- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 419
- Messages
- 6,332
- Reaction score
- 3,354
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
আয়নাঘর
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
মূল লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
পর্ব - ০১
লিলিয়ান এক টুকরা মাছ ভাজা মুখে দিয়ে হাসিমুখে বলল, ইহা খেতে বড় সৌন্দর্য হয়। তাহের হো-হো করে হেসে ফেলল। লিলিয়ান ইংরেজিতে বলল, আমার ধারণা আমি ভুল বাংলা বলি নি। হাসছ কেন?
তাহের হাসি থামাল না। তার হাসিরোগ আছে। একবার হাসতে শুরু করলে সহজে থামতে পারে না। লিলিয়ান আহত গলায় ইংরেজিতে বলল, আমার বাংলা শেখার বয়স মাত্র। ছমাস। যা শিখেছি নিজের চেষ্টায় শিখেছি। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে কোনো সাহায্য করছ না। বরং উল্টোটা করছি। যখনই বাংলা বলার চেষ্টা করছি তুমি হাসছ। এটা কি ঠিক?
তাহের বলল, অবশ্যই ঠিক। একশ ভাগ ঠিক। আমরা বাঙালিরা বিদেশীদের মুখে ভুল বাংলা সহ্য করি না। যতবার তুমি ভুল বাংলা বলবে ততবার আমি হাসব। মাছ ভাজা মুখে দিয়ে বললে, ইহা বড় সৌন্দর্য হয়। মাছ ভাজার মধ্যে আবার সৌন্দৰ্য কী? এটা পিকাসোর ছবি না, আবার রবীন্দ্রনাথের কবিতাও না। মাছ ভাজা হলো মাছ ভাজা। বুঝলে?
না, বুঝলাম না। মাছ ভাজা খেতে ভালো লাগলে আমি কিছুই বলব না?
বলবে–খেতে মজা হয়েছে, কিংবা বলবে–ভালো হয়েছে। খেতে সৌন্দৰ্য হয়েছে আবার কী? সুন্দর আমরা খাই না। চাঁদেব আলো খুব সুন্দর, তাই বলে চাঁদের আলো কি কেউ খায়?
তাহের আবার হেসে উঠল। লিলিয়ান তাহেরের উপর রাগ করার চেষ্টা করছে, পারছে না। কখনো পাবে না। তার মনে হয় না কখনো পারবে। লিলিয়ানের বয়স তেইশ। নেপলস-এর মেয়ে। তাহেরের সঙ্গে তার পরিচয় হয় ইয়েলো ষ্টোন পার্কে। পরিচয়-পর্ব বেশ মজার। লিলিয়ান ত্রিশ ডলারের টিকিট কেটে একটা ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে এসেছে। এই প্ৰথম শহর ছেড়ে বাইরে আসা, যা দেখছে তাই তার ভালো লাগছে। সে মুগ্ধ হয়ে একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছে–তখন সে লক্ষ করল, কালো, লম্বামতো ঝাঁকড়া চুলের একটি ছেলে তার দিকে তাকিয়ে হো-হো করে হাসছে। রূপবতী মেয়েদের আশেপাশে যে-সব ছেলেরা থাকে তারা তাদের অজান্তেই অনেক অদ্ভুত আচরণ করে, কিন্তু এরকম অশালীন ভঙ্গিতে দাঁত বের করে কখনো হাসে না। লিলিয়ান ব্যাপারটা অগ্ৰাহ্য করার চেষ্টা করল। কিন্তু অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। যতবারই সে ছবি তুলছে ততবারই মানুষটা মুখের সব কটা দাঁত বের করে হাসছে। যেন লিলিয়ান তেইশ বছর বয়েসী ঝকঝকে চেহারার তরুণী নয়, যেন সে মহিলা চার্লি চ্যাপলিন। তার প্রতিটি ক্রিয়াকলাপে হাসতে হবে। লিলিয়ান এগিয়ে গেল। বরফ শীতল গলায় বলল, আপনি হাসছেন কেন জানতে পারি?
লিলিয়ানের শীতল গলা শুনে যে-কোনো পুরুষ ঘাবড়ে যেত। এ ঘাবড়াল না। লোকটি হাসিমুখে বলল, অবশ্যই জানতে পারেন। আপনার ছবি তোলা শেষ হোক, তারপর বলব।
এখন বলতে অসুবিধা আছে?
হ্যাঁ অসুবিধা আছে, অবশ্যই অসুবিধা আছে।
আমার ছবি তোলা শেষ হয়েছে, আপনি বলুন কেন হাসছেন?
আপনি আপনার ক্যামেরার মুখ থেকে ক্যাপ সরান নি। মুখে ক্যাপ লাগিয়ে ছবি তুলছিলেন। এই জন্য হাসছিলাম।
না হেসে আপনি যদি আমাকে বলতেন–ক্যামেরাব মুখেব ক্যাপ সরানো হয় নি–সেটাই কি শোভন হতো না?
হ্যাঁ হতো।
বলতে বলতে তাহের আগের চেয়েও শব্দ করে হেসে উঠল। লিলিয়ান সরে এলো। সে জীবনে এত অপদস্ত হয় নি। তার রীতিমতো কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে ক্যামেরাটা ওল্ড ফেইথফুলের পানিতে ছুঁড়ে ফেলতে। সাধারণ শিষ্টতা, সাধারণ ভদ্রতা কি তরুণী মেয়েরা পুরুষদের কাছ থেকে আশা করতে পাবে না? লিলিয়ানের ইচ্ছা করছে খুব কঠিন কঠিন কথা মানুষটাকে শুনাতে। তা সে পারবে না। খুব রেগে গেলে সে গুছিয়ে কোনো কথা বলতে পারে না। সবচে ভালো হয় লিলিয়ান যদি তার হোটেলে ফিরে যেতে পারে। তা সম্ভব হবে না। সে যে গাইডেড ট্র্যারে এসেছে তাদের মাইক্রোবাস ছাড়বে সন্ধ্য মেলাবার পর। ইচ্ছা না করলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এখানে থাকতে হবে। ঘুবেফিরে ঐ লোকটির সঙ্গে দেখা হবে। সেও নিশ্চয়ই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে। লিলিয়ানকে দেখামাত্র দাঁত বের করে হাসবে। কত বিচিত্র মানুষই না পৃথিবীতে আছে।
লিলিয়ান লক্ষ করল, লোকটা তার দিকে আসছে। হাসিমুখেই আসছে। লিলিয়ানোব চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। মুখে থুথু জমতে শুরু করল। মানুষটাকে কোনো কঠিন গালি দিতে পারলে মন শান্ত হতো। লিলিয়ান জানে, তা সে পাববে না। সবাই সব কিছু পাবে না। লিলিয়ান কাউকে কড়া কথা বলতে পারে না।
আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবার জন্য এসেছি।
লিলিয়ান স্থির চোখে তাকাল, কিছু বলল না। লোকটা নরম গলায় বলল, আমি যখন প্রথম এ দেশে আসি, তখন একটা সস্তা ধরনের ক্যামেরা কিনে খুব ছবি তুলেছিলাম। যা দেখেছি। মুগ্ধ হয়ে তারই ছবি তুলেছি। মজার ব্যাপার হলো, সব ছবি তুলেছি ক্যামেরার ক্যাপ লাগিয়ে। আপনাকে দেখে পুরনো স্মৃতি মনে পড়ল। আপনি কি আমেরিকায় নতুন এসেছেন?
না।
ও আচ্ছা, তাহলে ক্যামেরা নতুন কিনেছেন। এ ধরনের ক্যামেরায় এই অসুবিধা হবে ই। সুন্দর দৃশ্য দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়বেন। ক্যামেরার ক্যাপ না খুলেই ছবি তুলবেন। আপনার যা করা উচিত তা হচ্ছে–Single Lens Reflex ক্যামেরা কেনা। এরে বলে SLR.
আপনার অযাচিত উপদেশের জন্য ধন্যবাদ। আমাকে দয়া করে একা থাকতে দিন।
আমি কি আপনাকে বিরক্ত করছ?
হ্যাঁ করছেন।
লোকটা চলে গেল, কিন্তু লিলিয়ানের মনে হলো সে আবার আসবে। সহজে তার সঙ্গ ছাড়বে না। এশিয়ান ছেলেগুলি মোটামুটি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে। সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সামান্যতম সুযোগও এরা ছাড়ে না। এও ছাড়বে না। চেষ্টা চালিয়েই যাবে। লোকটার সঙ্গে কথা বলাই উচিত হয় নি।
লিলিয়ানের অনুমান মিথ্যা হলো না। বিকেলে লিলিয়ানদের দলের সবাই বসে কফি খাচ্ছে। ছেলেটি উপস্থিত। লিলিয়ানের কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলল, আমি আপনার জন্য একটা ফিল কিনে এনেছি।
লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, কেন?
আমার কারণে আপনার ফিল্ম নষ্ট হয়েছে। আমি প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলাম। আমার উচিত ছিল আপনাকে সতর্ক করা। তা করি নি, উল্টা মজা পেয়ে হেসেছি। অবশ্যই অপরাধ করেছি, কাজেই অপবাধের প্রায়শ্চিত্ত করছি।
লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, অপরাধ টপরাধ কিছু না। আপনি আমার সঙ্গে গল্প কবার লোভ সামলাতে পারছেন না। সুন্দবি অজুহাত বানিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
আপনি ভুল বললেন। নিজেকে খুব রূপবতী ভাবছেন বলে এই সমস্যা হয়েছে। আপনি হয়তো আপনার দেশে, কিংবা খোদ এই আমেরিকাতেই রূপবতী। কিন্তু আমাদের দেশের রূপের বিচারে রূপবতী নন।
আপনাদের দেশে রূপবতী হবাব জন্য কি গায়েী রঙ আপনার মতো কুচকুচে কালো হতে হয়?
তা না। আমাদের দেশে রূপবতী মেয়েদের প্রথম শর্ত হলো–তাদের চোখ সুন্দর হতে হয়।
আমার চোখ সুন্দর না?
না। আপনার চোখের মণি নীল। আমাদের দেশে বাদামি বা নীল চোখের তারার মেয়েদের বলে বিড়াল-চোখা মেয়ে। এদের সহজে বর জুটে না। পুরুষরা এদের বিয়ে করতে চায় না।
কী অদ্ভুত কথা! আপনি কোন দেশের মানুষ?
দেশের নাম আপনাকে বলছি, কিন্তু দয়া করে দেশের নাম শুনে ঠোঁট উল্টে বলবেন না–এই দেশ আবার কোথায়? এ জাতীয় কথা যখন কেউ বলে অসম্ভব রাগ লাগে। আমার দেশের নাম বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন?
না।
নাম না শোনার অপরাধ আমি ক্ষমা করলাম, যদিও ক্ষমা করা উচিত হচ্ছে না। যাই হোক, আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?
বিড়াল-চোখা মেয়ের পাশে বসে কী করবেন?
আপনার সঙ্গে এক কাপ কফি খাব, তারপর চলে যাব।
বসুন।
আপনার নাম কি জানতে পারি?
লিলিয়ান গ্রে।
আমার নিজের নামটা কি আপনাকে বলতে পারি?
লিলিয়ান চুপ করে রইল। মানুষটার সাহস দেখে সে বিস্মিত হচ্ছে। লোকটা হাসিমুখে বলল, আমার নাম তাহের। আপনি যেমন লিলিয়ান গ্রে, তেমনি গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আমাকে তাহের ব্ল্যাক বলে ডাকা যায়। আমি সম্প্রতি আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাস করেছি। আমার ফিন্ড অব স্পেশালাইজেশন হচ্ছেচোখ। আমি ডাক্তারি পড়ছি, ভবিষ্যতে চোখের ডাক্তার হবো।
ভালো।
চোখের ডাক্তার হিসেবে আপনার নীল চোখ সম্পর্কে আমি আপনাকে মজার একটা তথ্য দিতে পারি। তথ্যটা হচ্ছে–বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখ কিন্তু কালো হতে থাকবে, নীল থাকবে না।
কেন?
চোখের পিগমেন্টগুলি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে থাকে। চোখের বঙ নির্ভর কবে পিগমেন্টের সাইজের ওপর। সাইজ বড় হলে রঙ কালো হয়ে যাবে। এক ধরনের Tyndall effect.
কখন চোখ কালো হবে?
যখন বুড়ো হবেন তখন।
আপনি বলতে চাচ্ছেন বৃদ্ধ বয়সে আমি যদি আপনার দেশে যাই তাহলে আমাকে সবাই রূপবতী বলবে?
তাহের হো-হো করে হাসতে লাগল। এমন হাসি যে লিলিয়ানদের দলের সবাই চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। লিলিয়ান নিজেও খানিকটা অপ্ৰস্তুত বোধ করতে লাগল। হাসতে হাসতে তাহেরের চোখে পানি এসে গেল। সে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, সরি। আমি একটু বেশি হাসি। আমার হাসি-রোগ আছে। একবার হাসতে শুরু কবলে থামতে পারি না। পুরো এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট ক্রমাগত হাসার আমার একটা ব্যক্তিগত রেকর্ড আছে। গিনিস রেকর্ড কত তা অবশ্যি জানি না।
হাসি-রোগ ছাড়া আর কী রোগ আছে?
ঘুম-রোগ আছে।
ঘুম-রোগটা কী?
একবার ঘুমিয়ে পড়লে সহজে আমার ঘুম ভাঙে না।
খুব আনকমন রোগ কিন্তু না। অনেকেরই এই রোগ আছে।
আমারটা আনকমন। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। দুবছর আগে আমি লস এনজেলসে ছিলাম। হোস্টেলে থাকি। একবার ভূমিকম্প হলো। ভূমিকম্পের নিয়ম হচ্ছে প্রথম একটা ছোট দুলুনি হয়–তারপর হয় বড় দুলুনি। প্রথম দুলুনির পর আমার বন্ধুবান্ধবরা আমার ঘুম ভাঙানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল। কোনো লাভ হলো না। শেষে ওরা আমাকে চ্যাংদোলা করে বাইরে নিয়ে ফুটপাতে শুইয়ে রাখল। আমার ঘুম ভেঙেছে ভোরে, জেগে দেখি আমি একটা হাইড্রেন্টের পাশে শুয়ে আছি।
লিলিয়ান খিলখিল করে হেসে উঠল। লিলিয়ানের সঙ্গীরা আবারো ফিরে তাকাল। তাহের বলল, আমরা বোধহয় ওদের ডিস্টার্ব করছি, একটু দূরে গেলে কেমন হয়?
ভালো হয় না। আমাদের যাত্রার সময় হয়ে গেছে। আমি এখন উঠব।
আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি।
ধন্যবাদ। অপরিচিত কারো গাড়িতে আমি চড়ি না।
শুরুতে অপরিচিত ছিলাম। এখন নিশ্চয়ই অপরিচিত না। আপনি আমার নাম জানেন। আমি আপনার নাম জানি।
লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, আপনি শুধু শুধু আমার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছেন। আপনার গাড়িতে আমি যাব না।
লিলিয়ান তার সঙ্গীদের দিকে রওনা হলো। একবার তার ইচ্ছা করল পেছন ফিরে মানুষটির মুখের বিব্ৰত ভঙ্গিটা দেখে। অনেক কষ্টে এই লোভ সে সামলাল। মনে মনে ভাবল–ভালো শিক্ষা হয়েছে। কাউকে শিক্ষা দেবার এটাই সবচে ভালো টেকনিক। প্রথম কিছুটা প্রশ্ৰয় দিতে হয়, তারপর ছুঁড়ে ফেলতে হয় আঁস্তাকুড়ে। আশ্চর্য স্পর্ধাফিল্ম কিনে নিয়ে এসেছে। আড়াই ডলার দামের একটা উপহাব কিনে মনে মনে ভেবেছে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
লিলিয়ান ডরমিটরিতে থাকে না। রুমিং হাউজে থাকে। রুমিং হাউজগুলি ইউনিভার্সিটির কোনো ব্যাপার না। ব্যক্তিমালিকানায় চলে। বাড়িওয়ালারা সস্তায় ভাড়া দেয়। রুমিং হাউজে। শুধু থাকার ব্যবস্থা। রান্না করার ব্যবস্থা নেই, কারণ কিচেন নেই। কমন বাথরুম। মাসে চল্লিশ ডলারে এরচে ভালো কিছু আশা করাও অবশ্যি অন্যায়। এরচে বেশি খরচ করে ডরমিটরিতে জায়গা নেয়া লিলিয়ানের সাধ্যের বাইরে। পিকনিক করতে এসে পঞ্চাশ ডলার খরচ হয়ে গেছে। এই মাসটা তার কষ্টে যাবে। কয়েকটা বই কেনা দরকার। এ মাসে কেনা হবে না। ভেবেছিল মার জন্মদিন উপলক্ষে মাকে লংডিসটেন্স কল করবে। তাও সম্ভব হবে না। তিন মিনিট কথা বলতেই লাগে আঠার ডলার। তাছাড়া মার সঙ্গে তিন মিনিট কথা বলাও যাবে না। একবার টেলিফোন হাতে পেলে তিনি ছাড়বেন না। রাজ্যের কথা বলতে থাকবেন। লিলিয়ান যদি বলে–এখন রাখি মা, বিল উঠছে। মা বলবেন–আর একটু, জরুরি কথাটাই বলা হয় নি। তোর পজার চাচা ঐদিন কী করেছে শোন। ঐ লোকটার। আক্কেল বলে এক জিনিস এখনো হলো না। এদিকে তার ডেনটিস্ট বলেছে তার না-কি তিনটা আক্কেল দাত। এমন কথা কি শুনেছিস কখনো—তিনটা আক্কেল দাঁত?বইবই
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে লিলিয়ানের ঘুম এলো শেষ রাতে। ঘুম আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে অপরিচিত একটা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল নদী। পানিতে কানায় কানায় ভর্তি। নদী, নদীর ওপাশে বন-সব জোছনায় থৈ-থৈ করছে। হঠাৎ মাঝ নদীতে কালোমতো কী দেখা গেল। স্রোতের প্রবল টানে ভেসে যাচ্ছে। লিলিয়ান দেখতে পারছে না, তবু পরিষ্কার বুঝতে পারছে নদীর স্রোতে যে জিনিসটা ভেসে যাচ্ছে তা একটা মৃতদেহ। মৃতদেহটা লিলিয়ানের চেনা। খুব চেনা। মৃত মানুষ প্রশ্নের জবাব দেয় না। তবু লিলিয়ান চিৎকার কবে উঠল— কে কে কে?
স্বপ্নে সবই সম্ভব। মৃতদেহ কথা বলল। অনেক কষ্টে পানিব উপর উঠে বসল। ক্ষীণ গলায় বলল, লিলিয়ান আমি। ওরা আমাকে মেরে নদীতে ফেলে দিয়েছে। তুমি আমাকে देंbi७।
লিলিয়ান আতঙ্কে অস্থির হয়ে বলল, আমি কী করে তোমাকে বাঁচাব? তুমি তো মরেই গেছ।
বাঁচাও লিলিয়ান, বাঁচাও। প্লিজ প্লিজ।
এই সময় নদীর স্রোত বেড়ে গেল। জলের প্রবল টান উপস্থিত হলো। শো-শো শব্দ হতে লাগল। মৃতদেহটি ভাটির দিকে তীব্ৰ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। অনেক অনেক দূর থেকে সে ডাকছে–লিলিয়ান লিলিয়ান।
লিলিয়ান নদীর পাড় ঘেসে ছুটতে শুরু করেছে। খানাখন্দ ঝোপঝাড় ভেঙে সে ছুটিছে। মনে হচ্ছে সে আর দৌড়াতে পারবে না। হুঁমড়ি খেয়ে পড়বে। মৃতদেহ এখনো তাকে ডাকছে। মৃতদেহের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ। সেই স্বর বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। লিলিয়ানের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।
এই অবস্থায় লিলিয়ানের ঘুম ভািঙল। তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। জেগে ওঠাব পরেও সে অনেকক্ষণ ভয়ে ঠকঠক করে কপিল। তার ভয়ের অনেকগুলি কারণেব একটি হচ্ছে–যে যুবকের মৃতদেহটি ভেসে যাচ্ছিল সেই যুবক তার চেনা। যুবকের নাম–তাহের। দেখা হয়েছিল ইয়েলো স্টোন পার্কে। তার গায়ে ছিল। হলুদ বঙেব গলারন্ধ স্যুয়েটার। স্বপ্নেও সেই একই স্যুয়েটার ছিল, তবে তার রঙ ছিল ধূসর।
তীব্র ভয় অনেকটা যেমন হঠাৎ আসে তেমনি হঠাৎই চলে যায়। রোদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে লিলিয়ানের ভয় কেটে গেল। শুধু যে ভয় কাটল তাই না, হাসিও পেতে লাগল। তার মনে হলো সে এমন কিছু ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে নি। নদী দেখেছে। নদী কোনো ভয়ঙ্কর জিনিস নয়। নদী দেখার কারণও আছে। আগের দিন পুরো সময়টা কাটিয়েছে ওল্ড ফেইথফুল আহদের তীরে। তাহের নামের ছেলেটিকে জড়িযে স্বপ্ন দেখেছে–সেটাও স্বাভাবিক। তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। সাক্ষাৎ-পর্বও খুব সুখকর ছিল না। মস্তিষ্ক এই ব্যাপারগুলিই তার নিজের মতো করে সাজিয়েছে। লিলিয়ানের পরিষ্কার মনে আছেছোটবেলায় সে যার সঙ্গেই ঝগড়া করত রাতে তাকেই স্বপ্নে দেখত। সেই স্বপ্নগুলিও হতো ভয়ঙ্কর।
লিলিয়ান ঠিক করুল আজ ইউনিভার্সিটিতে যাবে না। আজ একটামাত্র ক্লাস। এই ক্লাস এমন জরুরি নয়। না করলে ক্ষতি হবে না। তারচে বরং ক্যান্টিনে যাওয়া যাক। কোনো কাজ পাওয়া যায় কি-না সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। চার-পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতে পারলে–ইয়েলো স্টোন পার্কের খরচ কিছুটা উঠে আসবে।
ক্যান্টিনে কোনো কাজ পাওয়া গেল না। সে সুইমিং পুলের দিকে গেল। অকারণে যাওয়া। সাঁতার কাটতে হলে টিকিট লাগবে। তার টিকিট কাটার মতো ডলার নেই। কী অদ্ভুত দেশ। এই আমেরিকা! কারো মুখে ডলার ছাড়া অন্য শব্দ নেই।
লিলিয়ান বেশ অনেকক্ষণ সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা দেখল। তার কাছে সব সময় মনে হয় পৃথিবীর সবচে সুন্দর দৃশ্যের একটি হচ্ছে–মানুষের সাঁতারের দৃশ্য। মানুষ যদি উড়তে পাবত তাহলে সেই দৃশ্য নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হতো।
লিলিয়ান স্যান্ডউইচ কিনে ইউনিভার্সিটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে গেল। লাঞ্চ খাওয়ার জন্য তার এখানে একটি প্ৰিয় জায়গা আছে। মেপল গাছের নিচের বাধানো বেদি। গাছের পাতা হলুদ হতে শুরু করেছে। কী সুন্দর লাগছে গাছটাকে! সে একা একা সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছের নিচে বসে রইল। আরো কিছুক্ষণ বসত। শীত শীত করছে। সুয়েটারে শীত মানছে না। তাছাড়া ঘুম ও পাচ্ছে। পড়াশোনা করা দরকার। মনে হচ্ছে আজ পড়া হবে না। সকাল সকাল শুয়ে পড়তে হবে।
আশ্চর্য ব্যাপার, আজ রাতেও লিলিয়ানের ঘুম হলো না। শেষ রাতের দিকে তন্দ্ৰামতো হলো। তন্দ্ৰায় দেখল দুঃস্বপ্ন। আগেব রাতের স্বপ্নটাই অন্যভাবে দেখা। সে এবং তাহের দৌড়াচ্ছে। প্ৰাণপণে ছুটছে। তাদেব তাড়া করছে ভয়ঙ্কর কিছু মানুষ। তাহের বলছে, লিলিয়ান আমার হাত ধৰ্ব্ব। আমি দৌড়াতে পারছি না। প্লিজ, আমার হাত ধব। প্লিজ।
লিলিয়ান চিৎকার কবে জেগে উঠল। নিজেকে শান্ত করতে তার সময় লাগল। হিটিং কয়েল দিয়ে গরম এক কাপ কফি খেয়ে মাকে চিঠি লিখতে বসল।
মা,
আমার কী জানি হয়েছে–দুঃস্বপ্ন দেখছি। ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন। আমার রাতে ঘুম হচ্ছে না। তুমি চার্চে গিয়ে আমার নামে দুটা বাতি জ্বলিও…
এই পর্যন্ত লিখেই লিলিয়ান চিঠি ছিঁড়ে ফেলল। এ ধরনের চিঠি মাকে দেয়ার কোনো মানে হয় না। তিনি শুধু শুধু দুশ্চিন্তায় পড়বেন। তার হাঁপানির টান উঠে যাবে। সে নতুন একটি চিঠি লিখল। সেখানে খুব সুন্দর করে লেখা হলো-ইয়েলো স্টোন পার্কে বেড়াতে যাবার বর্ণনা। ইউনিভার্সিটি সুইমিং পুলে সাতাবের আনন্দ বিবরণ।
ভোর সাতটায় সে তৈরি হলো ইউনিভার্সিটিতে যাবার জন্য। আয়নায় একবার নিজেকে দেখল। দুরাত ঘুম হয় নি। কিন্তু চেহারায় ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। তার নিজের কাছে মনে হলো আজ তার চোখ অন্যদিনের চেয়েও অনেক উজ্জ্বল।
আজ লাঞ্চ আওয়ারের আগে কোনো ক্লাস নেই। কিন্তু টার্ম পেপার জমা দিতে হবে–লাইব্রেরিতে বইপত্র ঘাটাঘাঁটি করতে হবে। বিরক্তিকর কাজগুলির মধ্যে একটি। যে বইটি তার প্রয়োজন দেখা যাবে সেটি ছাড়া সব বইই আছে।
একেকদিন একেকজনের ভাগ্য খুব ভালো থাকে। আজ লিলিয়ানের ভাগ্য খুবই ভালো। যে বইগুলি তার দরকার ছিল সবই সে পেয়ে গেল–বাড়তি পেল একটি মনোগ্রাফ–তার টার্ম পেপারের সঙ্গে মনোগ্রাফের কোনো বেশিকম নেই। টুকে ফেললেই হয়। দুঘণ্টার মধ্যে টার্ম পেপার লেখা শেষ হলো। লিলিয়ান কফি হাউসে কফি খেতে গেল। ঘুম ঘুম লাগছে। কফি খেয়ে ঘুম তাড়াতে হবে, নয়তো ক্লাস করা যাবে না।
কফি হাউজ ছাত্র-ছাত্রীতে ঠাসা। এখন লাঞ্চ আওয়ার। কফি শাপে এত ভিড় থাকার কথা নয়। আজ এত ভিড় কেন? আজ কি সস্তায় কফি জিচ্ছে? না ফ্রি কফি দিচ্ছে? কফি হাউজ মাঝে মাঝে কিছু কায়দা করে নোটিস দিয়ে দেয়–আজ বোলা নটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত ফ্রি কফি। ব্যবসার নতুন কোনো চাল। আজও এরকম কিছু হয়েছে বোধহয়। লিলিয়ান কফির মগ হাতে জায়গা খুঁজছে তখন শুনল হাত উচিয়ে কে তাকে ডাকছে–হ্যালো লিলিয়ান, এদিকে এসো জায়গা আছে।
লিলিয়ান তাকিয়ে দেখে, তাহের।
সে কয়েক মুহুর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল— তারপর এগিয়ে গেল। তাহের হাসি মুখে বলল, এত তাড়াতাড়ি তোমার দেখা পাব ভাবি নি। তুমি কি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্রী?
হ্যাঁ।
আমি যাচ্ছিলাম পাশ দিয়ে, কী মনে করে যে ঢুকেছি। তোমার সাবজেক্ট কী? এনথ্রাপলজি।
দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসে। বসো।
লিলিয়ান বসবে কি-না বুঝতে পারছে না। তার অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে বসা ঠিক হবে না। এই মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের ফল শুভ হবে না। এর কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। তাছাড়া এই লোক তার সঙ্গে এমন আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলবে কেন? এই অধিকার তাকে কে দিয়েছে?
তুমি কী খাবে? কফি? কফিতে ক্রিম থাকবে–না ব্ল্যাক কফি?
আমি কিছু খাব না।
কাপাচিনো কফি খাবে? প্রচুর ফেনা থাকে, একগাদা মিষ্টি দিয়ে বানানো হয়। দারুণ মজা। তুমি বসে। আমি নিয়ে আসছি।
তাহের কফি নিয়ে ফিরে এসে দেখে লিলিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটিকে তার খুব অসহায় মনে হলো। শুধু অসহায় না, ক্লান্ত বিষণু। এই বয়েসী মেয়েরা অনেক হাসিখুশি থাকে।
কফি কেমন লাগছে?
বেশি মিষ্টি।
একেক ধরনের কফির একেক নিয়ম। এই কফি খেতে হয় প্রচুর মিষ্টি দিয়ে। তোমার কি মন খারাপ?
না।
দেখে মনে হচ্ছে খুব মন খারাপ।
লিলিয়ান কিছু বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, রাতে আমার ঘুম হয় নি।
তাহের হেসে ফেলল। শব্দময় হাসি। আশেপাশের টেবিল থেকে ছাত্ৰ-ছাত্রীরা তাকাচ্ছে। অনেকের ভুরু কুঁচকে আছে। কোনো বিদেশী তাদের দেশের কফি শাপে বসে সবাইকে অগ্রাহ্য করে এমন হাসি হাসবে তা বোধহয় এদের পছন্দ নয়।
তাহের লিলিয়ানের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, শোন লিলিয়ান—মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না হওয়াই সুস্থ মানুষের লক্ষণ। শুধুমাত্র পশুদেরই রাতে ঘুমের অসুবিধা হয় না। মানুষের হয়। আমাকে দেখা–আমি বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ি। এ জন্য নিজেকে পশু পশু লাগে। হা হা হা।
আবারো সেই হাসি। আবারো লোকজন চোখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। লিলিয়ান বলল, আমি উঠব। কফির জন্য ধন্যবাদ।
আহা, বসো আর খানিকক্ষণ।
না না।
কাল তো ছুটি। এত তাড়া কীসের? এখান থেকে নব্বুই কিলোমিটার দূরে একটা পেট্রোফাইড ফবেস্ট আছে। পুরো জঙ্গল পাথর হয়ে আছে। আমি আগামীকাল যাব বলে ভাবছি। দিনে দিনে ফিরে আসা যাবে। তুমি কি আগ্রহী?
না, আমি আগ্রহী না; আমার বেড়াতে ভালো লাগে না।
ঐদিন ইয়েলো স্টোন পার্কে কিন্তু খুব বেড়াচ্ছিলে।
ঐদিন ভালো লেগেছিল। এখন লাগবে না।