পলাশির যুদ্ধের সাত-সতেরো

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
411
Messages
5,992
Reaction score
2,710
Points
3,913
Age
40
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
পলাশির যুদ্ধের সাত-সতেরো

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব আলীবর্দি খান মারা যান। এরপর তাঁর পৌত্র সিরাজ-উদ- দৌলা বাংলার সিংহাসন আরোহন করেন।
সিংহাসন আরোহনের কিছুদিনের মধ্যেই ইংরেজদের সাথে তাঁর বিরোধ বাঁধে, যার চূড়ান্ত পরিনতি হল ১৭৫৭ সালের, ২৩ শে জুন পলাশির যুদ্ধ।

এই যুদ্ধের পটভূমি বিশ্লেষণ করলেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের কারণগুলি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন বর্তমান নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত পলাশীর প্রান্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং বাংলার নবাব সিরাজ উদ্ দৌলার মধ্যে সংঘটিত হয় পলাশীর যুদ্ধ।

এ যুদ্ধ প্রায় আট ঘণ্টার মতো স্থায়ী ছিল এবং প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার কারলে বাংলার নবাব কোম্পানি কর্তৃক পরাজিত হন।

এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক ।
এর ফলে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলাকে কেন্দ্র করেই ক্রমান্বয়ে সমগ্ৰ ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তার করে পরবর্তীতে তারা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রায় সমগ্ৰ ভারতবর্ষ গ্রাস করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এশিয়ার অন্যান্য অনেক অংশও ভারতীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
২৩শে জুন ১৭৫৭ সাল। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিনটি অন্যসব দিনের চেয়ে ছিল কিছুটা আলাদা। ২৬৮বছর আগে এদিনে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার- উড়িষ্যাসহ পুরো উপমহাদেশের স্বাধীনতার কবর রচিত হয়েছিল।

বাংলার নবাব আলীবর্দী খান মারা যান ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৯ এপ্রিল। নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ই এপ্রিল বাংলার মসনদে আরোহণ করেন নবাব আলীবর্দী খান এর কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা।

সিরাজউদ্দৌলার বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই নবাব দেখেন চারিদিকে দেশীয় বণিক, বিশ্বাসঘাতক ও ইংরেজ বেনিয়াদের চক্রান্ত।

যার পরিণতিতে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাস্ত হন। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নদিয়া জেলার পলাশীর প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ চক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রীদের শিকার ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার বিশ্বস্ত সেনাপতি বকসী মীরমদন, প্রধান আমাত্য মোহনলাল কাশ্মিরী ও নবে সিং হাজারী।

কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগৎ শেঠ, মীরজাফর, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ বা আমির চন্দ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ, ঘসেটি বেগমের ক্ষমতার লোভ।

রাজা রাজবল্লভ, মহারাজ নন্দকুমার, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, রানী ভবানী প্রমুখের কৌশলী চক্রও এর পেছনে প্রচ্ছন্ন ছিল।
ইতিহাসবিদ ব্রিজেন গুপ্ত যুক্তি সহকারে ঐতিহাসিক হিলের মত খণ্ডন করে বলেছেন, নবাবের ‘অহমিকাবোধ' এবং ‘অর্থলোভ' নয়, ঐশ্বর্য ও ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার মোহে মত্ত ইংরেজরাই পলাশির যুদ্ধের জন্য দায়ী।

২৩ জুন, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা ও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক বহু ঘটনাবহুল যুদ্ধ বাধে ।
এতে নবাব বাহিনীর পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার।

যুদ্ধের ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও তার অনুসারী প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্য নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
ফলে যুদ্ধে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেবাদাসদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদ এদেশ থেকে ইংল্যান্ডে পাচার করে। বাংলা থেকে লুটকৃত পুঁজির সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এককালের প্রাচ্যের স্বর্গ সোনার বাংলা পরিণত হয় শ্মশান বাংলায়, ।

এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। পলাশীর যুদ্ধের এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুঁজিপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে।

ইংরেজও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়। ফলে দেশীয় কৃষ্টি- সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে।

বিখ্যাত পর্তুগিজ ঐতিহাসিক বাকসার পলাশীর যুদ্ধকে গুরুত্বের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা যুদ্ধগুলোর অন্যতম মনে করেন।
বহু কারনের সমষ্টিগত ফলস্বরূপ ইংরেজরা নবাবকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদের পথে অগ্রসর হয়।
সিরাজও তার বাহিনী নিয়ে পলাশীর পথে অগ্রসর হন। ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজদের বাহিনীর তুলনায় নবাবের বাহিনীর আকার অনেক বড় হলেও মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভের অধীনস্থ প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সৈন্য নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে।

মীর মর্দান, মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নবে সিং হাজারীর নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা এবং ফরাসী সৈনিকদের একটি দল যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
যুদ্ধ চলাকালে বৃষ্টিতে নবাব এবং ফরাসীদের কামানের গোলায় ব্যবহৃত গানপাউডার ভিজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজরা তাদের গান পাউডার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়।

জানা যায়, ক্লাইভ দিনে যুদ্ধ চালিয়ে রাতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলার আঘাতে মীরমদন নিহত হলে নবাব ভেঙে পড়েন এবং মীর জাফরের কাছে পরামর্শ চান। মীরজাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করে পরবর্তী দিনে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ করার পরামর্শ দেন।

মোহনলালের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নবাব যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন। নবাবের সৈন্যরা পিছু হটে আসে। মীরজাফরের বার্তা পেয়ে ইংরেজরা নবাবের অপ্রস্তুত বাহিনীর ওপর হামলা চালায় এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে।

ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতা হারায়। প্রতি বছর সে জন্য ২৩ জুন পলাশী দিবস হিসাবে পালিত হয়। ১৭৫৭ সালের এইদিনে পলাশী প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ চক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়।

বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ফলাফল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এর ফলে কেবল বাংলা বা ভারতবর্ষ নয় বরং পুরো পৃথিবীর ইতিহাসই প্রভাবিত হয়েছে,

যা হয়তো লর্ড ক্লাইভ বা মীর জাফরও কোনদিনও ভাবতে পারেনি।আসলে পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার দুয়ার খুলে যায়। পুরো বিশ্ব রাজনীতিতেই এযুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল।

1. পলাশীর যুদ্ধের ফলে ১৭৫৭ সালে বাংলায় বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্বে ভারতবর্ষ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখত।
আর এর অর্ধেকই আসত বাংলা থেকে অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতির ১২.৫ শতাংশ আসত বাংলা থেকে। সেসময় ব্রিটিশরা বিশ্ব অর্থনীতির মাত্র ২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত।

আর ব্রিটিশরা যখন ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায় তখন বিশ্বে ভারতীয় অর্থনীতি ছিল মাত্র ২ শতাংশ আর বৃটিশরা এসময় বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ বলে বিবেচিত হতো।

এথেকেই বোঝা যায় কী বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাংলা ও ভারতবর্ষ থেকে লুট হয়েছে।পলাশীর যুদ্ধ বিজয়ের পর লর্ড ক্লাইভের সময়ে বাংলার বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার হয়ে যায়।

এমনকি এসময় এত পরিমাণ সম্পদ বৃটেনে পাচার হতো যে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরে ৪ মাসের জাহাজ জট সৃষ্টি হতো, আর পুরো ভারতের কী বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুট হয়েছে তা সহজেই বোঝা যায় ।

2. আর এখন ঐতিহাসিক কালপর্বে চিন্তা করলেও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এর ফলেই ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। এর সাথে জন্ম নেয় কাশ্মীর সমস্যা ।

3. অপরদিকে ভারত একটি বিশাল আয়তন ও অর্থনীতির অধিকারী হওয়ায় এবিশাল সামরিক ব্যয় বহন করতে তেমন চাপের সৃষ্টি হয় না। (দেশ তার বাজেটের তারপরও ৩ শতাংশের মতো অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করে থাকে।) তবে ভারতও তাদের শ্রেণিবৈষম্যের কারণে প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি। তারপরও আমাদের দেশটি ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে পেছনে ফেলেছে কিন্তু তা করতে ভারতের প্রায় অনেকটাই সময় লেগে গিয়েছে ।
এথেকে বোঝা যায় যে, বৃটিশ শোষণ ও এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাঙন না ঘটলে দেশগুলো আরও এগিয়ে থাকত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি ভারতে বৃটিশরা শাসন না করত তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতো ১৭ শতাংশের মতো যা বর্তমানে গড়ে ৭ শতাংশের মতো। কিন্তু এখনও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের বিশাল যুব সমাজের কারণে অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ ( দেশ তিনটির জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ লোকই যুবক)।

4. আবার সমসাময়িক সময়ে (১৭৫০ সালের দিকে) বৃটিশরা আমেরিকাতেও তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

আবার একই সময়ে বাংলায় বৃটিশরা পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর ব্যাপক লুটপাট চালায় সুতরাং এধারণা অমূলক নয় বাংলা থেকে লুট হয়ে যাওয়া বিপুল সম্পদের একটা বড় অংশ আমেরিকার এই উন্নতিতে সহায়তা করেছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে বৃটিশরা করের বোঝা বাড়িয়ে দিলে আমেরিকা নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
সুতরাং আমেরিকার উন্নতিতে বাংলা শোষণের পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

5. ১৭৭০ সালের দিকে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটে, যা ইতিহাসে ছিয়াত্তোরের মন্বন্তর নামে খ্যাত। এর ফলে বাংলার এক- তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। ১৭৫৭ সালের দিকে সমগ্র বাংলার জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটির মতো যা এই সময়ে কমে ২ কোটি হয়ে যায়। বাংলার জনশক্তিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
6. এরপর ব্রিটিশরা বাংলা ও ভারতবর্ষে তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর চীনে আফিম রপ্তানি শুরু করে। এতে চীনারা আফিমে বুম হয়ে যায় যা তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক অবনতি ঘটায়, কেননা এর ব্যায় নির্বাহের জন্য তাদের ব্যাপক অর্থ ব্যয় করতে হতো এবং এর ফলে তাদের লজ্জাজনক ১০০ (১৮০০-১৯০০) বছরের সূচনা হয়।

বৃটিশরা এই আফিম ভারতীয়দের দিয়ে উৎপাদন করত।স্বভাবতই এসময় বৃটিশ ও চীনাদের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হয় যা ইতিহাসে আফিমের যুদ্ধ নামে খ্যাত। আবার এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বৃটিশ সৈনিকরা ছিল ভারতীয়। এর ফলে চীনের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয় এবং চীনারা এসময়ে বিশ্ব প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায়, অবশ্য তাদের বৈদেশিক ব্যবসা বিমুখতাও এর জন্য কিছুটা দায়ী।

7. এসময় ভারতে ব্রিটিশরা ব্যাপক হারে স্কুল- কলেজ গড়ে তোলে যদিও ভারতকে শোষণ করার জন্য তারা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল তারপরও ভারতীয়রা এর দ্বারা উপকৃত হয় এবং পরবর্তীতে এই ভারতীয়রাই বৃটিশদের পতনের কারণ হয়ে দাড়ায়।

এখন ভারতে যদি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠত তাহলে হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে যেত। তবে ধারণা করা হয় যে, যদি ভারতীয়রা নিজেদের সম্পদ নিজেদের কাজে লাগাত তবে জ্ঞান চর্চায় পশ্চিমাদেরও পেছনে ফেলত।
৪. এরপাশাপাশি বৃটেনে এসময় শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল অর্থের যা ভারত থেকে লুট করা সম্পদ দিয়ে যোগান দেয়া হয়। আবার তারা ভারত থেকেই তাদের শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ করত যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো এদেশের কৃষকদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করানো, যদিও এতে ভারতের উভমুখী ক্ষতি হয় কেননা শিল্প বিপ্লবের ফলে ভারতের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়(বৃটেনে উদ্ভাবিত বস্ত্র কলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভারতীয়দের ২০০ জনের সমান পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হতো) তবে এর ফলে বৃটেন বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং বৃটেন এর ফলে ইউরোপ তথা পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র।

এসময় ব্রিটেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী স্থল ও নৌবাহিনী গঠন করে এবং বিশ্বব্যাপী ব্রিটেন তার এই প্রভূত ক্ষমতার প্রদর্শন দেখায়।১৮০০-১৯০০ সালের মধ্যে ব্রিটেন ও রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এসময় বৃটিশরা রাশিয়ার পূর্বাংশের একটি বড় অংশ দখল করে নেয় এবং বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে রাশিয়া বৃটিশদের পরাজিত করে।এর ফলে রাশিয়াকে তখন আলাস্কা বিক্রি করে দিতে হয় যা এখন আমেরিকাকে বর্তমানে কৌশলগতভাবে সহায়তা প্রদান করছে।

9. আবার আমেরিকা ১৮০০ সালের দিকে তার সাম্রাজ্য বিস্তারের সিদ্ধান্ত নেয়। এসময় আমেরিকা একটি ক্ষুদ্র সাম্রাজ্য ছিল এবং কানাডা দখল করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর কানাডা ছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। বৃটেনের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে আমেরিকাকে উল্টো বৃটেন দখল করে নেয়।
আফ্রিকা ও ভারত থেকে পাচার করে আনা বিপুল সম্পদের ফলেই কানাডায় এই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে আমেরিকাকে কানাডার পরিবর্তে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হতে হয় এবং এর ফলে আমেরিকা অধিকতর লাভবান হয়।

কেননা এঅংশ ছিল খনিজ ও কৃষিতে সমৃদ্ধ যা পরবর্তীতে আমেরিকার শিল্প বিপ্লবে সহায়তা করেছিল। এর ফলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আসে। এজন্য আমেরিকা তার পার্শ্ববর্তী স্পেনিশ, ফ্রেন্স,রেড ইণ্ডিয়ান ও মেক্সিকানদের ভূমি দখল করে যা ছিল আমেরিকার জন্য আর্শীবাদ স্বরূপ এবং বর্তমান মানচিত্রে এসে পৌছায়। (ব্রিটিশদের ভারত শোষণের পরোক্ষ প্রভাব)

10.ব্রিটিশদের ভারত শাসনের ফলে গ্রেট গেমের ও বাফার রাষ্ট্রের ধারণা সৃষ্টি হয় ,যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে। যেমন ব্রিটিশ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আফগানিস্তান বাফার রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করত।

পরিশেষে বলা যায় পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজরা এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারার প্রসার ঘটাতে শুরু করে। 'আইনের শাসনে'র ধারণার প্রবর্তন করে। ফলে ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতায় নবজাগরণ ঘটে। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বলেছেন, 'On 23rd June, 1757, the middle ages of India ended and her modern age began.
 
Back
Top