- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 443
- Messages
- 6,964
- Reaction score
- 4,918
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
মতি মিয়ার রাতের হোটেল
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)
পর্ব - ১
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে।
কিন্তু বড় সড়কের ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশ ঘেঁষে তখন জ্বলে উঠেছে মিয়ার ভাসমান হোটেলের আলো।
দুইটা সাদা পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে, তার চারপাশে ধোঁয়ার কুন্ডলি আর মানুষের ভিড়। গরম খিচুড়ি ভুনা আর খাসির মাংসের ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
মতি মিয়ার রাতের হোটেল—আট-দশটা সাধারণ ফুটপাথের হোটেলের মতো নয়।
এই হোটেলে নেই তেল চিটচিটে বেঞ্চ, নেই ময়লা চামচ-থালা।
সব পরিষ্কার পরিছন্ন ঝকঝকে।
পরিচ্ছন্নতা, খাবারের মান ও স্বাদই এই হোটেলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার!
রাত ঠিক দশটায় খোলে এই হোটেল, বন্ধ হয় ভোর পাঁচটায়।
যখন শহরের অন্য দোকান-পাটের কপাট নামতে থাকে,
ঠিক তখনই মতির ভ্যানে জ্বলে ওঠে আলো।
ধোঁয়া ওঠা হাঁড়িতে থাকে খিচুড়ি, ঝাঁঝালো ভুনা মাংস, কিংবা গরম ভাতের সাথে হাস-মুরগির ঝোল।
কাস্টমার কারা?
রাতভর ছুটে চলা ট্রাক-বাসের ড্রাইভার, হেলপার, আর রাস্তায় থাকা ক্লান্ত মানুষগুলো।
যাদের কেউ কেউ গভীর রাত কিংবা ভোর হতেই রওনা দেবে অন্য কোনো শহরের দিকে।
কেউ কেউ এখানে খুঁজে রাতটা কাটানোর একটা কোনা।
আর মতি—চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে হাসি রেখে, নিজ হাতে তুলে দেয় খাবারের প্লেট।
প্রতিটি প্লেটের দাম মাত্র ৮০ টাকা।
কিন্তু যারা তাও দিতে পারে না, তাদের জন্য একই খাবার ২০ টাকায়।
স্পেশাল ডিসকাউন্ট,
আর অনেকে প্রতিদিনই খায় একদম বিনা পয়সায়
এটা শুধুমাত্র নিতান্ত অভাবী দুস্থ মানুষের জন্য।
মতি মনে করে, এই গরিব-ভাসমান মানুষগুলোর মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়াটাও তার দায়িত্ব।
এই দায়বোধ থেকেই যেন তার হোটেলের ব্যবসায় আসে এক অদৃশ্য বরকত।
এই হোটেল শুরু হয়েছিল মাত্র এক ঠেলা ভ্যান দিয়ে।
তখন কর্মচারী ছিল মাত্র একজন।
এখন?
দুইটি পিকআপ ভ্যান, দশজন কর্মচারী, আর প্রতি রাতের আয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা।
কিন্তু টাকা নয়—মতির কাছে সবচেয়ে বড় লাভ,
মানুষের মুখের তৃপ্ত হাসি, আর সেই গভীর রাতের “চাচা, একটা খিচুড়ি দিবেন?” ডাক।
---
এই মতি মিয়া একসময় ছিলো একদম ভিন্ন মানুষ।
পড়াশোনায় খুব ভালো,
গ্রামের সেরা ছাত্রদের একজন। তার গায়ে পড়ার প্রতি তীব্র টান ছিল, আর অঙ্ক, পদার্থবিজ্ঞান এসব বিষয়ে তার প্রশ্ন স্যাররাও মাঝে মাঝে ছেলেটার ব্যাখ্যায় বিস্মিত হতেন।
মায়ের মুখে কথা ছিল, “মতি একদিন অনেক বড় হবে, আমাদের দুঃখ মুছে যাবে।”
বাবা খেতমজুর, কিন্তু ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে কখনো কার্পণ্য করেননি।
এসএসসি-তে যখন মতির ফল প্রকাশ হয়, পুরো গ্রামে ছোট খুশির ঝড় বয়ে যায়। জিপিএ-৫ পাওয়া ছেলেটার ছবি প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়। যেন গ্রামের ঘোলা পুকুরে একটা উজ্জ্বল পদ্ম ফোটে।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না।
ইন্টারমিডিয়েটের সময় এক মেয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল মতি।
নাম—রিফা
চোখে চোখ পড়লেই মনের ভাষা বুঝে ফেলে এমন একটা মেয়ে।
ছোট চোখ, গম রঙা গাল, আর মিষ্টি হাসি।
সেই হাসিতে হারিয়ে গিয়ে, নিজের পথ ভুলে ফেলেছিল সে।
রিফার সাথে প্রথমে ক্লাসে দেখা, তারপর কথা, তারপর প্রতিদিনের দেখা।
কেউ কাউকে কিছু বলেনি, কিন্তু পুরো কলেজ জানতো—মতি আর রিফা একে অপরের ছায়া।
জীবন তখনো সহজ ছিল, কিন্তু প্রেম কখনো সহজ থাকে না।
রিফার পরিবার যখন জানতে পারে মতি ‘কৃষকের ছেলে’, তখন আকাশ ভেঙে পড়ে মাথার উপর। হটাৎ একদিন রিফার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়
মতি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কলেজে যাওয়া বন্ধ, বইয়ের পাতা অন্ধকার হয়ে ওঠে।
মতির প্রেমটা একপাক্ষিক ছিলোনা,দুজনেই চেয়েছিল একসাথে থাকবে।
কিন্তু মেয়েটির পরিবার অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয় তাকে।
মতির হৃদয় ভেঙে যায়, মন ভেঙে পড়ে, আর তারসাথে ছিন্নভিন্ন হয় স্বপ্নগুলো।
কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বইয়ে চোখ রাখলেও মন থাকতো না।
দিন দিন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে সে।
বন্ধুরা দূরে সরে যায়, আত্মীয়রা আফসোস করে—
“মতি তো ভালো ছেলে ছিল রে, কী হইল তার?”
একদিন সকালে, মায়ের শুকনো মলিন মুখটা দেখে মতির ভেতরটা নাড়া দিয়ে ওঠে,
মায়ের অসহায় চাহনি তার ভেতরে এক অদৃশ্য বার্তা দেয়,
“না, আমি হারব না। আমি কামব্যাক করব।”
আমি আমার জন্য না হলে ও আমার পরিবারের জন্য বাঁচবো, এবং ভালোভাবে বাঁচবো এই শপথ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়!
রিফার স্মৃতি ভুলে যেতে এবং জীবনের দ্রুত মোড় ঘোরানোর উদ্দেশ্য একরাতে মতি চুপচাপ এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
একমাত্র মা ছাড়া আর কাউকে কিছু না জানিয়ে!
শুরু হয় অনিশ্চয়তার এক নতুন অধ্যায়, যেখানে মতি শুধু বাঁচতে চায়, আর ভুলে যেতে চায় সেই আলোঝলমলে দিনগুলিকে, যে দিনগুলোর কথা মনে হলে বুকের ভিতর কাঁটা বিঁধে।
কিন্তু সে জানে, একদিন আবার ফিরে দাঁড়াতে হবে—ভুলে যাওয়া আলোটা একদিন নিজের হাতেই জ্বালাবে।