- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 411
- Messages
- 5,992
- Reaction score
- 2,710
- Points
- 3,913
- Age
- 40
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
বেশরমের বাজার
মূল লেখকঃ আফজাল হোসেন
মূল লেখকঃ আফজাল হোসেন
পর্ব - ১
কোন সিনেমা দারুণ হিট হয়েছে, কোন গান তিন দিনে কোটি কোটি শ্রোতা শুনেছেন, কোন ইউটিউবারের অনুসারী সংখ্যা দশ লক্ষ, কোন পত্রিকার পাঠক সংখ্যা লাখের ঘরে, কোন লেখকের বই বইমেলাতে চানাচুরের মতো বিক্রি হয়- এসব যদি শ্রেষ্ঠত্বের উদাহরণ হয় তাহলে মানুষের মনে যে বৈচিত্রের জন্য আকাঙ্ক্ষা, সৃষ্টির তাড়না ও আনন্দ রয়েছে- ওসবকে নিত্যই তুচ্ছজ্ঞান করা হচ্ছে।
আমরা এমনটা ছিলাম না। ছোটবেলাতে দেখেছি বিয়ের সময় পাত্রের যোগ্যতা বিচার করতে বসে- দেখা হতো পরিবার কেমন, পাত্রের স্বভাব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আচার ব্যাবহার কেমন। দেখা হতো না, পাত্র কত উপার্জন করে, সহায় সম্পত্তির পরিমান কত, কি গাড়ি চড়ে- ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমাদের স্বভাব বদলে গেলো। বর্তমান কালের বিবেচনা- পাত্রের চাকরিতে উপরি আয়ের সুযোগ রয়েছে, পিতার নানা অসততার গল্প শোনা যায় অতএব আশা করা যায়, মেয়ের ভবিষ্যৎ ভালোই হবে। আশার রঙ রূপ বদল হয়েছে এ কালে। হয়েছে সময়োপযোগী।
আমরা যারা পুরানো মানুষ, তারা ভেবে পাই না- কেমন প্রকৃতির মানুষ আমরা? কোন উদাহরণ দিয়ে ধরে নেবো, আমরা বুদ্ধিমান কালের নই! সে সময় নিয়ে বিচার করতে বসলে প্রমান মিলবে- সেটা ছিল উজ্জ্বলতায় ভরা উত্থানকাল। খেলা, লেখা, বিনোদন, চিকিৎসা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি ইত্যাদি যে কোনো ক্ষেত্রের দিকে ফিরে তাকানো যাক- উল্লেখযোগ্য মানুষের অভাব ছিল না।
পিছনের কালের মানুষেরা অনেক বেশি খেলা, নাটক সিনেমা দেখা, বই পড়া, গান শোনা- ইত্যদি নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করেছে। সেই আগ্রহে, অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি হয়েছে বিচিত্র ধরণের সিনেমা, গান, নাটক, সাহিত্য। সকল সৃজনশীল মানুষদের মধ্যে নতুন কিছু করার প্রবণতা ছিল। তখন কোনকিছুর দাম, উচ্চতা ঠিক করে দিতে কেউ নাজেল হয়নি। নিজের বিচারক্ষমতা দিয়ে নিজেকেই ঠিক করে নিতে হতো- কি পড়বো, কি দেখবো, কি শুনতে হবে।
তখন পাঠক এক নিশ্বাসে অনেক খ্যাতিমান লেখকের নাম বলতে পারতেন। দর্শক বা শ্রোতা বলতে পারতেন অনেক নির্মাতা, সুরকার, অনেক সংগীতশিল্পীর নাম। মানুষের মনে তখন শোনা, দেখা ও পড়ায় আগ্রহ ছিল এবং সেসব পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের মন ছিল আকাশের মতো বড়- তাই মিটিমিটি বা ঝলমলে উভয় রকমের তারা র স্থান ছিল সে আকাশে।
যদি সিনেমার কথা ধরি, “সুতরাং” তৈরি হয়েছে সে সময়ে। সিনেমায় নায়ক নায়কের মতো দেখতে নয়। এ প্রশ্ন তোলেনি কেউ, উৎসাহ নিয়ে দেখেছে, ভালোবেসেছে। রূপবান, জীবন থেকে নেয়া, রংবাজ, আলোর মিছিল, অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, সুপ্রভাত, গোলাপী এখন ট্রেনে, সূর্যকন্যা- সকল ধরণের সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
তিতাস একটি নদীর নাম, পদ্মা নদীর মাঝি- এধরণের সিনেমাও নির্মিত হওয়া প্রয়োজন বলে ভেবেছেন প্রযোজক। তরুন নির্মাতা ভেবেছেন মাটির ময়না নির্মানের কথা। সেকালে সিনেমা নির্মানের আগে ভাবা হয়নি, এটি দর্শকপ্রিয় হবে কি না।
নির্মাতার কাজ নিজের মতো করে একটা সিনেমা নির্মান করা। দর্শকের উচ্চতা মাথায় রেখে গল্প বানালে, সংলাপ লিখলে, গানে সুর করলে তা কি উন্নত ভাবনার, রুচির হওয়া সম্ভব!
“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” কবিতার এই লাইন লেখার আগে কবি জীবনানন্দ দাশ ভাবেন নি, পাঠক এ কথার অর্থ খুঁজে হয়রাণ হবে, সহজ করে লিখি। পাঠককে নিচু তলার ভাবেননি কবি। এটা কবি ও পাঠকের পরষ্পরের প্রতি সম্মানবোধের উদাহরণ।
“এই নীল মনিহার” কিংবা “বিমূর্ত এই রাত্রি যেনো মৌনতার সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর”- এ দুটো গান বা এরকম আরো বহু ভিন্ন মাত্রার গান লেখা বা সুর করার আগে যদি ভাবতে হতো, শ্রোতা এমন তালের, সুরের এবং কঠিন কথার গান শুনতে চাইবে না, ভালো লাগবে না- এমন “ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া” ভাবনায় তাহলে অসাধারণ বহু গান সৃষ্টিই হতো না।
যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ শুরু করবার আগে লাভ লোকসানের হিসাব করে নিতে হয়- কি করুণ, অসহায় একটা কাল। এমন সিনেমা বানাতে হবে, যা দর্শক দেখবে না, খাবে। দর্শক, পাঠক, শ্রোতা যাহা খায়, তাহাই উপযুক্ত মানের। খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলগুলোকে অহরহই ভাবতে হয়, অধিক দর্শক বা পাঠকের প্রিয় হতে হলে কি কি পরিবেশন করতে হবে। এই আপোষ করা মন নিয়ে, অসহায় অবস্থাকে গৌরবের ভেবে যে জীবন কাটানো- তাতে বাঁচার অহঙ্কার কোথায়?
যে মন নত হয়েছে, সে মনে নিত্য জমছে হীনমন্যতা। নিত্যই সে মন হারাচ্ছে সাহস। ভান ভনিতার দখলে চলে যাচ্ছে আস্ত মানুষটাই। নিজেদের কীর্তিতে নিজেরাই অতি সন্তুষ্ট হওয়া মন নিয়ে কোথায় যাবো, যেতে চাই আমরা? মানুষ হিসাবে বাঁচবো কিন্তু বুঝতে কি পারবো না- হয়ে যাচ্ছি, পার্কের বেঞ্চের উপর ফেলে রেখে যাওয়া দোমড়ানো মোচড়ানো বাদামের ঠোঙা।
ভান করে মান বাড়ানোয় এ কালে লজ্জা নেই- কিন্তু বেশরম হলেও পরিচয়ে তো মানুষ। উচ্চতা ছোঁয়ার আকাঙ্খা না থাকুক, আবর্জনা বা আবর্জনার মতো হয়ে যাওয়া দুঃখজনক।