Collected বিপিনের সংসার - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
411
Messages
5,992
Reaction score
2,710
Points
3,913
Age
40
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
বিপিনের সংসার

মূল লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়







পর্ব - ১


বিপিন সকালে উঠিয়া কলাই-চটা পেয়ালাটায় সবে এক পেয়ালা চা লইয়া বসিয়াছে, এমনসময়ে দেখা গেল তেঁতুলতলার পথে লাঠি হাতে লম্বা চেহারার কে যেন হনহন করিয়াউহাদের বাড়ির দিকেই চলিয়া আসিতেছে।
বিপিনের স্ত্রী মনোরমা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বলিল, দেখ তো কে একটা মিনসে এদিকে আসছে!
বিপিন বলিল, জমিদারবাড়ির দরওয়ান গো—আমি বুঝতে পেরেছি—ডাকের ওপরডাক, চিঠি দিয়ে ডাক, আবার লোক পাঠিয়ে ডাক!
মনোরমা বলিল, তা এসেছ তো ধরো আজ দিন কুড়ি। ডাক দেওয়ার আর দোষ কি? বিপিনের বড় ভ্রাতৃবধূ এই সময় ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন, পলাশপুর থেকে বোধ হয় লোক আসছে—এগিয়ে যাও তো ঠাকুরপো।
বিপিন বিরক্তমুখে চায়ের পেয়ালাটায় চুমুক দিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া উঠানে গিয়াদাঁড়াইল এবং আগন্তুক লোকটির সঙ্গে দুই একটি কথা বলিয়া তাহাকে বিদায় দিয়া একখানি চিঠি-হাতে সোজা রান্নাঘরে গিয়া মাকে বলিল, এই দেখ মা, ওরা আবার চিঠি লিখেছে—দু’দিনযে জিরোব তার উপায় নেই।
বিপিনের মা বলিলেন, তা তো এয়েছ বাপু, কুড়ি-বাইশ দিন কি তার বেশি! তাদের কাজের সুবিধের জন্যেই তো তোমায় রেখেছে? এখানে তুমিব’সে থাকলে তাদের চলে?
সকলের মুখেই ওই এক কথা। যেমনই মা, তেমনই স্ত্রী। কাহারও নিকটে একটু সহানুভূতি পাইবার উপায় নাই। কেবল ‘যাও–যাও’ শব্দ, টাকা রোজগার করিতে পারো—সবাই খুশি। তোমার সুখ-দুঃখ কেহই দেখিবে না।
বিরক্তির মাথায় বিপিন স্ত্রীকে বলিল, আর একটু চা দাও দিকি!
মনোরমা বলিল, চা আর হবে কি দিয়ে? দুধ যা ছিল সবটুকুদিয়ে দিলাম।বিপিন বলিল, র চা খাব। তাই করে দাও।
—চিনিও তো নেই, র চা-ই বা কেমন করে খাবে? –মাকে বল, ওঁর গুড়ের নাগরি থেকে একটু গুড় বের করে দিতে—তাই দিয়ে করো।
মনোরমা ঝাঁঝের সঙ্গে বলিল, মাকে তুমি বলো গিয়ে। বুড়ো মানুষ; দশমী আছে, দোয়াদশী আছে—ওই তো একখানা গুড়ের নাগরি, তাও চা খেয়ে খেয়ে আদ্ধেক খালি হয়েগিয়েছে। এখনও তিন মাস চললে তবে নতুন গুড় উঠবে—ওঁর চলবে কিসে? এদিকে তো নতুন এক নাগরি আখের গুড় কিনে দেবার কড়ি জুটবে না সংসারে। মায়ের কাছ থেকে রোজরোজ গুড় চাইতে লজ্জা করে না?
বিপিন আর কোনো কথা না বলিয়া চুপ করিয়া গেল। তাহার মনটা আজ কয়দিন হইতেইভাল নয়। প্রথম তো সংসারে দারুণ অনটন, তার উপর স্ত্রীর যা মিষ্টি বুলি! বেশ, সেপলাশপুরই যাইবে। আজই যাইবে। আর বাড়ি থাকিয়া লাভ কি? বাড়ির কেহই তেমন পছন্দকরে না যে সে বাড়ি থাকে।
এমন সময় বাহির হইতে গ্রামের কৃষ্ণলাল চক্রবর্তী ডাকিয়া বলিলেন, বিপিন, বাড়ি আছহে?
বিপিন পাশের ঘরের উদ্দেশে বলিল, কেষ্টকাকা আসছেন, স’রে যাও। পরে অপেক্ষাকৃতসুর চড়াইয়া বলিল, ‘আসুন কাকা আসুন, এই ঘরেই আসুন।’
কৃষ্ণলালের বয়স চুয়াল্লিশ বছর, কিন্তু চুল বেশি পাকিয়া যাওয়ায় ও অর্ধেক দাঁত পড়িয়াযাওয়ার দরুন দেখায় যেন ষাট বছরের বৃদ্ধ। তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বলিলেন, ও কেএসেছিল হে, তোমার বাড়ি একজন খোট্টা-মতো?
—ও পলাশপুর থেকে এসেছিল। আমায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
—বেশ তো, যাও না। এখানে বসে মিছে কষ্ট পাওয়া—
—আহা, সেজন্যে না কেষ্টকাকা। পলাশপুরে বাবা যখন চাকরি করতেন, সে একদিন গিয়েছে। এখন প্ৰজা ঠেঙিয়ে খাজনা আদায় করার দিন নেই। অথচ টাকা না আদায় করতে পারলে জমিদারের মুখ ভার। আমি ধোপাখালির কাছারিতে থাকি; আর পলাশপুর থেকে ক্লাগুলোক আসছে; ক্লাপ্ত লোক আসছে,ক্লাপ্ত টাকা পাঠাও, টাকা পাঠাও—এই বুলি। বলুন দিকি, আদায় না হলে আমি বাপের বিষয় বন্ধক দিয়ে এনে তোমাদের টাকা যোগাব মশায়?
কৃষ্ণ চক্রবর্তী বলিলেন, তোমার বাবার আমলের সেই পুরোনো মনিবই আছে তো? তারা তো জানে, তুমি বিনোদ চাটুজ্জের ছেলে–তোমার বাপের দাপটে—
—জানে বলেই তো আরও মুশকিল। বাবা যে ভাবে খাজনা আদায় করতেন, এখনকারআমলে তা চলে না কাকা,—অসম্ভব। দিনের হাওয়া বদলেছে, এখন চোখ কান ফুটেছেসবারই। সত্যি কথা বলছি, আমার ও কাজ ভাল লাগে না। প্রজা ঠেঙাবারজন্যেও না—তাতে আমার তত ইয়ে হয় না, কিন্তু জমিদার আর জমিদারগিন্নি ঘূণ একেবারে। কেবল ‘দাও দাও’ বুলি। না দিলেই মুখ ভার।
—তা আর কি করবে বলো! পরের চাকরি করার তো কোনো দরকার ছিল না তোমার, বিনোদদাদা যা করে রেখে গিয়েছিলেন—পায়ের ওপরে পা দিয়ে বসে খেতে পারতে—সবই যে উড়িয়ে দিলে! বিনোদদাদাও চোখ বুজলেন, তোমরাও ওড়াতে শুরু করলে! এখন আর হা-হুতাশ করলে কি হবে, বলো?
এ সব কথা বিপিনের তেমন ভাল লাগিতেছিল না। স্পষ্ট কথা কাহারও ভাল লাগে না।সে তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, সে যাক কাকা, আমায় একটা শশার চারা দিতে পারেন? আছে বাড়িতে?
এই সময় বিপিনের বিধবা বোন বীণা ঘরে ঢুকিয়া বলিল, দাদা, ডাকছে, একবাররান্নাঘরের দিকে শুনে যাও।
ইহার অর্থ সে বোঝে। সংসারে হেন নাই, তেন নাই—লম্বা ফর্দ শুনিতে হইবে–মানয়, স্ত্রীর নিকট হইতে। কৃষ্ণলাল বসিয়া থাকার দরুন মায়ের নাম দিয়া ডাক আসিতেছে।
বিপিন বলিল, বসুন কাকা, আসছি।
কৃষ্ণলাল উঠিয়া পড়িলেন, সকালবেলা বসিয়া থাকিলে তার চলিবে না, অনেক কাজ তার।
মনোরমা দালানের দোরে আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। বলিল, কেষ্টকাকার সঙ্গে বসে গল্প করলে চলবে তোমার?
—ঘুরিয়ে না ব’লে সোজা ভাবেই কথাটা বলো না কেন? কি নেই?
—কিছু নেই। এক দানা চাল নেই, তেল নেই, ডাল নেই, একটি আলু নেই। হাঁড়ি চড়বে না এ বেলা।
বিপিন ঝাঁঝের সঙ্গে বলিল, না চড়ে না চড়ুক, রোজ রোজ পারিনে। এক বেলা উপোস করে সব পড়ে থাক।
মনোরমা কড়াসুরে জবাব দিল, লজ্জা করে না এ কথা বলতে? আমি আমার নিজেরজন্যে বলিনি। মা কাল একাদশীর উপোস করে রয়েছেন, উনিও কি আজও উপোস করে পড়ে থাকবেন? সব কি আমার জন্যে সংসারে আসে? ওই বীণারও গিয়েছে কালএকাদশী—ও ছেলেমানুষ, কপালই না হয় পুড়েছে, খিদেতেষ্টা তো পালায়নি তা বলে?
মনোরমার যুক্তি নিষ্ঠুর… অকাট্য।
বিপিন বাড়ি হইতে বাহির হইয়া তেমাথার মোড়ের বড় তেঁতুলতলার ছায়ায় একখানাযে কাঠের গুঁড়ি পড়িয়া আছে, তাহারই উপর আসিয়া বসিল
চাল নাই, ডাল নাই, এ নাই, ও নাই—সে তো চুরি করিতে পারে না! একটি পয়সা নাইহাতে, বাজারের কোনো দোকানে ধার দিবে না, বহু জায়গায় দেনা—উপায় কি এখন?
না, পলাশপুরেই যাওয়া স্থির। বাড়ির এ নরকযন্ত্রণার চেয়ে সে ভাল, দিনরাত মনোরমারমধুর বাক্যি আর কেবল ‘নাই নাই’ বুলি তো শুনিতে হইবে না। প্রজা ঠেঙানোর অনিচ্ছা ইত্যাদি বাজে ওজর, ও কিছু না, সে বিনোদ চাটুজ্জের ছেলে, প্রজা ঠেঙাইতে পিছপাও না; কিন্তু আর একটা কথাও আছে তাহার সেখানে যাইবার অনিচ্ছার মূলে।
ধোপাখালি কাছারির তহবিল হইতে সে জমিদারদের না জানাইয়া চল্লিশটি টাকা ধার করিয়াছিল, তাহা আর শোধ দেওয়া হয় নাই। বিপিনের ভয় আছে, হয়তো এই ব্যাপারটা ধরাপড়িয়া গিয়াছে, সেই জন্যই জমিদারের এত ঘন ঘন তাগাদা তাহাকে লইয়া যাইবার জন্য!
বিপিনের ছোট ভাই বলাই আজ চার-পাঁচ মাস অসুস্থ। তাহার চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্যই টাকা কয়টির নিতান্ত দরকার ছিল। বলাইকে রাণাঘাটে লইয়া গিয়া বড় ডাক্তারকেদেখানো হইয়াছে এবং এখন আগের চেয়ে সে অনেকটা সারিয়া উঠিয়াছে বলিয়া ডাক্তারআশ্বাস দিয়াছেন। বলাই বর্তমানে রাণাঘাটেই মিশনারি হাসপাতালে আছে।

পরদিন পলাশপুরে যাওয়ার পথে বিপিন রাণাঘাট হাসপাতালে গেল। স্টেশন থেকে হাসপাতাল প্রায় মাইলখানেক দূরে। বেশ ফাঁকা মাঠের মধ্যে। বলাই দাদাকে দেখিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল।
—দাদা, আমায় এখানে এরা না খেতে দিয়ে মেরে ফেললে, আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে কবে? আমি তো সেরে গেছি, না খেয়ে মলাম; তোমার পায়ে পড়ি দাদা, বাড়ি কবে নিয়ে যাবে বলো।
—খেতে দেয় না তোর অসুখ বলেই তো। আচ্ছা আচ্ছা, পলাশপুর থেকে ফিরবারপথে তোকে নিয়ে যাব ঠিক। কি খেতে ইচ্ছে হয়?
—মাংস খাইনি কতদিন। মাংস খেতে ইচ্ছে হয়—বউদিদির হাতে রান্না মাংস—
—আচ্ছা হবে হবে। এই মাসেই নিয়ে যাব।
বিপিন আড়ালে নার্সকে জিজ্ঞাসা করিল, আমার ভাই মাংস খেতে চাইছে—একটু আধটু—নার্স এদেশী খ্রিস্টান, পূর্বে কৈবর্ত্য ছিল, গোলগাল, দোহারা, বেশি বয়েস নয়— ভ্রূকুটি করিয়া বলিল, মাংস খেয়ে মরবে যে! নেফ্রাইটিসের রুগী, অত্যন্ত ধরাকাঠের মধ্যে না রাখলেযা একটু সেরে আসছে, তাও যাবে—মাংস!
বৈকালের দিকে পাঁচ মাইল পথ হাঁটিয়া বিপিন পলাশপুরে পৌঁছিল।
বিপিনের বাবা ৺বিনোদ চাটুজ্জে এখানে কাজ করিয়া গিয়াছেন, সুতরাং বিপিনের জমিদারবাড়ির সর্বত্র অবাধ গতি। সে অন্দরে ঢুকিতেই জমিদার-গৃহিণী বলিয়া উঠিলেন, আরেএসো এসো বিপিন, কখন এলে? তারপর, তোমার ভাই এখনও সেই হাসপাতালেই রয়েছে? কেমন আছে আজকাল?
জমিদার অনাদি চৌধুরী বিপিনের গলার স্বর শুনিয়া দোতলা হইতে ডাক দিয়া বলিলেন, ও কে? বিপিন না? এলে এতদিন পরে? দশ দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়ে করলে দু’মাস! এরকম করে কাজ চলবে? দাঁড়াও, আমি আসছি।
বিপিন জমিদার-গৃহিণীকে প্রণাম করিল। গৃহিণীর বয়স চল্লিশ ছাড়াইয়াছে, রং ফর্সা, মোটাসোটা চেহারা, পরনে চওড়া লালপাড় শাড়ি, হাতে দুই গাছা সোনার বালা ছাড়া অন্যকোনো গহনা নাই। তিনি বলিলেন, এসো এসো, বেঁচে থাক। তোমাকে ডাকার আরও বিশেষ দরকার, খুকিকে নিয়ে জামাই আসছেন বুধবারে। ঘরে একটা পয়সা নেই। ধোপাখালির কাছারি আজ দু’মাস বন্ধ। তাগাদাপত্র না করলে জামাই এলে একেবারে মুশকিলে পড়ে যেতে হবে।সেইজন্যে কর্তা তোমার ওখানে কাল লোক পাঠিয়েছিলেন তোমায় নিয়ে আসতে।
অনাদি চৌধুরী ইতিমধ্যে নামিয়া আসিয়াছিলেন। তার বয়স ষাটের উপর, বর্তমান গৃহিণীতার দ্বিতীয় পক্ষ। বাতের রোগী বলিয়া খুব বেশি নড়াচড়া করিতে পারেন না, যদিও শরীরএখনও বেশ বলিষ্ঠ। এক সময়ে দুর্দান্ত জমিদার বলিয়া ইহার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল।
অনাদি চৌধুরী বলিলেন, খুকি আসছে বুধবারে। এদিকে ধোপাখালি কাছারি আজ দু’মাস বন্ধ। একটি পয়সা আদায়-তশিল নেই। তোমার কাণ্ডজ্ঞানটা যে কি, তাও তো বুঝিনে!তোমার বাবার আমলে এই মহল থেকে তিনশো টাকা ফি মাসে আদায় ছিল তার এখন সেই জায়গায় পঞ্চাশ-ষাট টাকা আদায় হয় না! তুমি কাল সকালেই চলে যাও কাছারিতে। মঙ্গলবার রাতের মধ্যে আমার চল্লিশটা টাকা চাইই, নইলে মান যাবে, জামাই আসছে এতকাল পরে, কিমনে করবে, আদর-যত্ন করব কি দিয়ে?
জমিদার-গৃহিণী বলিলেন, আর আসবার সময় কিছু কুমড়া, বেগুন, থোড় কিংবা মোচা আর ‘যদি পারো ভাল মাছ একটা রঘুদের পুকুর থেকে, আর কিছু শাকসবজি আনবে।ঘানি-ভাঙানো সর্ষে তেল এনো আড়াই সের, আর এক ভাঁড় আখের গুড় যদি পাও—
বিপিন মনে মনে হাসিল। জমিদার-গৃহিণী যে এই সমস্ত আনিতে বলিতেছেন, সবই বিনামূল্যে প্ৰজা ঠেঙাইয়া! নতুবা পয়সা ফেলিলে জিনিসের অভাব কি, ‘যদি পাও’কথারমানেই হইল ‘যদি বিনামূল্যে পাও’– এমন ছোট নজর, আর এমন কৃপণ স্বভাব! পরের জিনিসএমনই যোগাইতে পারো, খুব খুশি! দায় পড়িয়াছে বিপিনের পরের শাপমন্যি কুড়াইয়া তাঁহাদের জন্যে বেসাতি আনিবার, এমনই তো ছোট ভাইটা হাসপাতালে পড়িয়া শুষিতেছে। এই সবজন্যই এখানকার চাকুরির অন্ন তাহার গলা দিয়া নামে না।

পলাশপুর হইতে ধোপাখালির কাছারি আট ক্রোশ। নায়েবের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করিবেন।তেমন পাত্র নন অনাদি চৌধুরী—সুতরাং সারা পথ হাঁটিয়া সন্ধ্যার পূর্বে বিপিন কাছারি পৌঁছিল। কাছারি-ঘরে ক্যানেস্ত্রা-কাটা টিনের দেওয়াল, চাল খড়ের। স্থানীয় জনৈক নাপিতের পুত্র মাসিকবারো আনা বেতনে কাছারিতে ঝাঁটপাটের কাজকর্ম করে। বিপিন তাহাকে সংবাদ দিয়া আনাইল, সে ঘর খুলিয়া ঝাঁট দিয়া কাছারি-ঘরটাকে রাত্রিবাসের কতকটা উপযোগী করিয়া তুলিল বটে, কিন্তু বিপিনের ভয় হইতেছিল, মেঝেতে যে রকম বড় বড় চারপাঁচটা ইঁদুরের গর্ত হইয়াছে, রাত্রিবেলা সাপখোপ না বাহির হয়!
চাকর ছোকরা একটি কাচভাঙা হ্যারিকেন লণ্ঠন জ্বালিয়া ঘরের মেঝেতে রাখিয়া বলিল, নায়েববাবু রাত্রে কি খাবা?
কিছু খাব না। তুই যা।
—সে কি বাবু! তা কখনও হতি পারে? খাবা না কিছু, রাত কাটাবা কেমন করে? একটুদুধ দেখে আসি পাড়ার মধ্যে, আপনি বসেন বাবু।
এই ছোকরা চাকর যে যত্ন করে, দরদ দেখায়, বিপিন অনেক আপনার লোকের কাছেও তেমন ব্যবহার পায় নাই, একথা তাহার মনে হইল।
অন্ধকার রাত্রি।
কাছারির সামনে একটু ফাঁকা মাঠ, অন্য সব দিকে ঘন বাঁশবন, এক কোণে একটা বড়বাদাম গাছ। অনাদি চৌধুরীর বাবা হরিনাথ চৌধুরী কাছারিবাড়িতে এটি শখ করিয়াপুঁতিয়াছিলেন, ফলের জন্য নয়, বাহার ও ছায়ার জন্য। বাঁশবনে অন্ধকার রাত্রে ঝাঁকে ঝাঁকেজোনাকি ঘুরিয়া ঘুরিয়া চক্রাকারে উড়িতেছে, ঝিঁঝি ডাকিতেছে, মশা বিন্ বিন্ করিতেছে কানেরকাছে—কাছারির কাছাকাছি লোকজনের বাস নাই—ভারী নির্জন।
বিপিন একা বসিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া ভাবিতে লাগিল। কত কথাই মনে আসে!বাড়ি হইতে আসিয়া মন ভাল নয়, হাসপাতালে ছোট ভাইটার রোগশীর্ণ মুখ মনে পড়িল।মনোরমার ঝাঁঝাল টক-টক কথাবার্তা। সংসারে ঘোর অনটন। বাজারে হেন দোকান নাই, যেখানে দেনা নাই। আজ শনিবার, সামনের বুধবারে মহাল হইতে চল্লিশটা টাকা ও একগাদা ফল, তরকারিপত্র, মাছ, দই জমিদারবাড়ি লইয়া যাইতে হইবে জামাইয়ের অভ্যর্থনার যোগাড় করিতে। তিন দিনের মধ্যে এ গরিব গাঁয়ে চল্লিশ টাকা আদায় হওয়া দূরের কথা, দশটি টাকা হয় কিনা সন্দেহ—অথচ জমিদার বা জমিদার-গিন্নি তা বুঝিবেন না—দিতে না পারিলেই মুখভার হইবে তাঁদের। কি বিষম মুশকিলেই সে পড়িয়াছে! অথচ চিরকাল তাহাদের এমন অবস্থাছিল না। বিপিনের বাবা এই কাছারিতে এক কলমে উনিশ বছর কাটাইয়া গিয়াছেন, এইজমিদারদের কাজে। যথেষ্ট অর্থ রোজগার করিতেন, বাড়িতে লাঙল রাখিয়া চাষবাস করাইতেন, গ্রামের মধ্যে যথেষ্ট নামডাক, প্রতিপত্তি ছিল।
বাবা চক্ষু বুজিবার সঙ্গে সঙ্গে সব গেল। কতক গেল দেনার দায়ে, কতক গেল তাহারই বদখেয়ালিতে। অল্প বয়সে কাঁচা টাকা হাতে পাইয়া কুসঙ্গীর দলে ভিড়িয়া স্ফূর্তি করিতে গিয়া টাকা তো উড়িলই, ক্ৰমে জমিজমা বাঁধা পড়িতে লাগিল।
তারপর বিবাহ। সে এক মজার ব্যাপার!
 
Back
Top