব্রা বা জিরাফের মাংস।

নাইরোবি থেকে একটা ছোট এরোপ্লেনে করে যাচ্ছি কেনিয়ার মাসাইমারা ন্যাশনাল পার্কে। ছোট্ট প্লেনটিতে মাত্র যোলো-সতেরো জনের জায়গা হয়েছে। মাসাইমারায় পৌঁছে প্লেনটা আর কিছুতেই নামতে পারে না। সেখানে অল্প একটু জায়গা পরিষ্কার করে সরু ফিতের মতো একটা এয়ারস্ট্রিপ তৈরি করা হয়েছে। দেখি সেই এয়ারস্ট্রিপের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে দুটো বিশাল হাতি!

এয়ারস্ট্রিপের কাছে কিছু লোক পটকা-টটকা ফাটিয়ে সেগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করল। হাতিগুলো খুব যে ভয় পেল তা নয়। একটু বিরক্ত হয়ে কয়েক পা মাত্র সরে দাঁড়াল। তারপর নামল প্লেন। মাসাইমারা ন্যাশনাল পার্কে থাকার জায়গা হল জঙ্গলের মধ্যে এক একটা তাঁবু। তাঁবুগুলো একটা থেকে আরেকটা বেশ দূরে-দূরে, আর এমনভাবে সাজানো, কোনওটা থেকেই কোনওটাকে দেখা যায় না, মনে হয় জঙ্গলের মধ্যে একা আছি। ট্যুরিজমটা ওসব দেশে বেশ উন্নত। কোনও কোনও দেশ গোটা ট্যুরিজম দপ্তরের ভার দিয়ে দিয়েছে বিদেশি কোনও সংস্থাকে। এই মাসাইমারাও চালায় একটা সুইস কোম্পানি। নিশ্চয়ই গভর্নমেন্ট কিছু লভ্যাংশ পায় এর থেকে। এইসব তাঁবুতে থাকলে এত জন্তুজানোয়ারের ডাক, তাদের চলাফেরার আওয়াজ চারদিক থেকে আসতে থাকে যে রাতে ঘুম-টুম মাথায় উঠে যায়। মাসাই গার্ড আছে। সশস্ত্র। তাদের সাহায্যে রাত্রে চলাফেরা করতে হয়। একা বেরনো যায় না। খাওয়ার জন্য স্বতন্ত্র একটা তাঁবুতে সবাইকে যেতে হত। এরকম এক রাত্রে খেয়ে দেয়ে নিজের তাঁবুতে ফিরছি, হঠাৎ দেখি আমার তাঁবুর সামনে কী একটা জন্তুর চোখ জ্বল জ্বল করছে। ভাবছি এটা আবার কী রে বাবা! মাসাই গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই, ওরা ভাষা বোঝে না। ওকে দেখলাম টর্চের আলো ফেলছে জন্তুটার চোখে। মস্ত বড় চেহারা দেখে একসময় ভাবলাম গণ্ডার নাকি। পরে জানা গেল ওটা গণ্ডার নয়, জলহস্তী। বিশাল চেহারা। কাছেই জলা জায়গা আছে। সেখান থেকে রাত্রে উঠে এসেছে। মাসাই গার্ডরা জানে কীভাবে এদের মোকাবিলা করতে হয়। তার চোখে বার বার টর্চের আলো জ্বালিয়ে নিভিয়ে বিরক্ত করে ওটাকে তাড়িয়ে দেওয়া হল।

পরদিন ম্যানেজারকে এই ঘটনার কথা জানাতে, তিনি আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, জলহস্তীকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিরীহ প্রাণী, কিচ্ছু করে না। আদৌ মাংসাশী নয়। তবে একেবারে মুখের সামনে পড়ে গেলে একটু কামড়ে দেয়। আর কামড়ে দিলেই মানুষ দুখণ্ড হয়ে যায়। বলাই বাহুল্য। বিরাট বড় মুখ তো!
 
Back
Top