Collected অভিলাষ - বুদ্ধদেব গুহ

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
419
Messages
6,484
Reaction score
3,724
Points
3,963
Age
41
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
অভিলাষ

মূল লেখকঃ বুদ্ধদেব গুহ





রাঁচি-রোড স্টেশনের কাছেই ‘মারার’-এ ইফিকো লিমিটেডের চমৎকার গেস্টহাউস। ‘শান্তিপুঞ্জ’ ট্রেন হয়ে যাওয়াতে যাতায়াতেরও কোনো অসুবিধাই নেই। জেনারেল ম্যানেজার বাসু সাহেবের যত্নআত্তিরও খুঁত নেই কোনো। তবে স্নিগ্ধদের সঙ্গে অমিয় আছে বলেই এই খাতির-প্রতিপত্তি। অমিয় ইফিকো কোম্পানির একজন ডিরেক্টর। নইলে ওদের নিজস্ব দাম আর কতটুকু?
স্নিগ্ধ আর ভূতনাথ (ওরফে ভুতো) চানটান করে, সুটকেস প্যাক করে সকালের চা-জলখাবার খেয়ে নিয়েই বারান্দাতে এসে বসেছিল। সামনে টেরাসিং করা চমৎকার লন। অমিয়ও এল ঘর থেকে। একেবারে তৈরি হয়েই। ত্রিবেণীজি ড্রাইভারও গাড়ি নিয়ে তৈরি। এখন হাজারিবাগের দিকে রওয়ানা হয়ে যেতে পারে।
ঠিক এমন সময়ে মোটরসাইকেলের ভটভটানি আওয়াজ শুনে ওরা তিন-জনেই চোখ তুলে তাকাল। দেখল ইফতিকার আহমদ, ওদের বহুপুরোনো বন্ধু, একজন অপরিচিত ভদ্রলোকের বাইকের পেছন থেকে নামল।
নেমেই বলল, সালাম ওয়ালেকুম।
ওয়ালেকুম, আসসালাম।
অমিয় বলল, কাঁহাসে আ পঁউছা হিঁয়া আচানক?
—রামগড় থেকেই আসছি। তোরা বড়োসাহেব। তোদের রাহান-সাহান-এর খবর তো সারা এলাকাই রাখে। আজই সকালে এরফান চাচার ডেথ হয়ে গেল। তাই ভাবলাম একবার ঢুঁ মেরে যাই। তোদের গাড়িতেই বসে পড়ব।
—কী হয়েছিল এরফান চাচার? স্নিগ্ধ শুধোল।
—ক্যা নেহি হুয়া থা ওহি পুছ। ডায়াবেটিস, হাই-ব্লাডপ্রেসারভি। ইমরান ভাইয়াকা টেলিফোন আ পঁহুঁছা অউর ম্যায় তুরন্ত দৌড়কে আয়া হিঁয়া। হামে লেবি তো?
—মজাক উড়াস না। তোর মালপত্র কোথায়?
ভূতনাথ শুধোল।
—এই তো।
বলেই কাঁধের ব্যাগটি দেখাল। বলল, এরফান চাচাকে গোর দেওয়া হবে। গোছগাছ করার সময়ই পেলাম না। হাসিনা নিয়ে আসবে সঙ্গে, পরে।
—পরিণত বয়সেই গেলেন। হাবিব চাচার মতো অকালে তো যাননি এরফান চাচা।
অমিয় স্বগতোক্তি করল।
—তা ঠিক।
—নে ওঠ, যাব এবার আমরা। ওই যে, বাসু সাহেবের সাদা অ্যাম্বাসাডার আসছে।
ডা. বাসু আসতেই, অমিয় ইফতিকারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। বলল, আমাদের ছেলেবেলার বন্ধু, হাজারিবাগের। ঠিকাদারি করে রামগড়ে। মিলিটারির ঠিকাদার।
নমস্কার-আদাব বিনিময়ের পরেই ওরা বেরিয়ে পড়ল।
বাসু সাহেবের গাড়িও কারখানার দিকে চলে গেল।
গাড়ি ছেড়ে দিল হাজারিবাগের দিকে। পেছনে পড়ে রইল ‘মারার’।
হু-হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। কাচ সব তুলে দিয়েও গরম জওহরকোটের বোতাম আঁটতে লাগল স্নিগ্ধ। তার ওপরে গরম শাল জড়ানো। হাজারিবাগি শীত তো নয়; হাজারিবাঘি শীত!
জানলা দিয়ে দু-পাশের দ্রুত অপস্রিয়মাণ দৃশ্যের দিকে চেয়ে ছেলেবেলার নানা কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ওর। নানা স্মৃতি। এরফান চাচা, হাবিব চাচা, চাচিরা, মুনাব্বর, মকবুল, মোবাসসার, ওয়াজ্জু ইত্যাদি খেলার সাথিদের কথা। ওয়াজ্জু হজ করতে গেছিল হাবিব চাচার সঙ্গে ছেলেবেলাতেই। স্নিগ্ধও বায়না ধরেছিল সেও যাবে বলে। সে কী কান্না তার!
মা শেষে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে, ‘কাফির’দের সেখানে যাওয়া মানা।
—শাকলু কেমন করছে রে ব্যাবসাতে?
—অমিয় শুধোল।
ইফতিকার বলল, বহতই আচ্ছা। এরফান চাচার পাঁচ ছেলেই খুবই ভালো করছে। আখখু, শাকলু, একরাম, প্রত্যেকেই। রাজ্জুও।
—আর হাবিব চাচার ছেলেরা?
—তারা সব ক-টা লাফাঙ্গা হয়েছে। আট-আটটি ছেলেই।
—আর মেয়েরা?
স্নিগ্ধ শুধোল।
—ক-মেয়ে ছিল যেন? ছয় মেয়ে নয়?
ইফতিকার বলল, হ্যাঁ। ছয় মেয়েই। তবে মেয়েরা আর কী করবে? শাদি হয়ে গেলে আমাদের ঘরের পর্দানসীন মেয়েদের পক্ষে যা করা সম্ভব, ঘর-গেরস্থালি, বাচ্চাদের দেখাশোনা, তাই করছে।
—পর্দা এখনও ওঠাতে পারলি না? তোরা নিজেরা তো লেখাপড়া করলি, ভালো চাকরি করছিস, ব্যাবসা করছিস, পুরো দুনিয়ার ফায়দা ওঠাচ্ছিস স্বার্থপরের মতো আর মেয়েদের বেলাতেই যত্ত….
স্নিগ্ধ বলল।
—পর্দা যে জেনানার নেই সে জেনানা তো জেনানাই নয়! দরজাতে পর্দা টাঙিয়েও আলোর মধ্যে বাস করা যায় ইচ্ছা করলেই। বুঝেছিস ইডিয়ট।
—বা: বা:। ভারি ভালো বলেছিস তো কথাটা ইফতিকার।
আমির বলল। তুই দেখছি অকলদার হয়ে উঠেছিস।
—চিরদিনই ছিলাম। তোদেরই অকল ছিল না বোঝবার মতো।
অমিয়, সেন বাড়ির জামাই বলেই বহুদিন থেকেই চেনে ইফতিকারদের পুরো পরিবারকে।
স্নিগ্ধ চুপ করে রইল।
ভাবছিল, ইফতিকারটা ঠিক সেইরকমই ফাজিল আর ছেলেমানুষই রয়ে গেল।
ডিবে থেকে মঘি পান আর খুশবুদার জর্দা মুখে ফেলে ইফতিকার বলল, ‘শামা হর রঙ্গ সে জ্বলতি হ্যায় সহর হোনে তক।’
—বহত খুব।
ভুতো বলল।
স্নিগ্ধ বলল, যার চাচা মরেছে শেষরাতে তার কবিত্ব এখনও একটুও বন্ধ হল না? তুই ঠিক তেমনই আছিস।
ইফতিকার হাসতে হাসতে বলল, ‘ইয়ে কঁহা-কি দোস্তি হ্যায় কেহ বনে হ্যায় দোস্ত নাসেহ?’
অর্থাৎ এ কী ধরনের দোস্তি যে শালা দোস্তও উপদেশ দিতে থাকে।
তারপর বলল, ইডিয়ট। এই প্রবহমান জগতে নিজে স্থির থেকে সব কিছু অনুধাবন করাটাই প্রকৃত অকলদারের কাজ। একথাটা যে না বুঝল, তার তোর মতো ইংরেজি বিশারদ হয়ে লাভটা কী?
—এই ‘অনুধাবন’ শব্দটা তুই-ই আমাকে শিখিয়েছিলি। মনে আছে? কানহারি পাহাড়ের চুড়োয় বসে এক দুপুরে?
স্নিগ্ধ ভাবছিল, সত্যিই। একটুও বদলায়নি ইফতিকারটা। আর ও যেন হুবহু বসানো মকবুল চাচা। চলা-ফেরা, হাত-নাড়া, কথায় কথায় শের আওড়ানো। খানা-পিনাতে তেমনই শৌখিন! বেশ, জিন্দা-দিল আদম।
এই কথা ভাবতে ভাবতে ইফতিকার বলল, এই ইডিয়ট। ক-দিন আছিস তুই হাজারিবাগে?
অমিয় ঠাট্টা করে বলল, তুই যে-কদিন ধরে রাখতে পারবি। এখন তো আর গোপাল সেন নেই। তোরাই এখন চুম্বকের কাজ করবি।
—তাহলে দ্যাখই-না আমার ক্ষমতার দৌড়। তোদের একদিন জবরদস্ত খানা খাওয়াব রে। সেই প্রথম জওয়ানির দিনগুলোর কথা মনে পড়িয়ে দেবে। কমসে কম দো-চার বাখরখানি রোটি, থোরাসা পায়া; জারাসা লাব্বা।
স্নিগ্ধ বলল, উমদা বিরিয়ানি, কমসে কম, থোরিসি তক্কর, পিরিচভর চৌরি ঔর দস্তরখান ইয়া রেবাবি ভর চাঁব।
—কমসে কম।
ভুতো বলল।
অমিয় বলল, তাহলে গুলহার আর বটি কাবাব কী দোষ করল?
—আর ফিরনি?
স্নিগ্ধ বলল।
—ফিরনি তো থাকবেই ঔর কমসে কম, থোরা-থোরা আণ্ডেকা রোশান হালুয়া। তোর জারা বিলকুল উতার যায়েগা। ইয়াদ হ্যায় না, আম্মি ক্যায়সি বনাতি থি।
—জরুর!
বলল, স্নিগ্ধ।
ওর চোখ দু-টি পুরোনো কথা মনে পড়াতে নরম হয়ে এল।
—আর হামদর্দ দাওয়া-খানেকি পাচনল? দো-চার বটি; কমসে কম।
—জরুর!
ইফতিকার বলল, বুড়ো বয়সে কেউ জন্নত-এ গেলে তাতে ‘গম্মির’ কী আছে? অবশ্য চাচা আমার জন্নতেই যে যাবে, দোজখ-এ যাবে না, এমন গ্যারান্টি আমি অন্তত দিতে পারব না।
অন্যরা হেসে উঠল।
স্নিগ্ধ বলল, বদতমিজ ভাতিজা।
ভুতো বলল। খাওয়াবি কোথায়? এই ‘গম্মির’’ মধ্যে?
—খাওয়া কি আর আমাদের নিজেদের বাড়িতে খাওয়াব?
—তবে? তোর শ্বশুরাল-এ?
—আমার শ্বশুরাল তো আগ্রাতে ইয়ার। ভুলেই মেরে দিলি। সেখানে কী খেতে চাইলে কী খাওয়ায় তার ঠিক কী? খাওয়াব হাজারিবাগেই। সালমার বাড়িতে। মনে আছে সালমাকে?
অমিয় বলল, নাজনিন-এর বন্ধু তো?
—জি হাঁ। সুরতহারাম। আমারও বন্ধু।
নাজনিন এর নাম উচ্চারিত হতেই স্নিগ্ধর বুকটা ধক করে উঠল। অনেক বছর ধরে ধামাচাপা দেওয়া একটি দুধ-সাদা কবুতর যেন ধামা সরিয়ে নেওয়ামাত্র এখুনি ‘ভড়ভড়’ শব্দ করে উঠল। মিনিয়েচার, সাদা হেলিকপ্টারের মতন। মস্তিষ্কের মধ্যে অনেক বছর ধরে চেপে রাখা ইটের নীচের ফ্যাকাশে হয়ে-যাওয়া ঘাস যেন আলোর দিকে পান্ডুর ফ্যাকাশে শিরা বের-হওয়া আঙুলগুলি বাড়িয়ে দিল।
স্বগতোক্তির মতোই বিড়বিড় করে স্নিগ্ধ বলল, নাজনিন কোথায় থাকে?
—ক্যা রে ইয়ার? নাজনিন-এর নাম করতেই দেখছি তোর বুকের মধ্যে জোড়া তবলার লহর আর ছনাছন ঘুঙুরের বোল উঠল। ইয়া আল্লা!
বলেই বলল, সীতাগড়া পাহাড়ের কাছাকাছি।
—সীতাগড়া পাহাড়ের কাছে?
—জি।
—ওর ছেলে-মেয়ে কী?
—এক ছেলে। এক মেয়ে।
—কী করে, নাজনিন?
করবে কী? নাজনিন তো বেগম সাহেবা। ওর বিয়ে হয়েছে-না এক নবাবজাদার সঙ্গে? ভয়ে আর লজ্জায় তো তুই ওর শাদিতে এলিই না। ডরপোক ইডিয়ট।
—কোথাকার নবাব উনি? ভুতো শুধোল।
—ওই পাটনার কাছেই কোথাকার যেন! কে খোঁজ রাখে। তখতই নেই, তার নবাব! তবে নবাবি খানদান-এর গুণ আছে মানুষটির। পয়সা চলে গিয়ে থাকতে পারে, স্বভাবটা নবাবেরই রয়ে গেছে। খুব বিদ্বান মানুষ। আরবি, ফারসি এমনকী সংস্কৃততেও পন্ডিত।
—এখন কী করেন? মানে, জীবিকা হিসেবে?
—করেন না কিছুই। সামান্য জমিদারির আয় এখনও আছে। কিন্তু খরচ অনেক। হিরে দানা, আসবাব, বন্দুক এসব বেচে-বেচেই চালান। বলেন, সঙ্গে তো যাবে না কিছুই। এইসব জিনিস-এর দাম কী? টাকার দামই-বা কী? তা তো কাগজ! কে কীভাবে ব্যবহার করে, তার ওপরেই দাম।
ইফতিকার জানলার কাচ নামিয়ে পানের পিক ফেলে বলল, ঔর বোল ইডিয়ট। ঔর ক্যা পুছনা মুঝসে?
ভুতো বলল, উস্তাদ। উনকো বাঁতে ছোড়ো। তুমহারা বারেমে বোলো।
ভুতো আর ইফতিকার একসঙ্গে হলেই সব অবস্থাতেই কথার ফোয়ারা উঠবেই উঠবে। মনে মনে এই খাতরা মেনে নিয়ে স্নিগ্ধ বাঁ-দিকের জানলা দিয়ে পথের বাঁ-পাশে চেয়ে বসে রইল।
ঘণ্টা দেড়েক লাগবে হাজারিবাগে পৌঁছোতে। গাড়িটা যতই হাজারিবাগের দিকে এগোতে লাগল ততই নানা পুরোনো কথা, স্মৃতি, সব দ্রুত ফিরে আসতে লাগল। ডিগবাজি খেতে খেতে দূরের আকাশ থেকে নানারকম পায়রারা যেমন শিস দেওয়া মালিকের ছোট্ট হাতে ফিরে আসে। ওর মনে হল যেন অগণ্য রঙে ছিদ্রিত হয়ে নীল আকাশটার সমস্তটুকুই সীমায়িত হতে হতে নেমে আসছে ওর মাথার ওপরে। আর স্মৃতিও তো কিছু কম নয়! সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের দিনগুলো, সেন্ট কলম্বাস কলেজের দিনগুলো, হাজারিবাগের হিন্দু-মুসলমান-আদিবাসী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নানা মানুষ, চারদিকের শিকারভূমি, শীতের ভোর, বর্ষার দুপুর, বৈশাখের সকালগুলিকে কোনো জবরদস্ত ধুনুরি যেন নরম মসৃণ তুলোর মতো অবিরাম ধুনতে লাগল স্নিগ্ধর মাথার ওপরে ‘তুনুর-তুনুর’ শব্দ করে এক খাস-গন্ধী আতর-মাখা বালাপোশ বানাবে বলে।
মনে পড়ে গেল নাজনিনের কথাও। প্রথম যৌবনের সেই গর্হিত, ভয়ার্ত, আতঙ্কিত এবং অশেষ উত্তেজনাময় নিটোল ক-টি বছরের কথা। স্মৃতি সেই বিশেষ কুঠুরিটিতে আলো-ভরা এই শীতের কোলে হঠাৎ প্রবেশ করেই হিমেল আঁধারে তার বুক ছেয়ে এল।
অমিয়র সঙ্গে এবারে হাজারিবাগে আসছিল স্নিগ্ধ, গোপাল, নাজিমসাসেব কাড়ুয়া, আসোয়া, শামিম, ইজাহার, এমানুয়েল এবং চলে-যাওয়া আরও অনেকের স্মৃতি বুকে নিয়ে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ আগেই চলে গেছেন। গোপাল সেন গেল পুজোর আগে, কলকাতায়। তার স্মৃতিই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল। এই মানসিক অনুষঙ্গে হঠাৎ ইফতিকার আহমদ ঢুকে পড়ে যে তার পরিবারের ইয়াদগারিতে ভরে দেবে ওদের সবাইকে, সর্বার্থে ঘুম পাড়ানো, ভুলে-যাওয়া নাজনিনকে যে জিয়নকাঠি দিয়ে আবার জাগিয়ে দেবে স্নিগ্ধর মনের শিশমহলে তা ওর কল্পনারও বাইরে ছিল।
চলে-যাওয়া যত বন্ধুদের স্মৃতি রোমন্থন করতেই শুধু এসেছিল সে। থেকে-যাওয়া অতিজীবন্ত এক প্রিয় বান্ধবীর সামনে গিয়েও যে দাঁড়াতে হবে হাজারিবাগে এলে, সেকথা আদৌ ভাবেনি।
নাজনিন কী ক্ষমা করবে স্নিগ্ধকে? স্নিগ্ধ নিশ্চিত ছিল যে, নাজনিন পাটনার এক রহিস আদমির বিবি হয়ে ছেলে-মেয়ে বৃদ্ধ স্বামী নিয়ে লক্ষ লক্ষ বিবাহিতা সুখী রমণীর মতোই সংসার ‘প্রতিপালন’ করছে। অর্থাৎ যে-জীবনে অপত্য আছে, টায়-টায় দেওয়া-নেওয়ার, ভাঁড়ার থেকে প্রতিসকালে মেপে-জুপে রসদ বের করার ঠিকঠাক দাম্পত্যও আছে, কিন্তু যে-জীবনে কোনো অবকাশ নেই, যতি নেই, সেখানে ‘প্রেম’ বন্ধ দেরাজের মধ্যে, বহুদিন আগে দু-জনেরই অলক্ষ্যে নেংটি ইঁদুরের মতো কবে পচে গেছে, সেরকমই কোনো নন-ডেসক্রিপ্ট জীবন। বিশ-পঁচিশ বছর বিবাহিত জীবনের অন্য দশজন সংসারীরই মতন।
এই ‘প্রতিপালন’ শব্দটাতেই অবশ্য নাজনিনের প্রবল আপত্তি ছিল চিরদিনই। মাথা উঁচু করে, গলার শিরা ফুলিয়ে ও বলত, সংসার কি বকরি-মোরগা যে, ‘প্রতিপালন’ করতে হবে। সংসার হচ্ছে কাঁঠালিচাঁপা গাছ। তাকে পেয়ার-ধিয়ান দিয়ে বড়ো করে, উজ্জ্বল সবুজ ক্লোরোফিল চকচক পাতায় পাতায় ভরিয়ে দিয়ে, তীব্রগন্ধী ফুলে ফুলে বাকায়দা ছেয়ে তোলারই, আর এক নাম সংসার করা। বড়ো সোহাগভরে বলত নাজনিন, এসো, তুমি আমার জীবনে প্রবেশ করো স্নিগ্ধ। আমি ফুলওয়ারি। খুদাহবন্দ-এর দোয়াতে তুমি আমার বাগানের হরগিজ মালিক হয়ে থাকো। কত গান গাইব আমরা, কত ফুল তুলব, কত খানা খাব আর মনের মতো খেলনা গড়ব। স্রিফ একটি বা দু-টি। দু-জনে মিলে। ছেলে হলে, তাকে মশহুর সরোদিয়া করে তুলব হিন্দুস্থানের। আর মেয়ে হলে আমার জরায়ুর সব ‘তাপ’ দিয়ে, তোমার পৌরুষের সব ‘জোশ’ দিয়ে তাকে গড়ে তুলব এক নাজুক, হামদর্দি, মরমিয়া, দরদিয়া, আওরত করে। যে আওরত আমাদের কন্যা, হিন্দুস্তাঁর-গুলিস্তাঁর লা-জয়াব বুলবুলি হবে। হাজারও বাহাদুর মর্দ তার পাণিপ্রার্থী হবে।
স্নিগ্ধ জানলার কাচটা একটু নামাল।
স্মৃতি কখনো কখনো দম বন্ধ করে দেয়।
স্নিগ্ধর চোখে-মুখে টাটকা হিমেল হাওয়া থাপ্পড় মারতে লাগল। ও ভাবছিল, সব বন থেকেই ফেরার পথ থাকে। পিচের পথ, মাটির পথ; পাকদন্ডী, কিন্তু মনের তেমন তেমন অব্যবহৃত অলিগলি দিয়ে স্মৃতির বনে একবার প্রবেশ করে গেলে সেখান থেকে বেরুবার পথ আর থাকে না।
নাজনিন-এর জবানিতে বলতে গেলে বলতে হয়, সব বেইমানি, সব বেওয়াফাই, সব মাঙ্গনি, সব গম্মি, সব সদমা, ওর ঈশ্বরের আর নাজনিনের আল্লা রসুলের দোয়াতে হিরেমতির ফুল হয়ে গাছে গাছে ফুটে থাকে; আঁকাবাঁকা, বন্য, চিত্রার্পিত নদীর চর সেখানে নম্র-মসৃণতায় শাহি-পালঙ্ক হয়ে হাতছানি দেয়, প্রতিগাছের প্রতিটি পাতাতে পাতাতে রুপোর পানদান ঝুলে থাকে, জরির জর্দা, জীবনের সব ‘অন্দরি-বাহিরি দরওয়াজা’ একই মেহালের দিকে নিয়ে যায় সেখানে পথভ্রষ্ট পথিককে।
যে মেহালের নাম ‘ইশক-মেহাল’।
দুই
ইফিকোর ত্রিবেণীজি ড্রাইভারের গাড়ি পাগমল-এ হজরত মিয়াদের বাড়ির সামনে গিয়ে যখন পৌঁছোল তখন জানাজার জন্য মুরদার খাটিয়া নামানো হয়ে গেছে। বড়া মসজিদের ইমামসাহেবকে গাড়ি করে আশাদুল্লা নাকি আনতে গেছে। উনি এলে জানাজা শেষে গোর হবে।
গোরস্থানটি হাজারিবাগ-সীমারিয়া রোডের ওপরেই। শহর ছাড়িয়ে একটু গেলেই। ছেলেবেলায় এই পথ দিয়েই স্নিগ্ধ গোপালের সঙ্গে সাইকেল রিকশা করে বনাদাগ অবধি গিয়ে সাইকেল রিকশা ছেড়ে দিয়ে হেঁটে মাইলখানেক গিয়ে ‘ক্কোসমা’তে পৌঁছোত। মোর-তিতির-কালিতিতির-খরহা শিকার করতে।
গোরস্থানের পরেই শ্মশ্মান।
ইমামসাহেব এসে নামাজ পড়ে দিতেই কফন উঠিয়ে নিয়ে সকলে নি:শব্দে চলল গোরস্থানের দিকে।
অমিয়কে বলে স্নিগ্ধ ইফতিকারের সঙ্গে হেঁটে গেল জানাজার লোকেদের পেছন পেছন নিজের রুমালে মাথা ঢেকে। অমিয় এবং ভুতো তাদের সকলকেই চেনে-জানে কিন্তু স্নিগ্ধর মতো এত দীর্ঘদিনের পরিচয় নেই ওদের ইফতিকারদের পুরো পরিবারের সঙ্গে। শৈশব থেকে যৌবনের প্রথমভাগ তো কাটেনি ওদের কারওই এই হাজারিবাগের মাটিতে!
অমিয়রা চলে গেল গাড়ি নিয়ে। গোপালদের বাড়ি বন্ধ আছে। যদিও মুনিরাম আর ধরম আছে, তবুও অনেকই কাজ থাকে। আগে পৌঁছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করাবে ওরা।
গোরস্থানে পৌঁছে ধীরে ধীরে কফন নামানো হল গোরে। বসির তার আব্বাজানের শেষকৃত্য করবে। মাপমতো মাটি কেটে কবরের ভেতরেও কাঠ বসিয়ে একটি বাক্সর মতো করে সেই বাক্সর মধ্যেই নামানো হল এরফান চাচাকে। বসিরভাই দু-হাতে আঁজলাতে মাটি নিয়ে এগিয়ে গেল কররের দিকে, তারপর তিনবার অঞ্জলি ভরে মাটি নিয়ে কবরের ওপরে দিয়ে বলল, ‘‘মিনহ খালেক নকুম—ওফিহা নইদোকুম—অমিনহা নোখরে জুখুম তারাতন উখরা।’
এর আগে বহুবার গোরস্থানে এসেছে স্নিগ্ধ। নাজনিনের আব্বা ও আম্মির গোর দেওয়ার সময়েও এসেছে। ইফতিকার-এর আব্বার গোর দেওয়ার সময় এসেছে।
কথাগুলির অর্থ জানে ও।
‘তোমাকে এই মাটি থেকেই পয়দা করা হয়েছিল, এই মাটিতেই তোমাকে সঁপে দিলাম, সেই আখরতের দিনে, বিচারের সময় এই মাটি থেকেই তোমাকে আবার তোলা হবে।’
তারপর সবাই মিলে গোরস্থানে ভালো করে মাটি দিয়ে এরফান চাচার গোর ঢেকে শবদেহ দফন করল। ধূপের আর ফুলের গন্ধে ভরে রইল গোরস্থান।
ইফতিকারদের পরিবারের জন্যে একটি বিশেষ এলাকা চিহ্নিত আছে এই গোরস্থানে।
গোরস্থানের গেটের কাছে, সেখানে পাকিস্তানি পতাকার রঙের মতো গাঢ় সবুজ ও গাঢ় লাল কাফানের মতো ছিল, সেইখানে পৌঁছোতেই ভিড়ের মধ্যে একটি কিশোর, স্নিগ্ধর পাঞ্জাবির কোণ ধরে আকর্ষণ করল।
ও দাঁড়িয়ে পড়ল। ভিড় আগে এগিয়ে গেল। ইফতিকারও হাতের ইশারা করে এগিয়ে গেল। ও ওদের রিস্তেদারদের সঙ্গেই ফিরে যাবে। গাড়িতেও কথা হয়ে গেছিল যে, কাল-পরশু গোপালদের বাড়ি ‘পূর্বাচল’-এ এসে দেখা করবে বিকেলে। অমিয় বাড়ি পৌঁছে বদিবাবুর বাড়ি দীপুকে ফোন করে দেবে বলেছিল। দীপু গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাবে গোরস্থানেই। স্নিগ্ধকে তুলে আনতে।
গোরস্থানে পৌঁছে ধীরে ধীরে কফন নামানো হল গোরে।…
স্নিগ্ধ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল ছেলেটির দিকে।
—তুমি কে?
—আমি, আমি।
—তুমি কোন বাবু?
—আমি বাবু নই।
—তুমি তবে কী?
—আমি মিয়া।
—তোমার বাবার নাম কী?
—নবাব তাজউদ্দিন খাঁ।
—তুমি আমার পাঞ্জাবি ধরে টানলে কেন?
—দরকার ছিল বলে।
—দরকার? আমার সঙ্গে? কী দরকার?
—খত আছে তোমার নামে। তোমার নাম কী বলো আগে।
—আমার নাম স্নিগ্ধ বোস।
—তোমারই খত।
—কে দিয়েছে?
—আম্মি।
—তোমার আম্মির নাম কী?
—নাজনিন বেগম।
স্নিগ্ধ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল ছেলেটির দিকে। বয়স দশটশ হবে। উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। নবাব বংশের ছাপ আছে তাতে। কিন্তু নাজনিন-এর কোনো চিহ্ন নেই। তা ছাড়া তার সিন্থেটিক রবারের ধূলিমলিন চটি, আস্তিন-ছেঁড়া পাঞ্জাবি, মলিন কুর্তা, তেলহীন রুক্ষ মাথা ও মুখ দেখে ও যে সত্যিই নাজনিনের ছেলে তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হল স্নিগ্ধর।
—তোমরা ক-ভাই বোন?
—দুই।
—তুমি বড়ো?
—না। দিদি আছে।
—কত বড়ো?
—উনিশ বছরের।
—নাম কী দিদির?
—ফিরদৌসি।
—বা:। মুখ থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল স্নিগ্ধর।
—আর তোমার নাম?
ছেলেটি হাসল। হাসতেই তার চোখে নাজনিন-এর চোখের একটু আভাস ঝলকে উঠল, গোরস্থানের গাছতলার ঝিরঝিরি ছায়ায় চামর-বুলোনো উষ্ণ রোদের মধ্যে।
—কী নাম বলো-না?
—ভালো নাম আছে একটা। কিন্তু মা ডাকে ‘সাহিল’ বলে।
স্নিগ্ধ তার খোঁচা খোঁচা খাড়া খাড়া চুলের দিকে চেয়ে হাসল।
‘সাহিল’ অর্থাৎ ‘শজারু’। নাজনিনের সেন্স অফ হিউমার ঠিক সেইরকমই আছে।
—‘সাহিল’ তো মা বলেন, আর আব্বা কী বলে ডাকেন?
—আব্বা ডাকে না।
—ডাকেন না? তার মানে?
—নাম ধরে ডাকে না। কখনো কিছু ফরমাশ করার থাকলে বলেন, ‘অ্যাই। কোই হ্যায়?’ এইরকম। কখনো বলেন, অ্যাই নবাবজাদা! আবার কখনো খুব রেগে গেলে, হারামজাদা।
—তাই? স্নিগ্ধ আবারও হাসল।
—তা তুমি যাবে কীসে করে? কোথায় যাবে এখন?
স্নিগ্ধ বলে, আমি যাব ওখনিতে। বদিবাবুর বাড়ি, আর তুমি?
—আমরা তো থাকি সীতাগড়া পাহাড়ের দিকে।
—সে তো অনেক দূর।
—দূরই তো! এখন আমি বটমবাজারে যাব। ফুফার বাড়ি খাওয়াদাওয়া করে বাসে করে চলে যাব বিকেলে।
—তা বটমবাজারেই-বা যাবে কী করে? আরে তোমার নামটাই যে বললে না। তোমার আম্মি না-হয় সাহিল বলে ডাকেন, আমি তা ডাকতে পারব না।
—তাই-ই ডেকো। তুমি তো আম্মির বন্ধু।
বলেই সে হাসল। একেবারে দেবদুর্লভ হাসি।
—তাই?
স্নিগ্ধর মুখও হাসিতে ভরে গেল। কিশোরদের হাসি বড়ো ছোঁয়াচে।
দূর থেকে দেখা গেল বদিবাবুর ছেলে দীপু রায় আসছে তার হুড খোলা জিপ গাড়ি নিয়ে, পথের লাল ধুলো আর পাতা-পুতা খড়কুটো উড়িয়ে।
স্নিগ্ধ বলল, চলো সাহিল। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব বটমবাজারে।
—ঔর খতকা জওয়াব ক্যা হোগা? আম্মি জওয়াব সাথহিমে লেতে আনে বোলিন থি।
—পতা তো হ্যায় না খতমে?
স্নিগ্ধ শুধোল।
—হামে ক্যা মালুম? খত হাম পড়েথে থোরি! দোস্ত কি পতা ভি আপকি পাস নেহি হ্যায়? ক্যায়সে দোস্ত হ্যায় আপ?
স্নিগ্ধর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সত্যিই তো ঠিকানা যে নেই! অথচ থাকা উচিত অবশ্যই ছিল। অনেক বদলে গেছে স্নিগ্ধ, কিন্তু সাহিলকে দেখে, তার কথাবার্তা শুনেই বুঝতে পারছে যে, নাজনিন বদলায়নি। ঠিক আগের মতোই আছে।
কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে যেমন ছিল।
—তুমিই বলো ঠিকানাটা।
—ঠিকানা লাগবে না। সীতাগড়া রোডে নেমেই নবাব তাজউদ্দিনের নাম বলবেন, লোকে বলে দেবে। আমার নামও বলতে পারেন।
—কী নাম? সাহিল?
জি হাঁ। বলেই, সাহিল হেসে ফেলল।
আবার নাজনিনের চোখ নাচল ওর দু-চোখে। খড়খড়ে খড়ি-ওঠা অযত্ন লালিত কিশোরের রুক্ষ মুখ হঠাৎই আদ্রতায় ভরে গেল।
ভারি ভালো লাগছিল স্নিগ্ধর সাহিলের দিকে চেয়ে। ওর নিজের মেয়েটিও এই বয়সিই। ছেলের বয়স সতেরো। এবার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভরতি হল সে। সায়ান্স স্ট্রিম-এ।
হঠাৎ সাহিল বলল, আমার ভালো নাম সালামত।
দীপু বলল, চলো দাদা। অমিয়দা এখুনি ফোন করেছিলেন।
—চলো। স্নিগ্ধ বলল।
তারপর বলল, এ ছেলেটিকে বটমবাজারে নামিয়ে দিয়ে যেতে হবে।
দীপু বলল, নিশ্চয়ই।
তারপর বলল, তোমাদের পিতিজ-এ কবে নিয়ে যাচ্ছ দীপু?
—আমি তো তৈরিই। তোমার বাংলোও বুক করে রেখেছি। মোহনে নদীর ধারে। ইটখোরি আর পিতিজের মধ্যে। যেমন বলেছিলে। আমাদের পিতিজ-এর বাড়িতেও থাকতে পারো। মোটে ছয় কিলোমিটারের তফাত। তবে একটা হাতি বড়ো ঝামেলা করছে। যেদিন যাবে দেখাব তোমাকে, আমার বাউণ্ডারি ওয়াল ভেঙে ঢুকে এসে নারকেল গাছ খেয়ে গেছে।
—নারকেল গাছ! পিতিজ-এ?
—হ্যাঁ গো। পুঁতেছিলাম গোটা কুড়ি। বড়োও হয়েছিল। ফলও দিত সামনের বছর।
—ডেলিকেসি সাজিয়ে রাখবে, তা খাবে না কেন?
—অমিয়দা বলেছিল, সেও যাবে।
—তাই? তবে তো ওর সুবিধাটাও দেখতে হয়।
—কবে যাবে বলছে? দু-তিন দিন পর।
—ভালোই তো। তাহলে কদিন হাজারিবাগেই না-হয় থেকে যাব। এতদিন পরে এলাম।
—যেমন তোমার ইচ্ছা। আমাদের বাড়ি যাবে তো!
—এখনই চলো। ভাবছি বিকেলে ‘পূর্বাচল’-এই চলে যাব। অমিয় আছে তো! আমি না-গেলে বাঙালটা খেয়ে সুখ পাবে না। আমাতে-ওতে জমে ভালো। গতবার টিফিন ক্যারিয়ারে করে মাছ দিত মুনিরাম। এমনি কোনো বাটিতেই ওই কোয়ান্টিটি আঁটত না। চমনলাল তো ফওত হয়ে গেছে। গোপালই নেই, নাজিম সাহেব নেই, হাজারিবাগই আর সেই হাজারিবাগ নেই।
দীপু বলল, আমরা তো আছি।
তারপর বলল, বিকেলে তিতির মারতে যাবে নাকি দাদা?
—শিকার আমি ছেড়ে দিয়েছি দীপু। কুড়ি-বাইশ বছর হয়ে গেছে।
—হা:। তিতির আবার শিকার নাকি?
—কুড়ি-বাইশ বছর বন্দুক রাইফেলেই হাত দিইনি। পিস্তলটা কখনো কখনো দোকান থেকে আনিয়ে ছুড়ি, ক্লাবে গিয়ে। হাত ঠিক রাখার জন্যে।
বলেই বলল, ‘সব কিছুরই একটা কোথাও করতে হয় রে শেষ।’
গান থামিয়ে ‘তাই তো কানে থাকে গানের রেশ।’
পেছনের সিট থেকে মেয়েলি কন্ঠে কিশোর সাহিল বলে উঠল :
‘জীবন অস্তে যায় চলি তার রংটি থাকে লেগে
প্রিয়জনের মনের কোণে শরৎ-সন্ধ্যা মেখে।’
চমকে পেছনে চাইল স্নিগ্ধ।
দীপু বলল কেয়াবাত! কেয়াবাত! কামাল কর দিয়া তুনে ছঁওড়া পুত্তান।
—কোথা থেকে শিখলে এ তুমি?
স্নিগ্ধ শুধোল।
আম্মি শিখিয়েছেন।
ওর মা কি বাঙালি?
দীপু শুধোল।
‘হ্যাঁ’ও হয় ‘না’ও হয়, এমনিভাবে মাথা নাড়ল স্নিগ্ধ।
 
Back
Top