- Joined
- Dec 22, 2024
- Threads
- 429
- Messages
- 6,770
- Reaction score
- 4,538
- Points
- 3,963
- Age
- 41
- Location
- Dhaka, Bangladesh
- Gender
- Male
আমার বোকা শৈশব
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
পর্ব - ১
আমার জন্ম কলকাতায়, ১৯৩৯ সালের পঁচিশে জুলাই, মাঝরাতে। শ্রাবণ মাসের সেদিন ছিল আট তারিখ। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা মানলে অবিশ্রান্ত শ্রাবণধারার নিচে বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট-লোকালয়ের তখন ঝাপসা হয়ে থাকার কথা। জানি না পৃথিবীতে আমার জীবনের সেই প্রথম রাতটি কেমন ছিল।
যদ্দুর শুনেছি আমার জন্ম হয়েছিল মিসেস মণ্ডল নামের একজন ধাত্রীর হাতে। পৃথিবীতে তিনিই আমাকে প্রথম দেখেছিলেন। এজন্যে কোনোদিন না-দেখা সেই রহস্যময় মাতৃতুল্যা মহিলার মুখ ফিরে ফিরে কল্পনা করতে সারাজীবন আমি খুবই আকুলতাবোধ করেছি।
হিসাবমতে আমার জন্ম টাঙ্গাইল জেলার করটিয়াতেই হওয়ার কথা ছিল; ওখানে সাদাত কলেজে আমার আব্বা, আযীমউদ্দীন আহমদ, ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করতেন। কিন্তু আমার জন্মের কিছুদিন আগে আমার নানি মাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ায় আমার জন্মের জায়গাটা হঠাৎ করেই পাল্টে যায়। এতে আমার অবশ্য একটা লাভ হয়েছিল। এককালের ভারতের রাজধানী এবং সে- সময়ের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাণকেন্দ্র কলকাতা মহানগরীর সঙ্গে আমার জীবন জড়িয়ে গিয়েছিল। সারাজীবন এর জন্যে আমার ভেতর একটা চাপা গর্ববোধ কাজ করেছে।
আমার জন্মের সময়ে বাঙালি সংস্কৃতি তার পরিপূর্ণ শক্তিমত্তা নিয়ে বয়ে চলেছে। কিন্তু সে ছিল এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অস্তমিত হবার ঠিক আগের মুহূর্ত। এর পরের বছর-বিশেকের মধ্যে তার সম্পন্নতা প্রায় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। ভাবতে অবাক লাগে আমার দু-বছর বয়স পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাদেশে, আমার কাছাকাছি কোথাও বেঁচে ছিলেন। সৃষ্টিশীলতার উত্তাল-পর্ব অতিক্রম করছিলেন বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রতিভারা। সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, অবন ঠাকুর, মোহিতলাল, নজরুল, জীবনানন্দ, মানিক, তারাশঙ্কর, সুধীন দত্ত, জসীমউদ্দীন, বুদ্ধদেব বসু; শিল্পে যামিনী রায়, নন্দলাল বসু, জয়নুল আবেদীন; রাজনীতিতে সুভাষ বসু, ফজলুল হক; বিজ্ঞানে সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা; পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে সুকুমার সেন, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, নীহাররঞ্জন রায়—এমনি কত জ্যোতিষ্কে-নক্ষত্রেই না ভরা ছিল বাংলার আকাশ! বাঙালি সংস্কৃতির মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তের সেই সম্পন্ন বর্ণচ্ছটা, সন্ধ্যার রক্তরাগের মতোই, আকাশকে বর্ণাঢ্য করে রেখেছিল। আমি আমার কৈশোর-যৌবনের দিনগুলোয় সেই ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতির শেষ দিনগুলোর বিলীয়মান সৌন্দর্য বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখেছি।
আমি একটা ছোট্ট ছেলেকে চিনি, তার বয়স পাঁচ বছর। আমি দেখে অবাক হই যে সে তার দেড়-দু’বছরের ঘটনাগুলো অবলীলায় বলতে পারে। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লাগে। আমার ধারণা কেবল ও নয়, পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুই হয়ত ওর মতো। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ছিল এদের প্রায় উল্টো। শিশু হিশেবে আমি এদের মতো একেবারেই মেধাবী ছিলাম না, সবকিছুতেই ছিলাম পিছিয়ে পড়া। আমার জীবনে শৈশব এসেছে দেরি করে, কৈশোর এসেছে দেরি করে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য সবই এসেছে দেরি করে। এ-কারণেই আমার আশা বার্ধক্যকে আসতে হলে তাকে আমার মৃত্যুর পরেই আসতে হবে।
মাটির পৃথিবীর ওপর নিজেকে প্রথম আমি খুঁজে পাই আমার পাঁচ বছর বয়সে, টাঙ্গাইল জেলার করটিয়ার প্রকৃতি-ছাওয়া মাঠ-ঘাটের ওপর। এর আগের প্রায় কোনো কথাই আমার মনে নেই। করটিয়ার দিনগুলোর কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা অস্ফুট জগতের ছবি, জীবন থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়ার বেদনায় যা বিষণ্ণ। আমি দেখতে পাই একটা শীর্ণ ছোট্ট নদী, তার পাশে করটিয়া কলেজ কম্পাউন্ডের গাছগাছালির ভেতর থেকে মুখ উঁচিয়ে-থাকা আমাদের টিনের চালওয়ালা বেড়ায়-ঘেরা বাসা, বাসার সামনে গাছপালার ওধারে করটিয়া কলেজ ভবনের বিশাল অস্ফুট অস্তিত্ব, বাসার পেছনে বড় বড় গাছের শেষে বিরাট কলার বাগান, তারও কিছুটা পেছনে টিন দিয়ে বানানো কলেজ-হোস্টেল পেরিয়ে মাটির তৈরি টাঙ্গাইল-মির্জাপুর সড়ক (তখন কি ঢাকা-মির্জাপুর সড়ক তৈরি হয়েছে?)। আর সেই রাস্তা ধরে মির্জাপুরের পথে কিছুটা এগোলে দুপাশজুড়ে শুধু অন্তহীন ফসলের ক্ষেত আর জলাভূমি, যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চখা বক সারসেরা নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়ায় আর হাঁটাহাঁটি করে, যেখানে এক সুদূর অপরূপ পৃথিবীতে জীবনের সব অবিশ্বাস্য কুহক আর রহস্য। করটিয়ার কথা মনে হলেই একটা উদগ্রীব আনন্দ আমাকে ভর করে। আমি দেখতে পাই এর পথে-ঘাটে, গাছের ডালে ডালে আমার দুরন্ত কৈশোর বন্য পৈশাচিক হিংস্রতায় তীব্রভাবে নিজেকে উপভোগ করে চলেছে। বছর-বিশেক আগে আমি একবার করটিয়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে ছেলেবেলার পরিচিত জায়গাগুলো দিয়ে হেঁটে বেড়াবার সময় প্রায় প্রতিটা গাছের আড়ালে-আবডালে, দেয়ালের পাশে, কলেজের বারান্দায়, মাঠে, জলার ধারে কতবার-যে আমার কৈশোরের সেই ছোট্ট ‘আমি’টির ফিরে ফিরে দেখা পেয়েছি, তার বিস্ময় ও বেদনা বলে বোঝানো কঠিন।
করটিয়া কলেজে আব্বা অধ্যাপক হয়ে গিয়েছিলেন কিছুটা আচমকাভাবেই। বিখ্যাত চাঁদ মিয়া ছিলেন তখন করটিয়ার জমিদার। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকার শিক্ষানুরাগী। স্যার সৈয়দ আহমদের আদলে তিনিও আধুনিক শিক্ষা- দীক্ষার মাধ্যমে মুসলিম জাতির মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। বাংলার আলীগড় বানানোর স্বপ্ন নিয়ে তিনি করটিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল কলেজ নয়, কলেজের সঙ্গে গড়ে তোলেন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা মেলানো এক বিরাট শিক্ষা কমপ্লেক্স। তাঁর জমিদারির একটা বড় অংশ ওয়াক্ফ করে তার আয় তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে যান। করটিয়া কলেজ গড়ে তোলার দায়িত্ব তিনি দেন সুসাহিত্যিক ইবরাহীম খাঁর ওপর। তিনি হন এর প্রিন্সিপ্যাল। আব্বা এই সময় ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের (এখন মওলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ) ইংরেজির সাময়িক প্রভাষক। আব্বাকেও তিনি নিয়ে আসেন এই কলেজে। আস্তে আস্তে আসেন আরও অনেক নামকরা অধ্যাপক। ইংরেজি বিভাগে আসেন কাজী আকরাম হোসেন ও মকসুদ হিলালী। বাংলা বিভাগে আসেন জ্ঞানেশ্বর ভট্টাচার্য, দর্শনে আসেন কেতাবউদ্দিন আহমদ ও পরে সাইয়েদ আবদুল হাই (যিনি পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হয়েছিলেন), ইংরেজিতে আসেন সৈয়দ রফিকউদ্দীন আহমদ; এ- ছাড়াও সাইদ-উর রহমান, প্রফুল্ল চন্দ্র চক্রবর্তী—এমনি আরও অনেকে। একটা চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে এঁদের কেন্দ্র করে। গান, বাজনা, নাটক, সাহিত্য রচনায় মুখর হয়ে থাকে করটিয়ার এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। কলেজে যিনি যে-বিষয়ের অধ্যাপক, তাঁকে সেই বিষয়ের নামেই ডাকা হত তখন। রেওয়াজটা সুরসিক ইবরাহীম খাঁ-ই চালু করেছিলেন। যেমন : ইংলিশ সাহেব, আরবি সাহেব, হিস্ট্রি সাহেব, এরকম। কিন্তু কেন যেন কেতাবউদ্দিন সাহেবকে সবাই ‘কেতাব সাহেব’ বলেই ডাকতেন। হয়ত ফিলসফি সাহেব বা দর্শন সাহেবের মতো ওজনদার শব্দে যখন-তখন তাঁকে ডাকাডাকি করা বাঙালির করুণ স্বাস্থ্যে কুলিয়ে উঠত না।
সদ্য কলেজ শুরু হয়েছে বলে ঐ কলেজের ছাত্রসংখ্যা তখনও খুব কম। চারপাশ থেকে ছাত্ররা সবে এসে ভিড় করছে এক-দুই করে, এদের অনেকেরই লজিং-এর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে নানাজনের বাড়িতে। অধ্যাপকরা চারপাশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে লজিং-এর ব্যবস্থা করতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের বোঝাতেন : আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়াশোনা করবে। তারা বড় হবে। মুসলমান সমাজের মধ্যে শিক্ষা নেই। তারা শিক্ষার আলো পাবে। দুনিয়ার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আপনারা বাড়িতে তাদের লজিং না রাখলে তারা এসব পারবে কী করে।
এই করে ধীরে ধীরে কিছু ছাত্র জোগাড় হল কলেজে। তাদের বেতনে কলেজের মাস্টারদের মাসোহারা টেনেটুনে মেটানো হতে লাগল। শুনেছি সপ্তাহ শেষে অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ বসতেন ছাত্র-বেতনের টাকা নিয়ে, শিক্ষকদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেবার জন্যে। ভারি মধুর মানুষ ছিলেন ইবরাহীম খাঁ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘বাতায়ন’-এ এই রসিক ও আমুদে মানুষটি সপ্রাণ হয়ে রয়েছেন। টাকা ভাগাভাগি করতে গিয়ে এক হাস্যমধুর দৃশ্যের অবতারণা হত। ইবরাহীম খাঁ বলতেন : ‘তাইলে আরবি সাবেরে সাতটা টাকাই দেই।’ তাঁর দুষ্টুমিভরা চোখ চশমার ফাঁক দিয়ে আরবি সাহেবের ওপর গিয়ে পড়ত। আরবি সাহেব কাউমাউ করে উঠতেন—’বাড়িতে মেহমান আছাল, আর কিছু না- বাড়াইলে যে হয় না।’ আরবি সাহেবের বরাদ্দ সাত টাকা থেকে বেড়ে যেত দশ টাকায়। ইবরাহীম খাঁর দৃষ্টি এরপর ঘুরে যেত ইংলিশ সাহেবের দিকে— ‘ইংলিশ সাহেবের তো পাঁচ টাকা হইলেই হয়। খালি বিবিসাব আর আপনে।’ সেকালের মজলিশি মানুষ বলতে যা বোঝাত ইবরাহীম খাঁ ছিলেন তা-ই। মজার মজার গল্প আর রঙ্গরসে চারপাশের সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন তিনি। তাঁর মুখে সবসময় দুষ্টুমিভরা মিষ্টি হাসি লেগে থাকত।
এভাবে ছাত্র-বেতন থেকে পাওয়া সামান্য টাকা ভাগাভাগি করে তাঁরা চলতেন তখন। আমার জন্ম করটিয়া কলেজের এই অবস্থা পেরিয়ে যাবার পর। আব্বা করটিয়া কলেজে যান ‘২৯ সালে, আমার জন্ম ‘৩৯ সালে। ততদিনে কলেজের অধ্যাপকদের বেতন কিছুটা নিয়মিত হয়েছে এবং আব্বা ও অন্য শিক্ষকরা মোটামুটি চলতে পারছেন।
খুব বেশি স্মৃতি নেই আমার করটিয়ার, যা আছে তাও অস্ফুট আর ছেঁড়া-ছেঁড়া। অস্ফুট কিন্তু কবিতার মতো অনুভূতিময়। হয়ত সবার শৈশবই কমবেশি এমনি কবিতাময় আর স্নিগ্ধ।
করটিয়ার কথা ভাবলেই আমি দেখতে পাই আমাদের বাসার পাশ দিয়ে চলে গেছে খুব সুন্দর, শান্ত, ছোট্ট একটা নদী। করটিয়া কলেজের পাশ দিয়ে বয়ে এসেছে নদীটা। নদীও ঠিক নয় আসলে, শীর্ণ খালের মতো একটা ধারা— ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া একটা স্বচ্ছ পানির স্রোতরেখা। শীতকালে তাতে পানি কমে যেত। একটা রুপালি শীর্ণধারা তিরতির করে বয়ে যেত সে-নদীতে। ‘পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি’র সঙ্গে আমাদের শৈশব নিয়েও ওই নদী আমরা পারাপার করতাম। কিন্তু বর্ষায় অন্যরূপ দেখা দিত তার। রবীন্দ্রনাথের ছোট নদীর বর্ষাকালের প্রমত্ত রূপের মতো তীব্র উত্তাল স্রোতে সে-নদী তখন দুকূল ছাপিয়ে হিংস্র হয়ে উঠত।
ওই নদীটা আমার ছেলেবেলার স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমি ওই ছোট্ট নদীটাকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবতাম। ওই নদী কোথায় কোন্দিকে গেছে, কোথা থেকে এসেছে কিছুই আমি জানতাম না। হাটের ওপাশে একটা বড় নদী ছিল, সেখান থেকেই এসেছিল ওটা। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস্তার ওপরকার ব্রিজটার নিচ দিয়ে (ব্রিজটা তখন কাঠের ছিল) এ নদী জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে, মাদ্রাসা-স্কুল পিছে ফেলে এঁকেবেঁকে দূর গ্রামের গাছপালার ভেতর কোন্খানে যেন হারিয়ে গিয়েছে।
ওই নদীটার দিকে তাকিয়ে আমার নানান কথা মনে হত : আহা, ওই নদীটা গিয়েছে কোথায়? নদীর সঙ্গে হেঁটে-হেঁটে ঐ নদীর শেষ দেখতে ইচ্ছে করত আমার। ঐ সময় একটা গান মাঝে মাঝে শুনতাম আব্বার মুখে : ‘বংশাই নদীর কূলেরে ভাই মস্ত একখান বাড়ি / (ওরে) কর্তা তারই রামকানাইরে ভারি জমিদারি/ নাগর আয় আয়রে।’ হয়ত কোনো পালাগানের ধুয়া। গানটা শুনলেই আমার মনটা কেন যেন ছলছল করে উঠত। কোনো-এক অচেনা জমিদার রামকানাইয়ের জীবনের দুঃখময় করুণ ভালোবাসার কাহিনীর কথা ভেবে কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়তাম। গানটা শুনে আমার কেবলই মনে হত আমাদের এই নদীটাই হয়ত সেই বংশাই নদী। এর ধারেই একটা মস্ত বাড়িতে কর্তা রামকানাই বিরাট জমিদারি সাজিয়ে বসে আছেন। যুবক-জমিদার রামকানাইকে আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পেতাম। নদীটাকে ঘিরে এক অদ্ভুত রহস্য আমার ভেতর ঘোরাফেরা করত।
এসব ভাবনার সঙ্গে ঐ নদীর কিন্তু কোনো যোগ ছিল না, নদীটা আমার এসব কল্পনা বা অনুভূতির কিছুই জানত না। কেবল নিজের মনে কুলকুল করে বয়ে যেত।
নদীটাকে নিয়ে একটা স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে মনের ভেতরে। ঘটনাটা এক শীত সন্ধ্যার। নদীর ধারা সে-সময় পুরোপুরি শুকিয়ে গিয়েছে। তখন করটিয়ার মতো এদেশের সুদূর গ্রামগুলোতে গ্রামোফোন, রেডিও কিছুই ছিল না, থাকলেও খুবই কম। ছিল না আজকের মতো সান্ধ্যকালীন গানের অনুষ্ঠান। এক-একটা গানের টুকরো কিংবা গানের লাইন হঠাৎ করেই এখান-ওখান থেকে আমাদের কানে ভেসে আসত, ওটুকুই ছিল আমাদের সংগীত শোনার সাকুল্য সুযোগ। স্বৰ্গ থেকে হঠাৎ ভেসে-আসা গানের সেই দুর্লভ কলিগুলো আমাদের উতলা করে আবার হারিয়ে যেত।
একদিন সন্ধ্যার সময় আমি সেই নদীটির ধার দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ শুনলাম সেই অস্ফুট অন্ধকারের ভেতর দূরে কোন্খান থেকে কে যেন গেয়ে উঠল : ‘দাদা আর যাব না ওই ইশকুলে লিখতে।’ খুব সম্ভব গুনাইবিবি যাত্রার গান। গানটার কথার মধ্যে এমন কিছুই ছিল না, কিন্তু গায়কের কণ্ঠের মধ্যে এমন একটা আশ্চর্য মদিরতা ও বিষণ্ণতা ছিল যে, সন্ধ্যার নিস্তব্ধ অন্ধকারের ভেতর সেই গানটা মুছে যাবার পরও আমার মনে হতে লাগল নদীর জনহীন পাড়দুটোকে সেই গানের স্মৃতি যেন পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে একটা করুণ বেদনা নদীর দুধারের নির্জনতাকে ছাপিয়ে যেন কেঁদে চলল অনেকক্ষণ। আমার বুকের ভেতরটা শোকে মোচড় দিয়ে উঠতে লাগল। আমার মনের ভেতর সে-গানটা হৃদয়কে কষ্ট দিয়ে আজও তেমনি কাঁদে। ঐ নদীটি নিয়ে এমনি সব অদ্ভুত স্মৃতি আছে আমার ভেতর।
গান নিয়ে আরেকটা স্মৃতি আছে ছেলেবেলার। একবার গিয়েছিলাম আমাদের ঠিক পাশের গ্রামে, করাতিপাড়ায়। ‘করাতি’ শব্দটার মানে আমি তখনও জানতাম না। কিন্তু বড় বড় কাঠ-কাটা দাঁতওয়ালা বিশাল করাতের সঙ্গে ঐ নামটার মিল থাকায় নামটা শুনলেই আমার ভেতরটা কেন যেন ভয়ে শিরশির করে উঠত
কেবল ঐ নামটাকে নয়, ঐ পাড়ার সামনের বিশাল ধূ-ধূ মাঠটার দিকে তাকালেও একটা অজানা ভয়ের অনুভূতিতে আমার বুকটা ধুকধুঁক করত। আমি যেন স্পষ্ট দেখতাম মাথায় পাগড়িবাঁধা দরবেশের মতো একটা লোক কাঁধে বড় একটা ঝুলি নিয়ে ঐ মাঠের ওপারের গ্রাম থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে কেবলি এগিয়ে আসছে। আমি বুঝতে পারতাম না কে সে? কেন আসছে? খালি একটা ভয়ের অনুভূতিতে অসুস্থ হয়ে উঠতাম।
একদিন সেই করাতিপাড়ায় গিয়েছিলাম একটা বিয়েতে। আমার এবারের করাতিপাড়ার স্মৃতি কিন্তু ঐ ভয়ের একেবারে উল্টো। তখন গরমের রাত। দশটা-এগারোটা বেজে গেছে। সবার খাওয়াদাওয়া শেষ। চারপাশ নিঝঝুম, অসাড়। আঙিনার ওপর এখানে-ওখানে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে আছে। আধো ঘুমের মধ্যে টের পেলাম বাড়ির ভেতর কে যেন একটা গ্রামোফোনে গান বাজানোর চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে তাতে এক-একটা রেকর্ড চাপিয়ে দিচ্ছে আর সেই গানের মিষ্টি শব্দে চারপাশের রাতের হৃদয়টা সোনালি হয়ে উঠছে। একসময় সেই গ্রামোফোন থেকে একটা গান আমার কানে ভেসে এল : ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।’ আমার শোনা ওটাই নজরুলের প্রথম গান। আমি ওই গানের সুরের ভেতর একটা ধূসর-নীল পাহাড়কে বিরাট আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে গভীর তৃপ্তিতে ঘুমিয়ে থাকতে দেখতে পেলাম যেন—নাকি একজন গভীর পুরুষের বুকে নিমগ্ন মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অস্ফুট নারীকে, কে জানে? চোখের ওপর স্পষ্ট দেখতে পেলাম ছবিটা। সুদূর ছেলেবেলার এই ছবিটা আজও আমি দেখি।
প্রথমে সন্দেহ জেগেছিল করটিয়ার ঐ অল্প ক’টা দিনের ক’টা স্মৃতিই-বা মনে আছে? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এর সংখ্যা হয়ত সত্যি-সত্যি অফুরান। এর ক’টাই- বা লেখা যায় বা লেখা উচিত। কিন্তু অন্য কিছু লিখি আর না-লিখি একটা সকালের কথা আমাকে লিখতেই হবে। একটা কবিতায় ভরা সকালের রূপকথা। প্রায় স্বপ্নের মতোই ছিল সকালটা। আমার বয়স তখন হয়ত পাঁচ-সাড়ে পাঁচ। আমি, আমার ছোটভাই, ছোটবোন আর সেইসাথে আরও দু-একটি ছেলে, হয়ত আমার চাইতেও ছোট, কেন যেন করটিয়া কলেজের মাঠ পেরিয়ে ক্ষেতের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কীভাবে কেন হাঁটতে শুরু করলাম কিছুই মনে নেই, কেবল মনে আছে বেশ ক’জন মিলে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি তো চলেইছি। চারপাশে মটরশুঁটির ক্ষেত। ঠিক বড় মটরশুঁটি নয়, ছোট একধরনের মটরশুঁটি, আমরা ছেই বলতাম সেগুলোকে। ক্ষেতে বসে খোসা ছাড়িয়ে এগুলো খেতে খুব মজা লাগত আমাদের।
সেইসব ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা রহস্যময় জগতের মধ্যে এসে পড়লাম। শীতকাল সবে বিদায় নিয়েছে। শিশির জমে আছে সারা মাঠজুড়ে, সবখানে। দূরে চারপাশে সবুজ গ্রাম। তার গায়ে শিশিরের স্নিগ্ধতা। এপাশে-ওপাশে গন্ধক-হলুদ রঙের ফুলে ভরা শর্ষেক্ষেতের জগৎ। বিলের পাশে বকেরা বসে আছে। মিষ্টি, শান্ত সকাল। এসবের মধ্য দিয়ে, যেন প্রায় একটা রূপকথার দেশের ভেতর দিয়ে, হেঁটে চললাম সবাই।
হাঁটতে হাঁটতে অনেক মাঠ-ঘাট-প্রান্তর পেরিয়ে একটা গ্রাম এল আমাদের সামনে। সে-গ্রামে দেখা গেল একটা অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি। সে-সময় রূপকথার গল্পে রাজবাড়ির যে-বর্ণনা শুনতাম, ঠিক সেরকম বিশাল এলাকা নিয়ে সে-বাড়ি; তার সামনের দিকটায় পাকা দালান, পেছনে অনেক দূরে ছোট ছোট বেশকিছু টিনের চাল ছাওয়া ঘর। শুনলাম মুকুন্দ সাহা নামে একজনের বাড়ি সেটা। মুকুন্দ সাহা নামটাও রহস্যময় লাগল। বাড়ি দেখেই বুঝেছিলাম খুবই অবস্থাসম্পন্ন আর বিত্তবান মানুষ এঁরা। হয়ত এদেশের রাজাই হবেন। আমরা যেতেই তাঁরা খুব খাতির করলেন আমাদের। সে-সময় খুব সম্ভবত কোনো পূজা বা ঐ ধরনের কিছু চলছিল ওঁদের বাড়িতে। লুচির সঙ্গে নানানরকম মিষ্টি, পায়েস, নারকেলের নাড়ু, বরফি খেতে দিলেন তাঁরা। রূপকথার মদনকুমার মণিমালারা যেসব দিয়ে নাশতা করে, প্রায় সেসব। বিশাল অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি, সেখানকার মুখরোচক খাবার, তার সঙ্গে আশ্চর্য স্নিগ্ধ সুন্দর সকাল। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন সত্যি- সত্যিই রূপকথার জগতের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি আর সে-জগতের মতোই না-চাইতেই অভাবিত সব জিনিশ পেয়ে যাচ্ছি।
‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে’ অ্যালিস রূপকথার দেশে চলে গিয়েছিল স্বপ্নের ভেতরে। বোধহয় সব মানুষই শৈশবের কোনো-না-কোনো মুহূর্তে এমনিভাবে ওরকম অ্যালিস হয়ে যায়। চারপাশের বাস্তব পৃথিবীটাকে পুরনো খোলসের মতো ফেলে রেখে একটা অলীক জগতের উজ্জ্বল পথে-ঘাটে অবাস্তবভাবে হেঁটে বেড়াতে থাকে।
খাওয়াদাওয়ার পরে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। অনেকদূর হেঁটে পেলাম একটা বড় রাস্তা। বড় মানে পিচঢালা নয়। একটা চওড়া মাটির রাস্তা, একটা নদীর ধার ঘেঁষে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছে। সেই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগোতেই দেখলাম আধোডোবা একটা লঞ্চ রাস্তার পাশের নদীর অল্প পানিতে ভেঙে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। লঞ্চটাকে এভাবে জরাগ্রস্তের মতো ডুবে থাকতে দেখে আমার মনটা বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে গেল। মনে হতে লাগল একটা কোনো বড়ধরনের জাহাজডুবির দুঃখময় স্মৃতি যেন ওটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যেন এখানে একটা বড় ধরনের বেদনাদায়ক কিছু ঘটে গিয়েছিল কোনো এককালে, সেই অব্যাহতিহীন দুঃখটা সেখানকার আকাশে-বাতাসে আজও কেঁদে চলেছে। কত অভাবিত কিছুই-না ভাবতে পারতাম আমরা সে-সময়!
এসব দেখতে-দেখতে বিমর্ষ-মনে হেঁটে চলেছি, হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে দেখি আমাদের পাশেই একটা রহস্যজনক সবজির ক্ষেত। সে-ক্ষেতের মধ্যে বড় বড় লতাজাতীয় সবুজ সতেজ পাতাওয়ালা একধরনের সার-সার ছোট গাছ। গাছের পাতা একটু ফাঁক করলেই দেখা যায় ছোট-বড় কচি কচি খিরাই ধরে আছে। এর আগে আমি কখনও খিরাই দেখিনি। এর ছোট ছোট নরম কাঁটাওয়ালা সবজিগুলোর সবুজ গড়ন দেখে সেগুলোকে রূপকথার ফলের মতোই মনে হতে লাগল। ক্ষেতের আশপাশে কেউ ছিল না, আমরা খুশিমতো খিরাইগুলোকে গাছ থেকে ছিঁড়ে খেয়ে চললাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে গলাও শুকিয়ে এসেছিল। সেই ঠাণ্ডা খিরাইগুলো প্রাণটাকে যেন জুড়িয়ে দিল। স্বপ্নের জিনিশকে এমন অপর্যাপ্তভাবে এর আগে কখনও পাইনি।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় সবাই চলে গিয়েছিলাম আরও অনেকদূরে। একসময় হঠাৎ দেখি পাশেই বেশ বড়সড় একটা নদী। নদীর উল্টোদিকে বিরাট একটা চর। নদীটাকে দেখে কেন যেন আমার মনটা ছলছল করে উঠল। নদীর ওধারের বিস্তীর্ণ চরের দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে হতে লাগল, রূপকথার শেয়াল- পণ্ডিতের গল্পের সেই সন্তানহারা আর্তনাদমুখর কুমির ধূর্ত-শেয়ালকে ধরার জন্যে হয়ত ঐ চরের কোনো-এক জায়গাতেই মরার মতো ভান করে আজও শুয়ে আছে। নদীটাকে বাঁয়ে রেখে একটা হাটের ভেতর দিয়ে কিছুটা হাঁটতেই একসময় এসে হাজির হয়েছিলাম আমাদের বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই নদীটার ধারে। হঠাৎ কী করে এল নদীটা এখানে? আমরা দুধের সাগর ক্ষীরের সাগর ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর দেশ সব ঘুরে হঠাৎ আবার বাসার কাছের নদীটার ধারে ফিরে এলাম কী করে! সবকিছুই আমার কাছে ভেল্কিবাজি বলে মনে হতে লাগল। সেই নদীর পাড় ধরে অনেকদূর হেঁটে ফিরে এলাম আমাদের বাসায়।
বছর-বিশেক আগে গিয়েছিলাম করটিয়াতে। তখন হেঁটে দেখার চেষ্টা করেছিলাম ছেলেবেলার সেই আশ্চর্য সকালে কোন্ পথ ধরে কতদূরে আমরা গিয়েছিলাম। খুঁজতে গিয়ে দেখেছিলাম, আমরা সব মিলে আসলে সেদিন হয়ত মাইলখানেকের বেশি হাঁটিনি। কয়েকটা ক্ষেত পার হয়েছিলাম মাত্র। আমাদের পাশের গ্রামেই ছিল মুকুন্দ সাহার বাড়ি। কাজেই কতদূরেই-বা যেতে পারি? আসলে আমরা তখন কেবলই কয়েকটি শিশুমাত্র, দুটো ছোট ছোট করুণ পা আমাদের, কয়েকটা অবোধ অসহায় প্রাণী আমরা। কতদূরেই-বা যাওয়া সম্ভব আমাদের? খুবই সামান্য জায়গা ঘুরে এসে আমরা পৃথিবীর শেষপ্রান্ত হেঁটে আসার বিস্ময় ও মুগ্ধতা অনুভব করেছিলাম। ছেলেবেলায় বিশ্বাস করার, অবাক হবার এই অপরিমেয় শক্তি থাকে মানুষের।
কয়েকটা টুকরো স্মৃতি আছে করটিয়ার, তার মধ্যে একটা আমাদের স্কুলটাকে নিয়ে। স্কুলটা ছিল টাঙ্গাইল-মির্জাপুর রোডের দক্ষিণ দিকে। বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা পেরিয়ে, স্কুলের মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে, পুকুরের পাড় ধরে এগিয়ে তবে পৌঁছতে হত স্কুলটাতে। স্কুলের উল্টোদিকে মাদ্রাসা, স্কুলটারই মতো একটা একতলা লম্বা শাদা দালান। স্কুলটাতে ক্লাস ওয়ানে পড়েছিলাম কি না মনে পড়ে না, কিন্তু টু-তে যে পড়তাম স্পষ্ট মনে আছে। মনে পড়ে ক্লাস টুর পাশেই ছিল থ্রির ক্লাস। থ্রির ছেলেরা ছিল মোটামুটি আমারই বয়সী। এক বছরের ব্যবধানে কতটুকুইবা বড় হতে পারে? কিন্তু ওই ক্লাসের সামনে দিয়ে হাঁটতে গেলে এদের সবাইকে আমার বিরাট বিরাট মানুষের মতো মনে হত, যেন নাইন-টেনের বা কলেজের বড় বড় ছাত্র। ক্লাসটার দিকে তাকালেই মনে হত সেই বড় বড় ছেলেরা সবাই একসঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। ক্লাসভরা অত ছাত্রের সেই অতিকায় বিদ্রূপের সামনে দাঁড়িয়ে কী করব বুঝতে পারতাম না। কেন অমন মনে হত? আসলেও কি তারা হাসত? না, তারা হাসত না, কিন্তু আমার অমনটাই মনে হত। ঐ ক্লাসের সামনে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে আমার বুক ধড়াস ধড়াস করত, পা আড়ষ্ট হয়ে আসত, ভয়ে আমি পুরো ভেঙে পড়তাম।