- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 443
- Messages
- 6,933
- Reaction score
- 4,861
- Points
- 4,013
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
কুটু মিয়া
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
পর্ব - ১
আলাউদ্দিন কুটু মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু মানুষ আছে যাদের ওপর চোখ পড়লে দৃষ্টি আটকে যায়। কুটু মিয়া সে-রকম একজন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে মানুষ না, পুরনো আমলের বাড়ির খাম্বা দাঁড়িয়ে আছে। খাম্বার মতো পুরো শরীরটার ভিতর গেল ভাব আছে। তেলতেল মুখ, চকচক করছে। গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। সাধারণত কালো মানুষের মাথা ভর্তি চুল থাকে। কুটু মিয়ার মাথায় খাবলা খাবলা চুল। কোনো বিচিত্র চর্ম রোগে মাথার চুল জায়গায় জায়গায় উঠে চকচকে তালু দেখা যাচ্ছে। লোকটার চোখ অতিরিক্ত ছোট বলে চোখের সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে না। চোখের কালো মণি গায়ের কালো চামড়ার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে হঠাৎ দেখলে মনে হয় লোকটার চোখ নেই। তারচেয়েও বড় সমস্য! একটা চোখ প্রায় বন্ধ।
আলাউদ্দিন পরিষ্কার শুনেছেন লোকটার নাম কুটু মিয়া। তারপরেও জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নামটা যেন কী? কথা খুঁজে না পেলে মানুষজন এই কাজটা করে একটা কথা নিয়ে পেঁচাতে থাকে।
স্যার, আমার নাম কুটু মিয়া।
আলাউদ্দিন বললেন, ও আচ্ছা, কুটু মিয়া নাম।
আলাউদ্দিন দ্রুত চিন্তা করছেন আর কী জিজ্ঞেস করা যায়। কোনো কথাই মনে আসছে না। লোকটার গা থেকে বাসি বাসি গন্ধ আসছে। কেমন টক টক গা গোলানো গন্ধ। কুটু মিয়া দুপা সামনে এগিয়ে এসে বলল, স্যার আপনের বাবুর্চি দরকার। আমি বাবুর্চির কাজ জানি।
কুটু মিয়া তার ফতুয়ার পকেট থেকে কাগজ বের করে এগিয়ে দিল। আলাউদ্দিন কাগজটা হাতে নিলেন। একটা টাইপ করা প্রশংসাপত্র। কাগজটা। লেমিনেট করা। বোঝাই যাচ্ছে খুবই যত্নে রাখা কাগজ।
প্রশংসাপত্র কে দিয়েছেন?
পাইলট স্যার দিয়েছেন। উনার বাড়িতে দুই বছর সার্ভিস করেছি। একটু পইড়া দেখেন।
আলাউদ্দিন প্রশংসাপত্রে চোখ বুলালেন। ইংরেজিতে যে কথাগুলি লেখা তার সারম— কুটু মিয়ার রাধার হাত অসাধারণ। রন্ধন বিদ্যায় সে একজন কুশলী। যাদুকর। বাবুর্চি হিসেবে তাকে পাওয়া বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি তার সাফল্য কামনা করি।
আলাউদ্দিন বললেন, তুমি কী রান্না জানো?
কুটু মিয়া হাসি মুখে বলল, সব কিছু অল্প বিস্তর জানি। ইংলিশ, বেঙ্গলি, চাইনিজ, থাই।
তোমার কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে তুমি হোটেল রেস্টুরেন্টের প্রফেশনাল বাবুর্চি। আমার সে-রকম দরকার নেই। আমার কাজের লোক টাইপ একজন দরকার। ঘর ঝাট দিবে, বাথরুম পরিষ্কার করবে। রান্নাবান্না করবে, বাজার করবে।
আমি ঘরের কাজও জানি।
বেতন কত দিতে হবে?
আপনার দিলে যা চায় দিবেন। আমার কোনো দাবি নাই।
আলাউদ্দিন ধাধার মধ্যে পড়ে গেলেন। একটা কাজের লোকের তার খুবই প্রয়োজন। গত পনেরো দিনে তিনটা কাজের লোক চলে গেছে। সর্বশেষটির নাম জিতু মিয়া। সে খালি হাতে যায় নি। তিন ব্যান্ডের একটা দামি রেডিও এবং রাইস কুকারটা নিয়ে চলে গেছে। রাইস কুকার মাত্র গত মাসে কেনা হয়েছে। তার জন্য খুবই কাজের একটা জিনিস। এক পট চাল আধা পট পানি দিয়ে সুইচ অন করে দেন। ভাত হয়ে গরম থাকে। খেতে বসার আগে আগে একটা ডিম ভেজে নেয়া। এখন তিনি প্রায় অচল। দুই বেলা হোটেল খেকে খেয়ে আসতে হচ্ছে। হোটেলের বাবার এক দুই বেলা ভালো লাগে, তারপর আর মুখে দেয়া যায় না। গতকাল গোসল করতে পারেন নি। টংকে পানি ছিল না। কাজের একটা ছেলে থাকলে দুবালতি পানি নিয়ে আসত।
কুটু মিয়া নামের যে লোক সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে যত ভালো বাবুর্চিই হোক তাকে রাখা যাবে না। অত্যন্ত বলশালী মধ্যবয়স্ক একজন লোক মর ঝাট দিচ্ছে, কাপড় ধুচ্ছে— এটা মানায় না। তাছাড়া লোকটার চোখ দেখা যাচ্ছে না। চোখের দিকে তাকালেই অস্বস্তি বোধ হয়। এ রকম মানুষ আশেপাশে থাকলে সব সময় খুব সুক্ষ্ম টেনশান কাজ করবে। আলাউদ্দিন টেনশানবিহীন জীবন চাচ্ছেন।
তুমি চলে যাও, তোমাকে রাখব না— এ ধরনের কথা মুখের ওপর বলা মুশকিল। আলাউদ্দিন চিন্তা করতে লাগলেন বুদ্ধি খাটিয়ে একে বিদায় করা যায়। কি-না। সাপ মরবে কিন্তু লাঠি ভাঙবে না— এ রকম কিছু। বুদ্ধিটাই মাথায় আসছে না।
কুটু মিয়া!
জ্বি স্যার।
আমি দরিদ্র মানুষ। কলেজে মাস্টারি করতাম, এখন রিটায়ার করেছি। একা বাস করি তারপরেও সংসার চলে না। আগে যে কাজের ছেলেটা ছিল তাকে মাসে তিনশ টাকা দিতাম। তিনশ টাকায় নিশ্চয় তোমার চলবে না। তিনশ টাকার বেশি দেয়া আমার সম্ভব না।
কুটু মিয়া শান্ত গলায় বলল, স্যার আপনাকে তো বলেছি। যা আপনার দিল চায় তাই দিবেন।
তুমি থাকবে তিনশ টাকায়?
জি।
আলাউদ্দিন ইতস্তত করে বললেন, আসল কথা বলতে ভুলে গেছি। দেশের বাড়ি থেকে একটা কাজের ছেলের আসার কথা। সে এলে তোমাকে চলে যেতে হবে।
কবে আসবে?
এটা তো জানি না। কাল পরশু আসতে পারে। আবার দুই একদিন দেরিও হতে পারে। মোট কথা তোমার চাকরি টেম্পরারি। বুঝতে পারছ?
জ্বি।
রান্নাঘরের পাশে একটা ঘর আছে। সেই ঘরে থাকবে। ফ্যান নেই, গরমে কষ্ট হবে। আমার এখানে থাকতে হলে কষ্ট করতে হবে। মাঝে মাঝে পানি থাকে না, তখন রাস্তার কল থেকে পানি আনতে হবে। অনেক কষ্ট। পারবে কিনা ভেবে দেখ।
পারব স্যার।
যদি পার তাহলে তো ঠিকই আছে। যাও তোমার জিনিসপত্র নিয়ে চলে আস।
জিনিসপত্র সবই সাথে আছে স্যার।
তাহলে তো ভালোই।
কাজের লোকদের জিনিসপত্র কলাতে একটা ব্যাগ থাকে। তারচেয়ে বেশি কিছু থাকলে একটা পুটলি। কুটু মিয়ার ক্ষেত্রে উল্টোটা দেখা গেল। আলাউদ্দিন ভুরু কুচকে লক্ষ করলেন কুটু বারান্দা থেকে তার জিনিসপত্র আনছে। দুটা বড় স্যুটকেস, একটা হ্যান্ড ব্যাগ। ফলের ঝুড়ির মতো ঝুড়ি। ফ্লাস্ক, পানির বোতল। ছোট্ট চামড়ার একটা ব্যাগও দেখা গেল। দূর থেকে মনে হচ্ছে ক্যামেরার ব্যাগ।
আলাউদ্দিন বললেন, তোমার ঐ ব্যাগে কী? ক্যামেরা না-কি?
কুটু বিনীত গলায় বলল, জ্বি না স্যার। দুরবিন। বিদেশে যখন ছিলাম শখ করে কিনছিলাম।
বিদেশে ছিলে না কি?
জ্বি।
কোথায় ছিলে?
কুইত।
কুইত নামে কোনো বিদেশ আছে বলে তার মনে পড়ল না। কুয়েতকেই কি কুইত বলছে?
কুইতে কী কাজ করতে?
বাবুর্চির কাজ করতাম।
চলে এসেছ কেন?
মালিকের ইন্তেকাল হয়েছে। উনার বড় বিবি থাকতে বলেছিল। মন টিকল না। স্যার, রাতে খানা কয়টার সময় দিব?
আমি দশটা সাড়ে দশটার দিকে খাই। ফ্রিজ খুলে দেখ— একটা মুরগি থাকার কথা। গত পরশু কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম নিজেই রাধব, পরে আর রাধা হয় নি। চাল ডাল আছে। মশলা আছে কিনা জানি না। গাদা খানিক ভাত রান্না করবে না। আমি খুবই অল্প খাই।
জি আচ্ছা।
কিছু পানি ফুটিয়ে রাখবে। পানি ফুটানো হয় না বলে কয়েক দিন ধরে ট্যাপের পানি খাচ্ছি। আরেকটা কথা— কাজকর্ম করবে নিঃশব্দে। আমি লেখালেখি করি। সাড়া শব্দ হলে আমার ডিসটার্ব হয়।
সকালে বেড টি খান?
পেলে খাই তবে বেড় টি-টা জরুরি না। ঐসব বড়লোকী চাল আমার জন্যে। আগেই বলেছি আমি গরীবের সন্তান।
বেড টি কয়টার সময় দিব?
ঘুম ভাঙলে দিবে। আমার ঘুম ভাঙার কোনো ঠিক নেই। কখনো কখনো খুব সকালে উঠি। আবার কোনো দিন নয়টা দশটা বেজে যায়। কত রাতে ঘুমাতে গিয়েছি তার ওপর নির্ভর। ঠিক আছে, এখন সামনে থেকে যাও। কাজ কর্ম করতে দাও।
জি আচ্ছা জনাব, শুকরিয়া।
কুটু মিয়া রান্নাঘরে ঢুকে গেল। আলাউদ্দিন ভুরু কুঁচকে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আসল কথাই কুটুকে জিজ্ঞেস করা হয় নি। তার বাড়ি কোথায়? ঠিকানা কী? কে তাকে এখানে পাঠিয়েছে? হুট করে নতুন কোনো মানুষকে ঘরে ঢুকানো ঠিক না। দিনকাল আগের মতো নেই। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে কাজের মেয়ের হাতে গৃহকর্তী খুন। এইসব খুনখারাবি অবশ্যি টাকা পয়সার কারণে হয়। আলাউদ্দিন সাহেবের একটা বড় সুবিধা তার টাকা পয়সা নেই। ঘরের দামি জিনিসপত্রের মধ্যে আছে একটা পুরনো ফ্রিজ। পুরনো ফ্রিজের জন্য। তাকে কেউ খুন করবে এ রকম মনে হয় না। একটা ১৪ ইঞ্চি টিভি কেনার কথা কয়েকবার ভেবেছেন। তাঁর নিজের জন্য না, ঘরের কাজের লোকের জন্য। যে বাড়িতে টিভি নেই সে বাড়িতে কোনো কাজের লোক থাকে না এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। টিভি এখনো কেনা হয় নি, তবে টিভি কেনার টাকা আলাদা করা আছে।
আলাউদ্দিন নেত্রকোনার শেখ ইসলামুদ্দিন কলেজের ইসলামিক ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন। রিটায়ার করে এখন ঢাকা শহরে স্থায়ী হয়েছেন। আশা ছিল। কোনো কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হবেন। তিনি শুনেছেন কোচিং সেন্টারগুলির রমরমা ব্যবসা। অনেক ছোটাছুটি করেও তিনি কোনো সুবিধা করতে পারেন নি। ভূতের গলিতে একটা ফ্লাটের অর্ধেকটায় তিনি থাকেন। বাকি অর্ধেকটায়। গার্মেন্টস কোম্পানির এক ম্যানেজার থাকে। নাম সাইফুদ্দিন। লোকটা অবিবাহিত। কিন্তু প্রায়ই গভীর রাতে তার ঘর থেকে মেয়ে মানুষের গলা শোনা যায়। ছুটির দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাস খেলা হয়। তাদের আড়া বসলেও কোনো হৈচৈ হয় না। সাইফুদ্দিন লোকটি ভদ্র এবং বিনয়ী। আলাউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হলে খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলে, প্রফেসর সাহেব ডাকে। আলাউদ্দিনও তার ওপর সস্তুষ্ট। কারণ ফ্ল্যাটের অর্ধেক ভাগাভাগিতে রান্নাঘর আলাউদ্দিনের ভাগে পড়েছে। কথা ছিল প্রয়োজনে রান্নাঘর সাইফুদ্দিনও ব্যবহার করবে। সাইফুদ্দিন সেটা কখনো করে নি। সে ইলেকট্রিক চুল কিনে আলাদা রান্নাঘর বানিয়েছে।
আলাউদ্দিন রিটায়ার করছেন ঠিকই, কিন্তু কোনো অর্থেই অবসর জীবন যাপন করছেন না। তিনি এখন পেশাদার লেখক। ছদ্ম নামে বেশ কিছু বইপত্র লিখেছেন। এখনো লিখছেন। তার সমস্ত বই-এর প্রকাশক মুক্তি প্রকাশনার মালিক হাজী একরামুল্লাহ। কখন কোন বই লিখতে হবে, কীভাবে লিখতে হবে হাজী একরামুল্লাহ তা সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। মুক্তি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত আলাউদ্দিনের প্রথম বইটার নাম— সহজ দেশী বিদেশী ও চাইনিজ রান্না। হাজী একরামুল্লাহ পাঁচটা রান্নার বই তাকে দিয়ে বলেছেন, বই দেখে দেখে নিজের মতো করে সাজিয়ে দেন। ভাষাটা যেন সহজ হয়। কচকচানি কম। আলাউদ্দিন তাই করেছেন। একশ পৃষ্ঠার বই চার রঙের প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছে। প্রচ্ছদে একজন তরুণীর ছবি। সে রান্না করছে। তরুণীর পাশে সুদর্শন যুবক। সে পেছন থেকে তরুণীর কোমর জড়িয়ে ধরে তরুণীর মাথার পাশ থেকে নিজের মাথা বের করে অবাক হয়ে রান্না দেখছে। বইটির কয়েকটি বিষয়ে আলাউদ্দিন আপত্তি করেছিলেন। অর্ধনগ্ন তরুণী মূর্তি এবং গোঁফওয়ালা যুবক যেভাবে সেই তরুণীর কোমর ধরে আছে সেটা রান্নার বই-এ মানাচ্ছে না। বই এর দামও তার কাছে ঠিক মনে হয় নি। দেশী বিদেশী ও চাইনিজ রান্না। চাইনিজ রান্না তো বিদেশী রান্নার মধ্যেই পড়ে। আলাদা করে চাইনিজ রান্না বলার দরকার কী?
হাজী একরামুল্লাহ আলাউদ্দিনকে ধমক দিয়ে বলেছেন— তোমার কাজ হলো অন্য বই থেকে সুন্দর করে কপি করা। কপি করবে, পাণ্ডুলিপি জমা দিবে, ক্যাশ টাকা নিয়ে চলে যাবে। প্রচ্ছদ কী হবে, বই-এর নাম কী হবে, লেখকের কোন নাম যাবে এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ক্লিয়ার?
আলাউদ্দিন বিনীত ভঙ্গিতে বলেছেন, ক্লিয়ার।