- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 429
- Messages
- 6,770
- Reaction score
- 4,538
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
দু চাকায় দুনিয়া
মূল লেখকঃ বিমল মুখার্জি
মূল লেখকঃ বিমল মুখার্জি
পর্ব - ১
আজ থেকে ঠিক বাহান্ন বছর আগে মা বাবা ভাই বোন আত্মীয়-বন্ধু ও ঘর-বাড়ি ছেড়ে আরামহীন অনিশ্চিতের পথে বেরিয়ে পড়েছিলাম অজানাকে জানার ও অচেনাকে চেনার জন্য। সারা পৃথিবী ঘোরবার স্বপ্ন যা ছেলেবেলায় ভূগোল পড়বার সঙ্গে সঙ্গে নেশার মতো আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল, ১৯২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর, তার বাস্তব রূপ নেবার পথের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হল। আমার বয়স তখন তেইশ, সঙ্গে তিন বন্ধু— অশোক মুখার্জি, আনন্দ মুখার্জি ও মণীন্দ্র ঘোষ। অশোক মুখার্জি আমাদের দলের নেতা। সাইকেল চারখানা আমাদের বাহন।
যাত্রা শুরু হল কলকাতার টাউন হল থেকে। মহা আড়ম্বরে বিরাট এক জনসভার ব্যবস্থা হয়েছিল। প্রথম ভারতীয় দল ভূপর্যটক হয়ে পথে বেরবে, এই খবরটা বাঙালির মনে সেদিন এক বিপুল উদ্দীপনা ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছিল। যে যেখানে ছিল রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। ইচ্ছা ছিল বোধহয় পর্যটকদের একবার নিজের চোখে দেখা এবং সম্ভব হলে করমর্দন করে তাদের উৎসাহিত করা। বাঙালি ভীতু, কুনো এবং ঘরমুখো এই দুর্নাম ঘোচাবার জন্য চারজন যুবক প্রাণের মায়া সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে সাহসে ভর করে গৃহছাড়া হল, এই কথা সবার প্রাণে আশার বাণী এনেছিল। চিরকাল বিদেশিদের এইরকম সাহসের পরিচয় দিতে দেখে আমরা সবাই তারিফ করে এসেছি— ধন্য ধন্য বলেছি। কিন্তু এ যে বাঙালি তথা প্রথম ভারতীয় দল, এই চিন্তা সবাইকে সেদিন উদ্বুদ্ধ করেছিল একান্তভাবেই।
টাউন হলের বাইরে এসে দেখি সামনে বিরাট জনসমুদ্র।
এসময়টা মনের মধ্যে কয়েকটি কথা বারবার আমাকে উতলা করেছিল। মাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। বিদায়ক্ষণে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। সেই অবস্থায় তাঁকে ছেড়ে চলে এলাম। আমার অতি প্রিয় এবং সাধের কলকাতা ছাড়তেও খুব খারাপ লাগছিল। হাওড়ার দিকে এগোলাম। শত শত সাইকেল এবং মোটরগাড়ি আমাদের আশপাশে পথ করে চলল। গঙ্গার ওপর তখন কাঠের পুলটা পার হবার সময়ে বারবার পিছন ফিরে কলকাতা শহরের দিকে দেখছিলাম, জানি না আবার কখনও দেখা হবে কিনা। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে চলেছি। সূর্য প্রায় অস্তাচলে। অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে যেতে যেমন অসুবিধা তেমনই সময়ও নষ্ট হচ্ছিল। কথাও ছিল বর্ধমানে প্রথম রাত্রি কাটাবার, যেমন প্রত্যেকবার উত্তর-পশ্চিম ভারত ভ্রমণের সময়ে করেছি।সেরা ট্যুর প্যাকেজ
বালিতে বিবেকানন্দ ব্রিজের ওপর দিয়ে একজন প্রফেসর সাইকেলে আসছিলেন দুপুরবেলায় আমাদের জি টি রোডে অভিনন্দন জানাতে। সেদিন এত বেশি গাড়ি, সাইকেল এবং মানুষের ভিড়ে পড়ে তাঁর পথেই মৃত্যু ঘটল— একটা লরি তাঁকে চাপা দিল।
রাত ৯টার সময় পৌঁছলাম চন্দননগরে। দেহে ক্লান্ত ও মনে অবসন্ন বোধ করছিলাম। পথে বালি, উত্তরপাড়া, কোতরং ইত্যাদি জনপদের ভেতর দিয়ে আসবার সময় অনেক অভ্যর্থনা ও ভোজন এবং আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়েছিল মনে পড়ে। চন্দননগরে পৌঁছে আমার এক পূর্ব-পরিচিত বন্ধুর সাদর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম। পরদিন বর্ধমান যাবার কথা ঠিক হল।
অপরিচিত জায়গায় শুয়েছিলাম বলে খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। তখন দেখি বাড়ির চারপাশে ছেলে-মেয়েরা ঘুরছে আমাদের দেখা পাবার আশায়।
প্রথমদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলাম যে মাল বহন করবার ক্ষমতা অতিক্রম করে আমরা সবাই ভুল করেছি। বসবার সিটের পিছনে প্রত্যেকে একটা করে মজবুত স্টিল ট্রাঙ্ক নিয়েছিলাম— সাইকেলের পিছনে সাঁটা। সেটা চাবি বন্ধ করবার ব্যবস্থা ছিল। স্টিল ট্রাঙ্কের ওপর কম্বল ও কাপড়-চোপড় বাঁধা ছিল। কাঁধের ওপর হ্যাভারস্যাকে ভর্তি অফুরন্ত মাল। তাছাড়া বন্দুক-পিস্তলের ওজন তো ছিলই। সাইকেলের ফ্রেমের মধ্যে এক মস্ত ব্যাগ ভর্তি সংসারযাত্রার সব জিনিস— ক্যামেরা, ওষুধপত্র, গুলি, কার্তুজ, জুতোর বুরুশ কী না ছিল! পথেও একদিনেই কত জিনিস উপহার পেলাম তার হিসেব দেওয়া সম্ভব নয়। মহেন্দ্রলাল দত্তর ছাতার দোকানের মালিক ভবানী দত্ত আমার বিশেষ বন্ধু। তার ধারণা হয়েছিল একটা ছাতা থাকলে মরুভূমির দারুণ গরম কম লাগবে। একটা ছাতার ওজনও তখন দুঃসহ লাগছিল।
চা খেয়ে আমরা প্রথমেই ঠিক করলাম যেমন করে সম্ভব বোঝা কমাতে হবে। সব জিনিস একত্র করে দেখলাম জুতোর একটা বুরুশ ও একটা কালির কৌটো চারজনের পক্ষে যথেষ্ট। দাঁত মাজার বুরুশ অবিশ্যি প্রত্যেককে একটা করে রাখতে দেওয়া হল। এমনই ছাঁটাই করতে করতে স্তূপাকার জিনিস ফালতু হয়ে গেল— চারটে স্টিল ট্রাঙ্ক মাল বোঝাই করে চন্দননগরের বাড়িতে ফেলে রেখে বিদায় নিলাম আমরা।
বারোটার সময় আবার শুরু হল জি টি রোড ধরে বর্ধমানের দিকে এগনো। আগের চেয়ে বোঝা অনেক কমলেও তখনও ভারবাহী গাধার অবস্থা। এই অবস্থা থেকে কোনওদিন রেহাই পাইনি। স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়ার যতই চেষ্টা করেছি ততই বোঝা বেড়েছে বই কমেনি।অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন
চন্দননগর থেকে যারা আমাদের সঙ্গে যাচ্ছিল, ৫০ মাইল পথ অতিক্রান্ত হলে তারা সবাই বিদায় নিল একে একে। সবার আগে একজন একটা জরুরি জিনিস আমায় উপহার দিয়েছিল। কয়েকটা ছুঁচ ও নানা রঙের সুতো। এত দরকারি জিনিস কিন্তু আমরা কেউই আগে সঙ্গে নিইনি।
১৯২৬ সালে জি টি রোড অনেক চওড়া ছিল। মোরাম দিয়ে বাঁধানো রাস্তা। দুধারে বড় বড় গাছের ছায়া সারাদিন থাকত। গাছের নিচ দিয়ে গরুর গাড়ির সার দুদিকে চলত। ক্বচিৎ কখনও একটা মোটরগাড়ি দেখেছি। ট্রাকে মাল বহনের রীতি তখনও হয়নি।
বর্ধমানে আমরা ডাঃ গণেশচন্দ্র সরকারের আতিথ্য স্বীকার করলাম।
পরদিন বর্ধমান ছেড়ে কাট্রাসগড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। একজন কয়লার খনির বাঙালি মালিক আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। ক্লান্ত হয়ে যখন আমরা বটকৃষ্ট রায়ের বাড়ি পৌঁছলাম, মনে হল যেন সেখানে মেলা বসেছে। লোকের বিরাট ভিড়। গানবাজনার ব্যবস্থাও আমাদের আনন্দবর্ধনের জন্য। গায়িকা তরুণী কমলা ঝরিয়া। সেই সভায় গান করেছিলেন ‘মিছে মালা গাঁথিয়া আশে বসে থাকা।’ সুরেলা গান। বেশ মিষ্টি লাগল। কিন্তু রাত জেগে গান শোনার আর উৎসাহ ছিল না। বারোটার সময় ভূরিভোজ তখনকার দিনে রেওয়াজ ছিল। আমরা সবার কাছে বিদায় নিয়ে রাত দেড়টার সময় শুতে গেলাম।
এমনিভাবে সর্বত্র আদর-আপ্যায়নের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। মোগল সাম্রাজ্য কায়েমি হবার আগে পাঠান বীর শেরশাহ কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ১৫০০ মাইল লম্বা এক চওড়া রাস্তা— গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরি করেছিলেন। অফুরন্ত ফলের গাছ তার দুধারে লাগানো। প্রত্যেক দশ মাইল অন্তর একটা পাকা কুয়ো বা ইঁদারা সংলগ্ন পান্থশালা। পঞ্চাশ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের জি টি রোডের পাশে যে কুয়ো ছিল আমরা তার সুগভীর ঠান্ডা জল খেয়ে আনন্দ লাভ করেছি। এখন লোকেরা সামান্য জমির আশায় বেশিরভাগ কুয়ো বুজিয়ে তার ওপর চাষবাস করেছে। আজকাল ক্বচিৎ এক-আধটা অবহেলিত কুয়ো জীর্ণ অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু বিহার, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতবর্ষে (এখন পাকিস্তানে) বেশিরভাগ কুয়ো সযত্নে ব্যবহৃত হচ্ছে আজও।
আমরা জি টি রোড ছেড়ে রাঁচির পথ ধরলাম। অশোক ও আনন্দ সম্পর্কে জ্যেঠতুতো-খুড়তুতো ভাই। ওদের আত্মীয়স্বজনের কাছে বিদায় নেওয়া উদ্দেশ্য ছিল। রাঁচি খুব ফাঁকা, অল্প লোকের বাস ছিল তখনকার দিনে। আমরা হিনুতে এক ক্লাববাড়িতে উঠলাম। অশোকদের মা-বাবার সঙ্গে আলাপ হল। তাঁরা অত্যন্ত ভদ্র কিন্তু প্রিয়জনকে হারাবার ভয়ে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। অশোকের মা জানতে চাইলেন, আমার মা-বাবা আছেন কি না— তাঁরা কেমন করে আমার এই দুরন্ত আশায় মত দিয়েছেন। আমার মা-বাবা আমাকে নিরস্ত করার কথা বারবার বলে যখন ফল পেলেন না, তখন মা মনকে প্রস্তুত করতে পেরেছিলেন। এমনকী আমার শুভ কামনা করে উৎসাহ দেবার চেষ্টায় একটা কবিতাও লিখেছিলেন। সে কবিতা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, কোথাও খুঁজে পাই না।
যখন যাত্রার ক্ষণে বিদায় নিতে গেলাম, মা আমার বন্দুক এবং বেশভূষা দেখে বুঝলেন আমি বিরাট বিশ্বে কোথায় যে হারিয়ে যাব তার ঠিকানা নেই। আমাকে জড়িয়ে কী বলবার চেষ্টা করলেন— তারপর সংজ্ঞা হারালেন। সেদিন আমি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি। একবার ইচ্ছা হয়েছিল আমার সমস্ত অ্যাডভেঞ্চার, দেশ দেখার কামনা জলাঞ্জলি দিয়ে মাকে আশ্বাস দিয়ে বলি যে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে বাড়িতে রইলাম- কিন্তু পরমুহূর্তেই আমি নেশাগ্রস্ত হয়ে যে ভূতের পিছনে ছুটেছি সে আমার হুঁশ ফিরিয়ে দিল। ফেরা কিছুতেই হবে না।
আমার সব কথা শুনে অশোকের মা হতাশার সুরে বললেন, মায়ের কষ্ট ছেলেরা বোঝে না, আমাদের কত বড় যাতনা।
রাঁচি ছেড়ে আমরা আবার জি টি রোডের দিকে এগোলাম, পালামৌ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। এদিকে কম লোক চলে— গাড়ি তো নেই। খয়ের গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এমন কোনও ছোট-বড় জন্তু-জানোয়ার ছিল না যাদের এই জঙ্গলে দেখা যেত না। বাঘ, হরিণ, নীলগাই আশপাশেই ঘুরত। সব মিলে জঙ্গলটা অপূর্ব সুন্দর দেখাত। রাত্রে ক্লান্ত হয়ে একটা ইনস্পেকশন বাংলোতে উঠলাম। সন্ধ্যা হবার আগেই চৌকিদার তার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। দোর খুলে ভেতরে ঢুকতে খুব বেগ পেতে হয়নি। আমাদের সঙ্গে এসেটিলিন আলো ছিল। তার সাহায্যে একটা ঘর সাফ করে নিয়ে আমাদের সঙ্গে যা খাবার ছিল তা শেষ করে শুয়ে পড়লাম।
ঘরের সামনে যে উঠোন ছিল গভীর রাত্রে সেখানে এক ব্যাঘ্র মহাশয় আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিলেন। আমরা দরজা ও জানলা একটু মজবুত করে আটকে চারজন চারদিকে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাঘ বাড়িটা প্রদক্ষিণ করল, কখনও কখনও দেওয়ালের ওপারে জানোয়ার এপারে আমরা। জানলার মধ্যে কোথাও ফাঁক খুঁজছিল বোধ হয়, আঁচড়ের শব্দে তাই মনে হল। একটু জোরে ধাক্কা মারলেই জানলার খিলসুদ্ধ উড়ে যেত। সৌভাগ্যক্রমে বাঘের সেরকম মতিগতি ছিল না, তবু একবার জানলার কাছে বাঘ আসা মাত্র অশোক ০.৪৫ পিস্তল থেকে একটা গুলি ছুড়ল, কী সাংঘাতিক আওয়াজ। বাঘের কানে তালা লাগাবার মতো শব্দ। বাকি রাতটুকু আর আমাদের জ্বালাতন না করে বাঘ উঠোন দিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। চাঁদনি রাতের আলোতে দেখলাম বাঘের পুরুষ্ট দেহটা। আওয়াজে ভয় পেয়ে সেখান থেকে সরে পড়াই শ্রেয় মনে করেছিল। তবু আমাদের কারও ঘুম হল না। ভোরবেলায় চৌকিদার এসে হাজির। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল বাঘটার গুলি লেগেছে কিনা। আমরা ভয় পাওয়াবার জন্য আওয়াজ করেছিলাম শুনে বলল বাঘটা নাকি রোজ রাতে বাংলোয় বেড়াতে আসে। দিনেরবেলায় যখন সে দেখেছে তার কাছে তখন সম্বল মাত্র একটা লাঠি। মানুষখেকো নয় বোধহয়। খাবারের খোঁজেই টহল দিয়ে যায়।
আমরা চা খেয়ে রওনা হলাম জঙ্গলের পথ ধরে যতক্ষণ না আবার জি টি রোডে এসে পড়লাম।
শোন নদীতে রেললাইন ধরে ব্রিজের ওপর দিয়ে পার হলাম। সামনেই সাসারাম, ছোটখাটো শহর। বাঁদিকে জি টি রোডের সৃষ্টিকর্তা এবং পাঠান সম্রাট শেরশাহের স্মৃতিসৌধ। তার মধ্যে কবর রয়েছে অত্যন্ত অনাড়ম্বরে। এই সৌধটি একেবারে খাঁটি পাঠান রীতিতে গড়া এবং সেজন্য উত্তর ভারতের অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভের থেকে স্বতন্ত্র তার স্থাপত্য। সৌন্দর্যের চেয়ে গাম্ভীর্যের দিকে নজর বেশি।
বিহারের চওড়া রাস্তার দুপাশে ধান ও গম কাটা তখন হয়ে গিয়েছে। এই সময় কী পরিমাণ ব্ল্যাক বাক ও স্পটেড ডিয়ার দলে দলে দুধারে দেখা যেত, আজকের দিনে তা গল্পকথা বলে মনে হবে। সারস পাখিরা মাঠের ওপর খাবার খুঁজে খেত। একেকটা গাছভর্তি ফ্লেমিঙ্গো— কখনও কখনও হেরন পাখিও দেখা যেত। সারাটা রাস্তা জুড়ে অগণিত ঘুঘু দেখা যেত। তার কারণ গরুর গাড়ি ভর্তি চাল-ডাল-গম নিয়ে যাবার সময় ফুটো থলে দিয়ে বাইরে কিছু পড়ত। এখন ট্রাক যায় ভীষণ জোরে, তাছাড়া ট্রাকের কী ভিড়! এইরকম পশুপাখি সারা জি টি রোডে দেখতাম। উত্তরপ্রদেশে ময়ূর দেখেছি যেখানে সেখানে। কেউ তাদের মারত না— এত সুন্দর জীব বলে। আখের খেতের আশপাশে মস্ত বড় নীলগাই ও ময়ূর, হরিণও অনেক দেখেছি।
প্রতিপত্তিশালী অনেক বাঙালি তখন উত্তর ভারতবর্ষের সর্বত্র বসবাস করতেন। তাঁরা আমাদের খুব সমাদর করতেন। অবাঙালিদেরও উৎসাহ কম ছিল না। সবাই প্রশ্ন করতেন নানা ধরনের। একটি প্রশ্নের জবাবে বেশ বেগ পেতাম, সেটা হচ্ছে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ করে, অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘদিন কাটিয়ে যদি বা আমরা একযুগ পরে দেশে ফিরতে পারি তাহলে কী লাভ হবে? লাভের জন্য অ্যাডভেঞ্চার খুব কম লোকেই করে। খানিকটা আত্মপ্রসাদ লাভ বরঞ্চ বলা যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের দুটো উদ্দেশ্য ছিল: ১) বাঙালি ভীতু নয় প্রমাণ করা, ২) যদি আমরা সফলকাম হই, তাহলে অসংখ্য তরুণ-তরুণী বিশ্বাস করবে যে কোনও কঠিন কাজই অসাধ্য নয়, দুঃসাধ্য হলেও। আমরা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় নেমেছি যাতে আমাদের পরবর্তীরা অ্যাডভেঞ্চারের নামে আঁতকে না ওঠে, বরং আগ্রহান্বিত হয়ে এ-পথে পা বাড়ায়।
পৃথিবী ভ্রমণে বেরবার দুবছর আগে আমি হিমালয়ান এক্সপিডিশন, যেটা ১৯২৪ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রুশ-এর নেতৃত্বে এভারেস্ট আরোহণ করতে চেষ্টা করেছিল, তাদের দলে ভিড়বার ইচ্ছা প্রকাশ করি। জেনারেল ব্রুশের কাছে চিঠিতে মনের কথাও লিখেছিলাম— তিনিও খুব সহানুভূতিশীল ছিলেন।সেরা ট্যুর প্যাকেজ
দুই বছর পরে ১৯২৮ সালে যখন বিলাত পৌঁছলাম জেনারেল ব্রুশ এবং রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির সভাপতি স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহাসবান্ড আমাকে নিমন্ত্রণ জানান আমার ভ্রমণকাহিনী বলবার জন্য। সেই সভায় অনেক বিখ্যাত পর্যটক ও এক্সপ্লোরারের সঙ্গে আলাপ হয়। পরে ফ্রান্সিস আমাকে ফেলোশিপ দেবার কথা ঘোষণা করলেন। সে অবশ্য অনেক পরের কথা।
আমরা জি টি রোড ধরে বেনারস পৌঁছবার সময় দেখলাম পণ্ডিত মালব্যের চেষ্টায় কী বিরাট ইউনিভার্সিটি গড়ে উঠেছে।
বেনারসের পর চুনার দুর্গ দেখলাম। শুনেছি এটিও শেরশাহর তৈরি। এলাহাবাদে অনেকবার গিয়েছি তবু গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থলটি মনোরম লাগে। যেমন বহুবার কাশী গিয়েছি, হাজার হাজার বছরের পুরনো অলিগলি-সম্বলিত শহরটি আমার কাছে চিরনতুন মনে হয়। এলাহাবাদ পার হয়ে দিল্লির পথ ধরলাম। রাস্তায় খুব ধুলো। বাঁদর এবং হনুমানের উপদ্রব ভীষণ। সাইকেল ও বন্দুক গাছে ঠেস দিয়ে একটু হয়তো বিশ্রাম করতে বসেছি— হঠাৎ বন্দুক ধরে টানতে টানতে একটা বাঁদর গাছে ওঠবার চেষ্টা করল, যথাসময়ে আমাদের দৃষ্টি পড়াতে আমরা সবাই মিলে তাড়া করলাম, ভয়ে তখন বন্দুক ফেলে চম্পট। আরও ভয় পাওয়াবার জন্য বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করলাম। তখন মনে হল বানরকুল সবংশে সবাই যতদূর পারে পালাল।
এর আগে যখন সাইকেলে ভ্রমণ করতে এসেছি, তখন দিল্লিতে চাঁদনি চকের ওপর কোহিনূর হোটেলে উঠতাম। হোটেলটা ছিল মস্ত বড়। সেখানে একটা বড় ঘরের ভাড়া ছিল দৈনিক মাত্র এক টাকা। যতজন লোক থাকবে তাদের প্রত্যেককে একটা দড়ির চার-পাই দিত। খাওয়া-দাওয়া তেমনই সস্তা। আটআনা পয়সা দিয়ে হাতরুটি বা পরোটার সঙ্গে মাংস পেতাম যথেষ্ট।
দিল্লি বলতে তখন বোঝাত পুরনো দিল্লিই। নতুন দিল্লিতে তখন মাত্র কয়েকটা বাড়ি তৈরি হয়েছিল। চারদিকে তখন চলেছে গড়ার পর্ব। স্যার এডুইন লুটিএনের বিরাট কীর্তি তখন নির্ণায়মান। দিল্লির সঙ্গে নতুন দিল্লির যোগসূত্রের জন্য মাত্র দুটো রাস্তা দেখেছি। পাঁচ মাইল পথ— লোকজন নেই, বাড়ি নেই, সন্ধ্যার পর শিয়ালের ঐকতান এবং ঝিঁঝি পোকার ডাক। কেউ সূর্যাস্তের পর সাহস করে ওই পথে চলাফেরা করত না।
আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল আইনের বড়কর্তা এস আর দাশের বাড়ি। তাঁর বড় ছেলে ধ্রুব আমার সমবয়সী বন্ধু ছিল। দুজনেই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। দিল্লিতে আমরা যাব এই কথা জানাতেই তাঁদের কাছে থাকবার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম।
আলিগড়ের কাছাকাছি এসেছি, জি টি রোডের ধারে প্রায় দুশো গজ দূরে ১৪- ১৫টা ব্ল্যাকবাক হরিণ মাঠের ওপর দাঁড়িয়েছিল। বন্দুক পাওয়ার পর থেকে তাদের ব্যবহার করবার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। আনন্দ মুখার্জি অল্প সময়ের মধ্যে বন্দুকে কার্তুজ ভরে একটা হরিণ লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। সেই হরিণ ছাড়া অন্যরা ভীষণ শব্দের চোটে লাফাতে লাফাতে পালিয়ে গেল। আমরা মাঠের ওপর দিয়ে দৌড়ে গেলাম হরিণ ধরবার জন্য। কিন্তু আমিই প্রথমে তার সামনে উপস্থিত হয়ে যা দেখলাম সে দৃশ্য মর্মন্তুদ। বন্দুকের গুলি হরিণের দুপাশ ভেদ করে মাটিতে পড়েছে। তখনও হরিণ চার পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল, মাথাটা কষ্টের সঙ্গে তুলে আমার দিকে দু- তিনবার তাকাল। বড় বড় সুন্দর সেই চোখে স্পষ্টই যেন বলল, আমাকে কেন মারলে? আমি তো তোমার কোনও ক্ষতি করিনি। ইতিমধ্যে আমার অন্য বন্ধুরা সেখানে এসে পড়ল এবং হরিণের প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়বার আগে ধরে ফেলল। আমার আর কোনও উৎসাহ রইল না হরিণ ধরবার, সেই অনর্থক হত্যার কথা ভাবলে আজও কষ্ট হয়। রাত্রে মণীন্দ্র হরিণের মাংস রাঁধল, কিন্তু খাবার প্রবৃত্তি আমার রইল না, শরীর ভালো নেই অজুহাতে সারারাত কিছু খেলাম না। ঘুমোবার জন্য চোখ বুজতেই হরিণের বড় বড় এক জোড়া কালো চোখ আমাকে যেন বলতে লাগল— তুমি অপরাধী, তুমি খুনি।
সেই একদিনের ঘটনা থেকে আমার সারাজীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। প্রকৃতির মধ্যে পশুপাখি যে কত সুন্দর তা বুঝতে শিখলাম। অনর্থক তাদের হত্যা করে লাভ কিছুই হয় না বরং মানসিক অবনতি ঘটে। ১৯২৬ সাল থেকে দীর্ঘকাল কেটে গেছে কিন্তু আর কোনও জানোয়ার কিংবা পাখির দিকে আমার বন্দুক তুলিনি। ছেলেবেলায় শিকারের গল্প ও জন্তুজগতের কথা পড়তে এবং শুনতে খুব আগ্রহ বোধ করতাম। কল্পনা করতাম একজন বিখ্যাত শিকারি হব— যেমন শখ ছিল আর্মিতে যোগ দিয়ে ক্যাপ্টেন হব। দুটো ভূতই আমার মাথা থেকে জন্মের মতো বিদায় নিয়েছিল পরে।
পরদিন আমরা নয়াদিল্লির রাজপথ ধরে সত্যরঞ্জন দাশ মহাশয়ের বাড়ি পৌঁছলাম। আমাদের অভ্যর্থনার বহর দেখে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এস আর দাশ মহাশয় এত বেশি উৎসাহিত বোধ করছিলেন, আমাদের সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলেই টেলিফোন ধরলেন এবং ঘরোয়া নামে ভাইসরয় আরউইনকে ডেকে আমাদের সাহসের অনেক গুণগান করলেন, অগত্যা ভাইসরয় আমাদের নিমন্ত্রণ জানালেন দেখা করবার জন্য। ভারতবর্ষের সৈনিক শ্রেষ্ঠ স্যার উইলিয়াম বার্ডউডকেও দাশসাহেব আমাদের কথা বললেন। সোজা কথা— ‘বিল, তুমি এই ছেলেদের নিমন্ত্রণ করে সমাদর ও উৎসাহ দেবে’। একেবারে হুকুম করার মতো— এমনই দাশ মহাশয়ের প্রতিপত্তি। আমাদের কাছে ফলং লাভং হল বলা চলে।
দাশ মহাশয় পরদিনই আমাদের সঙ্গে নিয়ে ফরেন সেক্রেটারি স্যার জন হেস-এর কাছে গেলেন এবং পথে যাতে আমাদের নিগ্রহ না হয় বিদেশি গভর্নমেন্টের হাতে, সেজন্য সবরকম কাগজপত্র আমাদের দিতে বললেন। কপালে নিগ্রহ থাকলে কিন্তু এড়ানো যায় না যদিও সবকিছু ছাড়পত্রই সঙ্গে ছিল। সে পরের কথা। ফরেন সেক্রেটারি আমাদের খুব সাহায্য করলেন। কনস্তান্তিনোপল পর্যন্ত সব গভর্নমেন্টের কাছে এবং ব্রিটিশ রাজদূতের কাছেও চিঠি লিখে আমাদের কথা জানালেন যাতে আমরা পথে বাধা না পাই।