'৭৬ ও ৪৩ এর মন্বন্তর: ব্রিটিশদের পরিকল্পিত এক গণহত্যার ইতিহাস

dukhopakhidukhopakhi is verified member.

Special Member
Registered
Community Member
1K Post
Joined
Dec 22, 2024
Threads
411
Messages
5,981
Reaction score
2,694
Points
3,913
Age
40
Location
Dhaka, Bangladesh
Gender
Male
'৭৬ ও ৪৩ এর মন্বন্তর: ব্রিটিশদের পরিকল্পিত এক গণহত্যার ইতিহাস

(অন্তর্জাল হতে সংগৃহীত)






“আমি ভারতীয়দের ঘৃণা করি। ওরা যেমন জানোয়ারের মতো বাঁচে, তেমনি তাদের ধর্মও জানোয়ারের মতো। খরগোশের মতো এত সন্তান জন্মালে দুর্ভিক্ষ তো হবেই।”
– উইনস্টন চার্চিল

ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারত বহুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু বাংলার দুর্ভাগ্য বোধহয় সবচেয়ে নির্মম ছিল। ১৭৭০, ১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩, ১৮৯২, ১৮৯৭ এবং সবশেষে ১৯৪৩ সালে—বাংলা আবারও দুর্ভিক্ষের কালো ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল।
দুর্ভিক্ষ নতুন কিছু ছিল না। আগে যখন এমন দুর্যোগ দেখা দিত, তখন স্থানীয় রাজা-জমিদাররা চেষ্টা করতেন প্রজাদের সাহায্য করতে—খাজনা মওকুফ, সেচ ব্যবস্থা, খাদ্য মজুত, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে।
কিন্তু ইংরেজদের হাতে ভারতের রাজস্ব ব্যবস্থা চলে যাওয়ার পর চিত্রটা পালটে যায়। দুর্ভিক্ষে মানুষ মরলেও ব্রিটিশদের মুখে এতটুকু দয়া ছিল না। বরং তাঁরা তাদের মুনাফা নিয়ে আরও ব্যস্ত ছিলেন।

১৭৭০ সালের মন্বন্তর

এই দুর্ভিক্ষ শুরু হয় ১৭৬৯ সালের খরার পর এবং চলে প্রায় চার বছর ধরে।
এর ফলে বাংলায় অন্তত ১ কোটি মানুষ মারা যায়—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক গণহত্যার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মুছে গিয়েছিল।

ঐতিহাসিক জন ফিস্ক তাঁর “The Unseen World” বইয়ে বলেন, ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ ইউরোপের মধ্যযুগের ব্ল্যাক ডেথ প্লেগের চেয়েও মারাত্মক ছিল।
এই দুর্ভিক্ষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, ওড়িশা, বিহার ও বর্তমান বাংলাদেশের একাংশ। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালাতে চেষ্টা করে। কেউ বাঁচে, কেউ পারেনি। চাষের জমিগুলো পড়ে থাকে অনাবাদি। যেখানে মানুষ বাস করত, সেখানে গজিয়ে ওঠে জঙ্গল।

দুর্ভিক্ষের পেছনে ব্রিটিশদের ভূমিকা

১৭৬৫ সালে ‘এলাহাবাদ চুক্তি’র মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। মুঘল আমলে যে করের হার ছিল ১০-১৫ শতাংশ, তা ইংরেজরা এক লাফে ৫০ শতাংশে তুলে দেয়। কৃষকরা বুঝতেও পারেনি, এই কর নবাবের জন্য নয়, ইংরেজদের জন্য দিচ্ছে।
এই অতিরিক্ত খাজনার ফলে কৃষকরা দুর্যোগের সময় বাঁচার জন্য যে খাদ্য জমিয়ে রাখতেন, সেটাও হারিয়ে যায়।

এর সাথে যুক্ত হয় বাধ্যতামূলক অর্থকরী ফসল—যেমন নীল, পোস্ত চাষ। খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো—১৭৭১ সালে, দুর্ভিক্ষ চলাকালেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি করের হার আরও বাড়িয়ে দেয়, যাতে আগের বছরের চেয়েও বেশি মুনাফা আসে। মানুষের মৃত্যুতে শোক নয়, তারা লাভ গুনে খুশি হয়।

১৯৪৩ সালের মন্বন্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালে বাংলায় আবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। কেউ ঘাস খেয়ে, কেউ মৃত মানুষের মাংস খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, যিনি ইউরোপে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী নেতা, বাংলার এই দুর্ভিক্ষে সাহায্য পাঠাতে অস্বীকার করেন।
বাংলায় পাঠানোর কথা ছিল এমন খাদ্য ও ওষুধ ইউরোপে সেনাদের জন্য পাঠিয়ে দেন,যদিও তখন তাঁদের অতিরিক্ত সরবরাহের প্রয়োজন ছিল না।
ভারতের গভর্নর যখন দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান, চার্চিল জবাব দেন:
এতো ভয়াবহ অবস্থা যদি হয়, তবে “গান্ধী এখনও মরেনি কেন?”

এভাবেই একদিকে যুদ্ধের নায়ক, অন্যদিকে বাংলার ইতিহাসে গণহত্যার অন্যতম দায়ী হয়ে থাকেন চার্চিল।
এই দুর্ভিক্ষগুলো প্রকৃতির চেয়েও বেশি ছিল মানুষের সৃষ্টি নির্দয়, লোভী শাসকদের অপরিকল্পিত শাসন, মুনাফার লালসা ও ঔপনিবেশিক দম্ভের ফল। বাংলার কোটি কোটি মানুষ শুধুমাত্র এই লোভের বলি হয়েছে।

ইতিহাস শুধু পাঠের জন্য নয়,স্মরণের জন্য, সচেতনতার জন্য, শিক্ষা নেওয়ার জন্য!
রক্তচোষা জাতীরা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য ও মানবিক জাতি হিসেবে দাবি করে!
 
Back
Top